ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

DSC_7817-416x396

জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড অবস্‌কিওরের নতুন ও ৯ম এলব্যাম ‘অবস্‌কিওর ও বাংলাদেশ।’ প্রকাশিত হয়েছে গত ২৬ সেপ্টেম্বর। এই অ্যালবামের ১০ টি গান নিয়ে অনেক দিন থেকেই কিছু লেখার চেষ্টা করছি, কিন্তু একজন শ্রোতা হিসেবে নিজেকে তৈরী করতে পারলেও সমালোচক বা গান নিয়ে রিভিউ লেখার সাহস বা যোগ্যতা কোনটাই আমার নেই তা আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি। সেই বিশ্বাসের উপর বিশ্বাস রেখেই কিছু কথা বলছি “অবস্‌কিওর ও বাংলাদেশ” এলব্যাম সম্পর্কে।

গানের সাথে আমার সম্পর্ক সেই ছোট বেলা থেকেই, মান্না – হেমন্ত – ভুপেন আমার বাসায় বাজাতে শুনি যখন আমি বুঝতে শিখি তখন থেকেই, আর তাই ভালো গান শোনার একটা অভ্যাস নিজের মধ্যে আছে তা বলতে পারি। এবার আসি অবস্‌কিওর প্রসঙ্গে, অবস্‌কিওর এর প্রথম এলব্যাম যখন বের হয় তখন বাংলা ব্যান্ড এর গান তেমন শোনার সুযোগ হয়নি, কিন্তু আলো যেমন থামিয়ে রাখা যায় না তেমনি আর অনেকের মতই অবস্‌কিওর এর জনপ্রিয় গান “মাঝ রাতে চাঁদ” এর মাধ্যমেই অবস্‌কিওর এর সাথে পরিচয়। সেই পরিচয়টা আরো বিসৃত হয়েছে তাদের সৃষ্টি অসম্ভব কিছু মন ছুয়ে যাওয়া গানের সাথে সাথে, ৯০ দশকে সেই সব গান গুলো আমাদের মত ভালো গান পছন্দ করা মানুষদের মুখে মুখেই ছড়িয়ে পড়ে দেশের আনাচে কানাচে। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি এই দেশের মানুষ অবস্‌কিওর মানেই “মাঝ রাতে চাঁদ” কে বুঝে এখনো। সেই সমসাময়িক অবস্‌কিওর এর গান “ছাইড়া গেলাম মাটির পৃথিবী” বা “খোদা তোমায় ডাকবে যখন” কিংবা “কলি কালের ভণ্ড বাবা” এই গানগুলোর মত গান এখন আর হয় না ভেবে আক্ষেপ করে সেই সময়ে এই গানগুলোকে যে সব শ্রোতা রা তুমুল জনপ্রিয় করে রেখেছিলেন।

মাঝে অনেক পথে পেড়িয়ে, অভিজ্ঞতার সঞ্চয় কে সাথে নিয়ে আবার সেই অবস্‌কিওর তাদের ৯ম এলব্যামে নিয়ে এসেছেন সেই ধারার কিছু গান। যে গানগুলো করার জন্য অবস্‌কিওর কে প্রেরণা দিয়েছে তাদের জনপ্রিয়তা এবং শ্রোতাদের ভালো গান উপহার দেয়ার দায়বদ্ধতা।

tshirt011

“অবস্‌কিওর ও বাংলাদেশ” এলব্যামে এবার গান আছে ১০ টি, যার প্রথম গানের শিরোনাম “স্বাধিনতার বীজমন্ত্র”, এই গানটিতে বাংলাদেশের গর্ব সেই সব বুদ্ধিজিবীদের স্বরন করা হয়েছে যারা দেশের স্বার্থে নিজের প্রানের মায়া তুচ্ছ করেছেন। শহীদ আলতাফ মাহমুদ, মুনির চৌধিরী, জহির রায়হান, শহিদুল্লাহ কায়সার, মেহেরুন্নেসা… এই নাম গুলো আমাদের ইতিহাসের পাতার তারকার মতই দুত্যি ছড়াবে ততদিন, যতিদিন আমরা তাদের আদর্শকে বুকে নিয়ে দেশকে ভালো বাসতে পারবো।

 

 

সুকুমার রায় এর ছড়া “আবোল তাবল” নিয়ে ছন্দের সাথে সুর বসিয়ে নবীনদের জন্যই করা হয়েছে “আবোল তাবল” গানটি।

“আজাদ” গানটি যারা একবার শুনবেন তাঁরা এই গানটি আবারো শুনতে চাইবেন, এটা আমি নিশ্চিন্তেই বলতে পারি। ১৯৭১ এ ক্রাক প্লাটুন এর সদস্য শহীদ আজাদ এবং তাঁর মা কে নিয়ে শহীদ আজাদের গ্রেফতার এবং গ্রাফতার পরবর্তী কিছু মর্মস্পর্শী কথা নিয়েই এই গান। গান মানুষকে কাঁদায় তা এই গান শুনলেই বুঝা যায়। কথার সাথে গায়কী মিলে এক অপূর্ব সমন্বয় হয়েছে “আজাদ” গানটি। আমার বিশ্বাস আমাদের স্বাধীনতা ইতিহাস নিয়ে যে সব গান রচিত ও সৃষ্টি হয়েছে “আজাদ” তাদের মধ্যের অন্যতম আসন গ্রহনের দাবী রাখে।

