ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

যে এলাকার মানুষ যেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে তাকে সেই এলাকার স্থানীয় জনগণ বলে। আর এই স্থানীয় জনগণকে শাসন করার জন্য যে শাসনব্যবস্থা তাকে স্থানীয় শাসন বলে। স্থানীয় শাসনের প্রশাসক হল স্থানীয় সরকার। স্থানীয় সরকারের কাজ হবে স্থানীয় জনগণের দাবি দাওয়া পূরণ করা, বিবাদ মীমাংসা করা, স্থানীয় উন্নয়ন ঘটানো, রাস্তাঘাট কালভার্ট নির্মাণ করা, স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ ইত্যাদি। অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়নে স্থানীয় শাসনব্যবস্থা অতীব জরুরী। বাংলাদেশে যে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা চালু আছে তা দৃশ্যমান নয়। এদের কার্যক্রমও নির্দিষ্ট নয়।

সরকার কি, সরকার কিভাবে গঠিত হয়, সরকারের তিনিটি বিভাগের মধ্যে কোন বিভাগের কি ক্ষমতা ও দায়িত্ব, সরকারের রাজস্ব আয়ের উৎস কি কি, বিধানিক, প্রশাসনিক ও বিচারিক বিভাগের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ক, ক্ষমতার পৃথকীকরণ ইত্যাদি বিষয় তৃণমূল ইউনিটে দৃশ্যমান না হওয়ায় মানুষের কাছে ”সরকার” একটি অস্পষ্ট ও দুরবর্তী বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। জনগণ আজ শুধু একটি বিষয়ে সচেতন, তা হলো ৫ বছর পরে ভোট দিতে হবে, নতুন সরকার আনতে হবে। বাংলাদেশের বিদ্যমান সরকার ব্যবস্থাই জনগণকে এমন চিন্তাভাবনার অধিকারী হতে বাধ্য করেছে। কেননা তারা এমনভাবে মানুষের মধ্যে প্রচারণা চালায় যে ভোট দেয়ার পর তাদের কাজ শেষ। তাদের কল্যাণে সরকার সব কাজ করে যাবে, জনগণের আর কোন কাজ নেই, আর কোন চিন্তার দরকার নেই। শুধু পাঁচ বছর পর আবার তোমরা ভোট দিলেই চলবে।

অথচ একটি দেশের উন্নতি তখনই সম্ভব যখন জনগণ সরকারের সাথে থাকবে, সরকারকে সহায়তা করবে। প্রয়োজনে বা বিপদে সরকার জনগণকে পরামর্শও দিতে পারে। অর্থাৎ সরকার কাজ করবে দেশের মঙ্গলের জন্য, কিন্তু তা একা নয় অবশ্যই দেশের মানুষকে সাথে নিয়ে। কিন্তু মানুষ যদি সরকার হতে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাদের কর্মকান্ড ও সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ যদি জনগণের কাছে অস্পষ্ট থাকে তাহলে জনগণ কিভাবে সহায়তা করবে সরকারকে? আর এ জন্য সরকারের ধারণা তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে তুলতে হবে। সরকারকে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় এই দুইভাগে ভাগ করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, মুদ্রাসহ জাতীয়ভিত্তিক কাজগুলো। আর বাকী সব কাজ করবে স্থানীয় সরকার। স্থানীয় সরকার স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ ও স্থানীয় আদালত সম্বলিত হবে। স্থানীয় প্রশাসনগুলো হবে: বিভাগীয় প্রশাসন, নগর প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন প্রশাসন। স্থানীয় সংসদগুলো হবে: বিভাগীয় সংসদ, নগর সংসদ, জেলা সংসদ, উপজেলা সংসদ ও ইউনিয়ন সংসদ। অনুরূপভাবে ইউনিয়ন আদালত, নগর আদালত ইত্যাদি গঠন করতে হবে। এসব স্থানীয় প্রতিষ্ঠান অবশ্যই ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ অনুযায়ী গঠন করতে হবে, যেটি ১৯৯৭ সালে উপস্থাপিত করেন স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক আবু তালেব; এই রূপরেখাটি তখন বাস্তবায়িত হলে আজ গোটা জাতি অনেক দূর এগিয়ে থাকতো বইকি। তবে আর কোনও বিলম্ব নয়, এখনই এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

