ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য পাকিস্তানকেই সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তখন ভারতের সাথে মার্কিনিদের সম্পর্ক বর্তমানের মত বন্ধুসুলভ ছিলনা। আবার আমরা দেখতে পাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নেও তারা পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়েছিল। অন্যদিকে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালালে স্বভাবতই মার্কিনিদের প্রয়োজন হয় পাকিস্তানের। মার্কিনিরা পাকিস্তানের সহায়তা নিয়ে সোভিয়েত বাহিনীকে ঠেকানোর জন্য পাক আফগান সীমান্তে গড়ে তোলে সশস্ত্র গেরিলা তালেবান বাহিনী। পরবর্তীতে তালেবান বাহিনী মার্কিন স্বার্থ বিরোধী কাজে লিপ্ত হলে তাদের দমনের জন্য আবার দরকার হয় পাকিস্তানের সহায়তার। পাকিস্তান সরকারও বন্ধুত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে তাদের সহায়তা করতে থাকে।
কিন্তু বর্তমান সময়ে এ অঞ্চলে ভারতের প্রভাব বাড়তে থাকায় সুযোগ সন্ধানী মার্কিনিরা ভারতকে তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। ভারতও সুপার পাওয়ারকে তাদের পাশে পেয়ে সাদরে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই অনেকে মনে করেন এ অঞ্চলে ভারতই এখন হবে মার্কিনিদের পরম বন্ধু। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয়তা এখন তাদের কাছে ক্রমেই কমে আসবে। যারা এমন ধারনা পোষণ করেন তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বজায় রাখতে হলে পাকিস্তানের প্রয়োজনীয়তা এত তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে আসবেনা। কেননা প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও আফগান যুদ্ধ শেষ করতে পারেনি। তাই এই যুদ্ধ যতদিন চলবে ততদিনই প্রয়োজন হবে পাকিস্তানের। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে চীন বিশ্ব শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। তাই চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হলে মার্কিনিদের অবশ্যই প্রয়োজন হবে পাকিস্তানের। তৃতীয়ত, এটা ভুলে গেলে চলবে না যে পাকিস্তান একটি পরমাণু অস্ত্রসমৃদ্ধ দেশ। তাই এই অঞ্চলে শক্তিসাম্য(ইধষধহপব ড়ভ চড়বিৎ) রক্ষা করতে যে কোন বৃহৎ শক্তিই পাকিস্তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে চাইবে। চতুর্থত, ভারত এখন মার্কিনিদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখলেও পরিপূর্ণ বন্ধুত্বে বিশ্বাসী নয়। ভারত এখনও মার্কিনীদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে। কেননা ভারত নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজের স্বার্থকে এত বেশি গুরুত্ব দেয় যে অন্যের স্বার্থ সেখানে জলাঞ্জলি হতে বাধ্য। সুতরাং ভারত যে সবসময় পাকিস্তানীদের মত যুক্তরাষ্ট্রের তোষামোদ করবে এটা বলা কখনই সমীচিন হবেনা। তাই স্বভাবতই বিকল্প হিসেবে মার্কিনীদের প্রয়োজন হচ্ছে পাকিস্তানকে।

গত বছরের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন কমান্ডোদের একটি গোপন অভিযানে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হলে পাক মার্কিন সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পাকিস্তান এ গোপন অভিযানকে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে দাবি করেন। অন্যদিকে মার্কিনীরাও অভিযোগ তোলে যে পাকিস্তান মোটেই সন্ত্রাস দমনে মনোযোগী নয়। এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের নভেম্বরে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ন্যাটোর বিমান হামলায় ২৪ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হলে পাক সরকার ক্ষুদ্ধ হয়ে নিজ ভূখন্ডের ওপর দিয়ে ন্যাটোর রসদ সরবরাহের পথ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আফগান যুদ্ধ শেষ করতে হলে এবং সৈন্যদের প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করতে হলে পাকিস্তানের বিকল্প নেই। তাই ওবামা সরকার বিভিন্ন প্রচেষ্টায় পাকিস্তানকে ওই রসদ সরবরাহের পথ খুলে দিতে অনুরোধ জানায়। কিন্তু পাকিস্তান এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র তা করতে অস্বীকার করে। ফলে দুই দেশের সম্পর্কে মারাত্মক টানাপোড়েন এর সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারপরও পাকিস্তান সরকার মনোভাব পরিবর্তন না করায় দীর্ঘ সাত মাস পর এ ঘটনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরপরই পাকিস্তান নিজ ভূখন্ডের ওপর দিয়ে আফগানিস্তানে যাওয়ার পথ খুলে দিতে রাজি হয়।