 

 

সারা বিশ্ব যখন ফিলিস্তিনের শিশু হত্যা প্রতিবাদ করছে, তখন অবস্‌কিওর ফিলিস্তিনের ঘটনার সময় উপযগী প্রতিবাদে গান করেছে “ফিলিস্তিন” শিরোনামে। এই গানের মাধ্যমে বলা হয়েছে যুদ্ধের কথা শান্তির কথা প্রতিবাদের কথা।

আমাদের ঢাকা শহরে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান মতিঝিল, অফিসপাড়া হিসেবে খ্যত এই মতিঝিল নিয়েই আমরা যারা মতিঝিলে অফিস করে জিবনের অনেক সময় পার করেছি, তাদের জন্যই এক নস্টালজিল গান “মতিঝিল” জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় আমরা ব্যয় করি জীবিকার তাগিদে জীবনের প্রয়োজনে। সেই সময়ের সুখ দুখ উঠে এসেছে এই গানে। জীবনের কোন এক সময় যখন আমরা পিছন ফিরে চাই, ঠিক সেই সময়েরর অনুভুতি নিয়েই এই গান।

“ইস” গানটি একটি চটুল প্রেমের গান, টিন এজ বয়সের গান হলেও অবস্‌কিওর তাদের গায়কী ও সুরে নিজেদের সেই অবস্থানে নিয়ে গিয়ে গাওয়াটাই তাদের সার্থকতা। যাদের ফেলে আসা জীবনে মিষ্টি প্রেমের সৃতি গুলো আজো নাড়া দেয় অথবা যারা এখন প্রেমের সুধা নিয়ে রঙিন হয়ে আছেন তাদের সবার ভালো লাগবে এই গান। অর্থাৎ গানটা ছোট বড় সকলের জন্যই ।

 

 

“পুস্পধুলী” গানটা ঠিক “ঈশ” এর মত প্রেমের গান নয়, কিন্তু প্রেমের আকুলতাও এই গানে কম নয়।

“যদি কখনো” গানটি সম্পূর্ণ বিরহ নিয়েই উপস্থাপন করা হয়েছে। বুকের ভিতর থেকে বিরহের ব্যথা আর কন্ঠে সেই ব্যথার সুর।

 

 

“বন্ধু” শিরোনামে গানটি শুধুমাত্রই ওই সব বন্ধুদের জন্য যারা বন্ধুদের সাথে তুমুল আড্ডাটা মিস করেন। যারা আজো বন্ধুর ডাকের অপেক্ষায় থাকেন। বন্ধু ডাকা মাত্রই তাঁর সাথে মন মিলানোর আকাঙ্ক্ষা নিয়েই এই গান।

সব শেষ যে গানটি আছে সে গানটি নিয়ে কিছু বলা আমার ধৃষ্টতা মাত্র বলেই আমি মনে করি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দলোনের প্রেক্ষাপট নিয়ে “আমার ভাই এর রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি”। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা গানটি সুর করেছিলেন সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ। বাংলাদেশের এমন কোন নাগরিক নেই যে এই গানটি যানে না বা একবারের জন্যও শুনেনি। কিন্তু দুক্ষের বিষয় হলো আমরা এই গানটিক কেবল আমারা প্রথম ৬ লাইন যানি, অথচ পুরো গানের মাঝে প্রার্থনা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ সহ আজ পর্যন্ত অত্যান্ত আধুনিক একটি গান বলেই আমি মনে করি। সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ তনয়া শাওন মাহমুদ এর অনুমুতিতে তাঁর কণ্ঠে এই অমর গানটি আবার আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে অবস্‌কিওর। বিনম্র শ্রদ্ধা রইল সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ, শাওন মাহমুদ এবং টিপু ভাই এর জন্য।

 

 

এই এলব্যামে বাকী গানের কথা লিখেছেন, মনিরুল ইসলাম, মোস্তফা মাহমুদ, আবু সাইদ আহমেদ, তানজিল রহমান ও আমাদের প্রিয় কবি অমিত গোস্বামী। সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছে অবসকিওর।

 

অবস্‌কিওর এর সদস্যরা হলেন টিপু (ভোকাল), রাজু (বেজ), রাজীব (লিড গিটার), শান্ত (গিটার), রিংকু (ড্রামস) ও বিনোদ (কি-বোর্ড)।

পরিশেষে বলতে চাই, আপনারা যারা ভালো গান পছন্দ করেন, ভালো গান শুনতে চান তাদের জন্য চমৎকার একটি এলব্যাম “অবস্‌কিওর ও বাংলাদেশ”। অবস্যই সংগ্রহ করে শুনুন আপনাদের ভালো লাগবেই, আপনাদের ভালোলাগাই হবে এমন ভালো সব গান করার জন্য অবস্‌কিওর এর প্ররনা।

অবস্‌কিওর সম্পর্কে জানতে ও পুরোনো এলব্যাম এর গানগুলো শুনতে ঘুরে আসতে পারেন অবস্‌কিওর এর ওয়েব সাইটে, http://obscurebd.com/

এছাড়াও অবস্‌কিওর এর ফেসবুক অফিসিয়াল পেজ https://www.facebook.com/bdobscure/photos_stream এ ক্লিক করে সাথে থাকতে পারেন।