ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

ভূ-কৌশলঃ

ভূ- কৌশল হচ্ছে ক্ল্যাসিক্যল ভূ-রাজনীতির মূলধারা। যা রাজনৈতিক শক্তি এবং ভৌগলিক অবস্থানের সহিত সম্পৃক্ত। এটি দেখা যায় হার্কভি এর গবেষণায় যিনি বিশ্ব ইতিহাসে ভূশক্তি এবং সমূদ্র শক্তির উপর ভিত্তি করে তার এ মতবাদ দাড় করান। কৌশলগত ভূগোল, ভূমির সামরিক গুরুত্ব, আয়তন ও অবস্থানকে এবং সমুদ্রের এমন অংশ যা মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ তার মূল্যায়ন করে থাকে। এর দ্বারা এক রাষ্ট্রের অংশকে অন্য রাষ্ট্র হতে পৃথক করে, যার মাধ্যমে প্রতিবেশী ও প্রকাশ্য শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। কেননা অনেক সময় বৃহৎ পরিসরে কৌশল বাস্তবায়নে ভূ-কৌশলগত অবস্থান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে ও চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
গ্রে, ম্যাকাইন্ডার ও মাহান এর তত্ত্বের সমালোচনা করে বলেন যে, তারা মূলত ভূ-শক্তি ও সমূদ্র শক্তির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। গ্রে যুক্তি দেখান যে, কোন রাষ্ট্রকে শক্তিশালী হতে হলে শক্তির সকল উপাদানই ব্যবহার করার ক্ষমতা থাকা লাগবে। গ্রে প্রচলিত তাত্ত্বিকদের প্রশ্ন ছুড়ে দেন যে, তাদের তত্ত্বে কী প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি এবং ভূ-অর্থনীতি ও যৌথ যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে?
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তি কাঠামো ঃ