সে যাই হোক, শাসনব্যবস্থা দুভাগে বিভক্ত হলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের চাপ কমবে। তাদেরকে আর ছোটখাটো ইস্যু নিয়ে মাথা ঘামাতে হবেনা। যেমন কেন্দ্রীয় সরকার পররাষ্ট্র বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে, তাই বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নে বেশ জোর দিতে পারবে। এতে বিভিন্ন দেশের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপিত হবে। আর কোন দেশের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপিত হলে সে দেশের সাথে বাণিজ্যও বেড়ে যাবে। বাণিজ্যও যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে তাই পররাষ্ট্র সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে তারা বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ব্যাপকভাবে সফল হবে। একটি দেশের উন্নয়নে বাণিজ্যের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিংগাপুর, মালেশিয়া, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মত দেশগুলো এগিয়ে যাওয়ার কারণ হল তাদের বাণিজ্যিক সফলতা। অথচ কয়েক দশক পূর্বে ওই দেশগুলোর অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে মোটেও ভালো ছিলনা। তাই বাংলাদেশকেও বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকতে হবে। আর যেহেতু এটা সমগ্র দেশের উন্নয়নে জড়িত তাই এটি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকা উচিৎ। বাণিজ্যের মাধ্যমে যদি আমরা দেশের উন্নয়ন ঘটাতে পারি তাহলে প্রতিরক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার মনোনিবেশ করতে পারবে। যেহেতু বর্তমান বিশ্ব প্রতিযোগিতাময় তাই নিজেদের অস্তিত্ব টিকে রাখতে হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধনের বিকল্প নেই। ভারত আমাদের পার্শ¦বর্তী একটি দেশ যেটি ভবিষতে বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। মিয়ানমারও তাদের শাসনব্যবস্থায় সংস্কার আনায় বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এখন তাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করছে। ধারণা করা হচ্ছে ভবিষ্যতে মিয়ানমারও এ অঞ্চলের একটি বৃহৎ শক্ত হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশকে আরও সতর্ক হতে হবে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ যদি তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়ন না ঘটাতে পারে তাহলে বাংলাদেশ হতে ওই দুটি দেশ অবাধ সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করবে। যার প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যে পাচ্ছি। ভারত ইতিমধ্যে বাংলাদেশ হতে বিভিন্ন সুবিধা অনায্যতার ভিত্তিতে আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জনমনে প্রতীয়মান হয়। যদিও বর্তমান সরকার দাবী করছে ভারতের সাথে সম্পর্ক ভালো। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত যেসব নীতি অবলম্বন করছে তাতে নানারকম প্রশ্ন, সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই প্রকৃত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকারকে পররাষ্ট্রনীতি খুব সফলতার সাথে পরিচালনা করতে হবে।

স্থানীয় শাসনব্যবস্থা জরুরী বলছি এ কারণে যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে জনগণকে সামান্য কাজের জন্য বা যৎসামান্য ইস্যু নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। আবার কেন্দ্রীয় সরকারকেও ছোট ছোট বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে হবেনা। এতে স্থানীয় জনগণ নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারবে। অর্থাৎ তারা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবে। আর যে কোন জাতিকে উন্নতির মুখ দেখেতে হলে আত্মনির্ভরশীলতার বিকল্প নেই। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে জনগণ শাসনকার্যে আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে। শাসনকার্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের ফলে তাদের কাছে শাসনব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। অর্থাৎ তাদের মধ্যে দায়িত্ব সচেতনতাও বৃদ্ধি পাবে। যেটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই দরকার। আমাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু সরকারের নিকট দাবীর ঝুড়ি উপস্থাপন না করে নিজেদেরকেও ঝুড়ি ভরানোর দায়িত্ব নিতে হবে। স্থানীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন বর্তমান অপেক্ষা বেশ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। স্থানীয় শাসনব্যবস্থা চালু থাকলে তারা নিজেদের এলাকার উন্নয়ন করতে নিজেরাই সচেষ্ট হবে। আর যেহেতু তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে স্থানীয় জনগণের কাছে তাই তারা ফাঁকির আশ্রয়ও নিতে পারবেনা।

সর্বোপরি বলা যায় দেশের মোট উন্নয়নের জন্যই সরকারের একটি সমন্বিত স্তর বিন্যাসকরণ গ্রহণ করে তার আওতায় প্রতিটি স্থানীয় স্তরে স্থানীয় সরকার চালু করা দরকার। এতে বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতি যে আঞ্চলিক বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে সেটারও অবসান হবে। বর্তমান সরকারগুলো প্রকৃত গণতান্ত্রিক না হওয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনায় কোন কোন অঞ্চলকে সুবিধাদি বেশি দেয়। আবার কোন অঞ্চলে সহায়তা দেয়না বললেই চলে। শুধু রাজনৈতিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে এ নীতি অবলম্বন করা হয়। কিন্তু শাসনব্যবস্থা দুই ভাগে বিভক্ত হলে কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি মূলত স্থানীয় বিষয়ে থাকবেনা, তাই এ ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্যের সৃষ্টি হবেনা। যেহেতু স্থানীয় শাসন স্থানীয় নেতৃবৃন্দের নিয়েই করা হবে, তাই প্রত্যেক স্থানীয় সরকারই তার নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন ঘটাতে সচেষ্ট হবে। কেননা তারা স্থানীয় জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। আর এভাবেই স্থানীয় সরকারের দ্বারা স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন সাধিত হবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন সাধিত হবে।