কিন্তু পাকিস্তান সরকারের এই সিদ্ধান্তে অনেকেই খুশি নন। তালেবান ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে রসদ সরবরাহকৃত একটি গাড়িও আফগানিস্তানে পার হতে দেয়া হবেনা। তারা রসদ সরবরাহকারী গাড়ি বহরে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। আবার ন্যাটো সেনাদের জন্য রসদ সরবরাহের রুট খুলে দেয়ায় এর তীব্র সমালোচনা করেছেন তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের প্রধান ইমরান খান। তিনি বলেছেন, ‘পাকিস্তান সরকার ন্যাটোর রসদ সরবরাহের রুট খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতীয় সংসদের অবমাননা করেছে।’ ধর্মভিত্তিক দলগুলোও পাকিস্তান সরকারের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। জামিয়াত উলেমা-ই- ইসলাম দলের প্রধান মাওলানা ফজলুর রেহমান বলেছেন, ‘অবরোধ তুলে নেয়ার অধিকার শুধু পার্লামেন্টেরই আছে। প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী কেউই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননা।’ জামায়াত-ই-ইসলামীর আমির সৈয়দ মুনাওয়ার হাসান বলেন, ‘শত্রুদের শক্তিশালী করার এই সিদ্ধান্ত জাতি কখনই ক্ষমা করবেনা।’ কূটনীতিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারাও অনেকে বিরূপ চিন্তা করেছেন। অনেকের মতে এর মাধ্যমে মার্কিন সরকার আফগানিস্তানে কয়েকটি স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ করতে চায়। আর সেখান থেকে পাকিস্তানে চালকবিহীন ড্রোন বিমান হামলা আরও বেড়ে যেতে পারে।

তবে পাকিস্তান সরকার বাস্তবতার খাতিরেই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। কেননা পাকিস্তানে এখন যে অস্থিতিশীলতা চলছে তা মোকাবেলা করার জন্য তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন। জারদারি সরকারের বিরুদ্ধে আদালত যেভাবে খড়গহস্ত হয়েছে তাতে যে কোন মুহুর্তেই এ সরকারের পতন ঘটতে পারে। তাই যে কোন বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে জারদারি বৃহৎ শক্তির সহযোগিতামূলক আচরণ আশা করছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে পাকিস্তানকে অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে তাতে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিন পাকিস্তান বিশাল অঙ্কের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নিকট থেকে আদায় করেছে। অন্যদিকে একার পক্ষে অভ্যন্তরীন সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীকে মোকাবেলা করা পাকিস্তান সরকারের জন্য প্রায় অসম্ভব। সুতরাং চালকবিহীন মার্কিন ড্রোন হামলার বাস্তবতা পাকিস্তান সরকারও মাঝে মাঝে উপলব্ধি করে। যুক্তরাষ্ট্রের মত একটি বৃহৎ শক্তি তার কৃতকর্মের জন্য পাকিস্তান সরকারের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছে এটাও পাকিস্তানীদের জন্য একটা বড় পাওয়া। এর মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের দৃঢ়তা প্রমাণিত হয়েছে। সর্বোপরি এর মাধ্যমে পাক মার্কিন সম্পর্ক আবার নতুন রূপে বিকশিত হতে পারে।