স্নায়ুযুদ্ধের সময় দ্বি-মেরু ব্যবস্থাই শক্তির রাজনীতি অথবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কিছু উদারবাদী ধারনার উদ্ভব ঘটে যেমন-বাজার অর্থনীতি, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, বিশ্বায়ন এবং আঞ্চলিকতাবাদের প্রসার। পাশাপাশি কিছু কিছু নেতিবাচক ধারনারও প্রসার ঘটে যা অস্থিরতা সৃষ্টি করে, যেমন- উপজাতীয়, নৃ-তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিচিতি এবং বহু অঞ্চলে স্থানীয় শক্তির উত্থান। আন্তর্জাতিক কৌশলগত অধ্যয়নে শক্তির যে উপাদানগুলো বিবেচনা করা হয় তা হল ভূ-রাজনীতি, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং ঐতিহাসিক অবস্থান যার মধ্যে ভূ-রাজনীতির গুরত্ব অপরিসীম। এসকল উপাদানগুলোর ভিত্তিতে স্যামুয়েল পি হান্টিংটন বর্তমান বিশ্বের একটি শক্তি কাঠামোর রূপ দিয়েছেন। তা হল আমেরিকা বর্তমানে একমাত্র সুপার পাওয়ার। তাছাড়া আরও ছয়টি প্রধান শক্তি রয়েছে, যেমন- রাশিয়া, জাপান, চীন, জার্মান, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স। তাদের সাথে সাথে ৩য় বিশ্ব থেকে উদীয়মান শক্তি হচ্ছে ভারত, যে এখন খুবই শক্তিশালী।
হান্টিংটন দাবি করেন যে শক্তির রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই বর্তমান বিশ্বের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটছে। স্নায়ুযুদ্ধ কালীন বৈশ্বিক শক্তি কাঠামো ছিলো দ্বি-মেরু কেন্দ্রীক, কিন্তু বর্তমান শক্তি কাঠামো কিছুটা পৃথক। এটা একক শক্তি ব্যবস্থা বলতে যা বুঝায় তা নয়, দ্বি-মেরু কেন্দ্রীকও নয়, আবার বহুমেরু কেন্দ্রীকও নয়। এটি একটি মিশ্রব্যবস্থা, যেখানে একটি সুপার পাওয়ার অনেকগুলো প্রধান শক্তি মিলে টহর- গঁষঃরঢ়ড়ষধৎ ব্যবস্থা তৈরী হয়েছে।
হান্টিংটন তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের কাঠামো দাড় করান, যার কিছুটা মাও সে তুং এর ‘তিন বিশ্ব’ তত্ত্বের সাথে মিলে যায়। যদিও তা ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল। যার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিভিন্ন অঞ্চলকেন্দ্রিক আঞ্চলিক শক্তি। যেমন ইউরোপে সম্মিলিতভাবে জার্মানী, ফ্রান্স ও ব্রিটেন; ইউরেশিয়াতে রাশিয়া; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে চীন এবং সম্ভাব্য জাপান; দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত; দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াতে ইরান; ল্যাটিন আমেরিকাতে ব্রাজিল এবং আফ্রিকাতে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়া। ৩য় পর্যায়ে রয়েছে সে সকল দেশসমূহ যারা আঞ্চলিক শক্তিশালী দেশসমূহের সাথে স্বার্থের দ্বন্দ্বে লিপ্ত। যেমন- ইউক্রেন রাশিয়ার সাথে, জাপান চীনের সাথে, কোরিয়া জাপানের সাথে, পাকিস্তান ভারতের সাথে, সৌদি আরব ইরানের সাথে এবং আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের সাথে। এই শ্রেণীবিভাজন মূলত পাওয়ার পলিটিক্সকে বিবেচনা করে। অন্য একজন লেখক যার ধারনা হান্টিন্টন এর ধারনার সাথে মিলে যায়। তিনি পাওয়ারকে তিনভাগে ভাগ করেন। যেমন গ্রেটপাওয়ার, মিডল পাওয়ার এবং স্মল পাওয়ার। গ্রেট পাওয়ারের ক্ষমতা ও সুযোগ থাকবে তার সীমানা বৃদ্ধি করার। মিডল পাওয়ার ও স্মল পাওয়ারের ভিন্ন কোন বৈশিষ্ট্য থাকবেনা। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বিশেষ করে এই শ্রেনী বিভাজন দেখা যায়। এই অঞ্চলে গ্রুপ অব গ্রেট পাওয়ার এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়া এবং ইন্ডিয়া। একক শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে ব্যাপক আধিপত্য রয়েছে। চীন উদীয়মান শক্তি যার রয়েছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্রমবর্ধমান প্রভাব। জাপানের অর্থনৈতিক শক্তি থাকলেও এর রাজনৈতিক শক্তির সাথে এর কোন সামঞ্জস্য নেই। পরবর্তী পর্যায়ে রয়েছে রাশিয়া যার রয়েছে পারমানবিক অস্ত্র। সর্বশেষ রয়েছে ভারত , যদিও এটি দঃ এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ তবুও উদীয়মান শক্তি হিসেবে একে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। মিডলপাওয়ারের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া , কোরিয়া এবং ভিয়েতনাম এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে। এসকল দেশগুলো শক্তিসাম্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্মল পাওয়ারের মধ্যে পড়ে লাওস, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই এবং মারশাল দ্বীপপুঞ্জ। এরা যখন অন্যান্য শক্তির সহিত চুক্তি বা মৈত্রীতে আবদ্ধ হয় তখনই শক্তিরূপে কাজ করে থাকে।
ভারতীয় কৌশলবিদ মেনন মাল্টিপোলারিষ্ট ভিউতে উল্লেখ করে বলেন যে, যদি শক্তিসমূহের মাঝে সমতা বিরাজ করে তবে যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে যায়। আবার আধিপত্যবাদী তত্ত্বের তাত্ত্বিকরা ভিন্ন কথা বলেন। তারা বলেন, অনেকগুলো রাষ্ট্রের ক্ষমতায় সমতা থাকলেই স্থিতিশীলতা আনয়ন সম্ভব নয়। এটি তখনই সম্ভব , যখন সকলেই জানে যে কে সবচেয়ে শক্তিশালী?
আমেরিকার ব্যাপারে হান্টিংটন এবং পল কেনেডির মূল্যায়ন হচ্ছে, আমেরিকার সা¤্রাজ্যবাদী নীতির অভাবে এটি একটি একক শক্তি থেকে প্রধান শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। এ মূল্যায়ন অবশ্য ব্রেজেনস্কির মূল্যায়নের সহিত দ্বিমত পোষণ করে। যেখানে তিনি বলেছিলেন,আমেরিকাই হবে প্রথম এবং শেষ এবং একমাত্র সুপার পাওয়ার।
ডিভ চিহ্নিত করেন যে, চীন ২০ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের সহিত ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। টাউ এর মতে, চীন ইউরোপের (রাশিয়াসহ) ও যুক্তরাষ্ট্রের সহিত তিনটি বৃহৎ কেন্দ্রের একটি হিসেবে বিবেচীত হচ্ছে। এর অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জনসংখ্যার কৌশলগত সুবিধাদী ২০শতকে এশিয়ার বাকী অংশে প্রভাব বিস্তার করতে সাহায্য করবে। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চীনই হতে পারে পাওয়ার পলিটিকস এর কেন্দ্রবিন্দু। এবং এশিয়া প্যাসিফিকই হতে পারে বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রস্থল।

চলবে…….