ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

দুর্নীতি শব্দটি আমাদের নিকট অতি পরিচিত। আজকাল পত্রিকা খুললেই এই শব্দটি যেন চোখের সামনে ঘুরঘুর করে। আজ এ দুর্নীতির খবর, কাল আরেক দুর্নীতির খবর পত্রিকাগুলোতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। আমার মনে হয় কেউ যদি দুর্নীতি বিষয়ে পিএইচডি করতে চায় তাহলে বাংলাদেশকে মডেল কান্ট্রি হিসেবে ধরে নিতে পারে। এক বাংলাদেশের দুর্নীতির চরিত্র বিশ্লেষণ করলেই গুটিকয়েক পিএইচডির পেপার তৈরি হয়ে যাবে।

দুর্নীতির ছড়াছড়ি আজ বিশ্বব্যাপীই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আরব বিশ্বে কিছুদিন পূর্বে জনগণ যে ঝড় তুলেছিল তার অন্যতম একটি কারণ ছিল স্বৈরশাসকদের দুর্নীতি। আবার বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ‘ওকুপাই মোভমেন্ট’ নামক আন্দোলনের অন্যতম কারণ হল দুর্নীতি। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষ্যাপার মূল কারণ হল সে দেশের সরকার গোষ্ঠীর দুর্নীতি। দুর্নীতিকে ইস্যু করেই সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচিত সরকারকে কোণঠাসা করে রেখেছে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতেও আজকাল দুর্নীতির খবর খুব জোরেই প্রকাশিত হচ্ছে। সেখানে আন্না হাজারে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে কাবু করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যেমন দুর্নীতি হচ্ছে, তেমনি দুর্নীতি বিরোধী কঠোর আন্দোলনও হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্নীতিকারীদেরও কোন অনুশোচনা নেই, আবার জনগণেরও এ নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। বাংলাদেশে এটি যেন একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে পত্রপত্রিকাগুলো ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে। আর প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে অন্ধ দুদক মাঝে মাঝে চোর ধরার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে(যদিও চোরের শক্তি দুদকের তুলনায় অনেক বেশি)।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে রাজনীতিবিদদের একের পর এক দুর্নীতির রেকর্ড বের করতে থাকেন। দুর্নীতির ফলশ্রুতিতেই বিগত নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি ঘটে। ভেবেছিলাম এ সরকারের আমলে হয়ত তেমন কোন দুর্নীতি হবেনা, তারা অতীত থেকে শিক্ষা নেবে। কিন্তু আমার ধারনা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান সরকার এবং তার অঙ্গসংগঠনের সৈন্যসামন্ত ও পেয়াদারা অতীত থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি। বরং পূর্ব অভিজ্ঞতা হতে উৎসাহ নিয়ে আরো সপাটে দুর্নীতির মাঠ দখল করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার সর্বশেষ নমুনা আমরা দেখেতে পাই হলমার্ক গ্রুপের দুর্নীতির মধ্যে দিয়ে। হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংকের কেবলমাত্র একটি শাখা হতে কোটি কোটি টাকা উধাও করে নিয়েছে। আর হলমার্ক গ্রুপকে সহায়তা করেছে সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল যা ধীরে ধীরে আমাদের নিকট উন্মোচিত হচ্ছে।

এর পূর্বে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রীর দুর্নীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক কি ছ্যাকাই না বাংলাদেশকে দিল, তা বর্তমান সরকার বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছে। আবার কালো বিড়াল তত্ত্বের জনক হিসেবে খ্যাত, মিডিয়ার সামনে যিনি বড় গলায় কথা বলে থাকেন তিনিও দুর্নীতি করে বসেছিলেন। এপিএসের নিকট হতে দুর্নীতির দ্বারা প্রাপ্ত অর্থের ভাগ নিতেই ঘটে গিয়েছিল দুর্ঘটনা। এপিএসের গাড়ী চালকের আকস্মিক অভ্যুত্থানে দুর্নীতির সমস্ত পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। অন্যের কালো বিড়াল ধরতে গিয়ে তিনি নিজের ঘরে পোষ্য কালো বিড়াল দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। যার জন্য তাকে মন্ত্রীত্বও ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ ও প্রতাপশালী মন্ত্রী দুর্নীতি করতেই পারে এই অভিপ্রায়ে তাকে আবার বানানো হয়েছে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী। অর্থাৎ এখানে দলের স্বার্থের নিকট দুর্নীতির অভিযোগ পরাভূত হয়েছে। এতে করে দুর্নীতি পেয়েছে প্রশ্রয়। আবার ক্ষমতাসীনদের নিকট বার্তা পৌছে গেছে দুর্নীতি আপাতত তাদের জন্য বৈধ। এভাবে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে দুর্নীতির যে বীজ রোপিত হয়েছে তা থেকে নতুন নতুন চারা গজাতেই আছে। জনগণের এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই, মাথাব্যথা থেকে লাভও নেই। দুর্নীতির দ্বারা অর্জিত অর্থ নিয়ে যারা নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন রচনা করছেন তারা একবারও কি ভেবেছেন এই অর্থ কাদের পরিশ্রমের ফলে এসেছে। তারা না জানলেও আমরা জানি এই অর্থ এসেছে কোন না কোন কুলি, মজুর, শ্রমিক, কৃষক, কুমার বা জেলের রক্তশ্রম থেকে।

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের নিকট থাকলেও তারাই আজ দুর্নীতির বাহকে পরিণত হয়েছে(সেখানে জনগণেরই বা কি করার আছে!)। সব ধরনের দুর্নীতির পেছনেই সরকারের কোন না কোন উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি জড়িত রয়েছে। এভাবে যদি সরকার নিজেই দুর্নীতির ছত্রছায়ায় আবাসিত হয় তাহলে দেশ নিশ্চিত ধ্বংসের মুখ দেখবে। দেশটা তখন আর সকলের থাকবেনা, দেশটা হবে গুটিকয়েক ব্যক্তির। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন মহলসহ সকলকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। দুর্নীতিবাজদের কোনভাবেই ছাড় দেয়া যাবেনা। তরুণদেরকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে- তারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায়িত হলে দুর্নীতিকে কোনভাবেই প্রশ্রয় দেবেনা। নতুবা বাংলাদেশ একের পর এক দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হতেই থাকবে, যার পরিণতি কখনও শুভ হতে পারেনা।