ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

দক্ষিণ চীন সাগরের অবস্থানঃ

দক্ষিণ চীন সাগর প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশকে দখল করে রেখেছে।এটি চায়নার মূল ভূ-খন্ডের দক্ষিণে, ফিলিপাইনের পশ্চিমে, মালেশিয়া এবং ব্রুনেই এর উত্তর-পশ্চিমে, ইন্দোনেশিয়ার উত্তরে এবং ভিয়েতনামের পূর্বে অবস্থিত। এর আয়তন ৩লক্ষ ৫০ হাজার কি.মি। এখানে বিশ্বের মোট শিপিং ট্রানজিটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হয়ে থাকে। এই সাগরে প্রায় ২০০ টি ক্ষুদ্র্র ক্ষুদ্র দ্বীপ রয়েছে। যাদের মধ্যে স্প্রাটলী ও প্যারাসেল অন্যতম। সম্পূর্ণ স্প্রাটলী দ্বীপের আয়তন ৩ বর্গ কিঃ এর কিছু কম। এই দ্বীপটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক কারণে খুবই গুরত্বর্পূণ। জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন এখন পর্যন্ত এর মালিকানা নিয়ে বিবাদ মীমাংসা করতে পারেনি। এর আশেপাশের দেশগুলো হল গণপ্রজাতন্ত্রী চীন(ম্যাকাও এবং হংকংসহ),তাইওয়ান, ফিলিপাইন, মালেশিয়া, ব্রুনেই, সিংগাপুর, ইন্দোনেশিয়া এবং ভিয়েতনাম।

দক্ষিণ চীন সাগরের প্রাকৃতিক সম্পদঃ

capture2
দক্ষিণ চীন সাগরে প্রচুর পরিমাণে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আছে বলে ধারনা করা হয়ে থাকে। সেজন্য প্রত্যেকটি রাষ্ট্র এই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। চায়নার একটি তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায় এখানে প্রায় ২৩১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুদ রয়েছে। আবার এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরের ব্রুনেই, ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন শাসিত অঞ্চলে কিছু প্রাকৃতিক গ্যাস ফিল্ড ইতোমধ্যে স্থাপিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘জিওলজিক্যাল সার্ভে’ এর তথ্য অনুযায়ী এখানে যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে তার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ হল প্রাকৃতিক গ্যাস। চায়না কর্তৃক প্রদানকৃত একটি তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, সমস্ত দক্ষিণ চীন সাগরে প্রায় দুই কুয়াড্রিলিয়ন কিউবিক ফিট প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। সুতরাং প্রাকৃতিক সম্পদের আধিক্য এই অঞ্চলের সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
দক্ষিণ চীন সাগর এবং পারিপারিপাশ্বিক ঃ
capture

দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্যে প্যারাসেল আইসল্যান্ড এবং ম্যাকলেসফিল্ড এলাকা হল বিবাদের কেন্দ্রবিন্দু। কেবলমাত্র স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়েই ওই অঞ্চলের ছয়টি দেশের মধ্যে বিবাদ রয়েছে। সাম্প্রতিককালে কোরিয়া জাপানের মধ্যে তোক্দ/তাকেশিমা আইসল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং দিয়ায়ুটাল আইসল্যান্ড নিয়ে জাপান, চায়না ও তাইওয়ানের মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন রূপ ধারণ করেছে। সম্পদের প্রাচুর্য্যতার জন্যই এ স্থানগুলো নিয়ে রাষ্ট্রগুলো বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে এবং অনাগত ভবিষ্যতে সম্পদের অপ্রাচুর্য্যতা দেখা দিলে এই স্থানগুলো নিয়ে প্রত্যেকটি রাষ্ট্র মুখোমুখি অবস্থানে চলে যাবে। প্রকৃতপক্ষে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত প্যারাসেল ও স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জ হবে বিবাদের প্রজ্জ্বলন ক্ষেত্র। তেল সমৃদ্ধ স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জের ওপর এর আশেপাশের ছয়টি দেশ যথা ব্রুনেই, চায়না, মালেশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান এবং ভিয়েতনাম নিজেদের আইনগত অধিকার দাবি করে। এর মধ্যে চায়না, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম সম্পূর্ণ দ্বীপপূঞ্জের উপর এবং মালেশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনেই এই দ্বীপের কিছু অংশের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্যারাসেল ও স্প্রাটলী দ্বীপপূঞ্জ ভূ-কৌশলগত ও ভূ-অর্থনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরত্বপুর্ণ। পূর্ব চীন সাগর থেকে আরও উত্তরে উরধড়ুধ ওংষধহফ নিয়ে চায়না, জাপান ও তাইওয়ানের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। উত্তর পূর্ব তাইওয়ান থেকে প্রায় ১৬৬ কিঃ মিঃ এর মধ্যে আরও ৫টি দ্বীপপূঞ্জ রয়েছে। ধারনা করা হয় এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনাবিস্কৃত হাইড্রোকার্বন সম্পদের মজুদ রয়েছে।
চায়নার দাবির সারমর্ম হল পুরো দক্ষিণ চীন সাগর চায়নার জল সীমার অর্ন্তগত। অর্থাৎ দক্ষিণ চীন সাগর চায়না সম্পূর্ণ নিজের বলে দাবি করে। দক্ষিণ চীন সাগর একটি গুরত্বপূর্ণ কৌশলগত কড়িডোর হিসেবে চিহ্নিত। জাপান, কোরিয়া ও চীনের নিকট এটি খুবই গুরত্বপূণ একটি পথ। কেননা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া হতে এইসব দেশে তেল ও অন্যান্য বাণিজ্য পণ্য আনার ক্ষেত্রে এই পথটি ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ চীন সাগর আরও বিভিন্ন কারণে গুরত্বপূর্ণ।

প্রথমত, এটি এমন একটি বিবাদপূর্ণ এলাকা যেখানে জড়িত রয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ এবং বাহিরের দুটি বৃহৎ শক্তি।
দ্বিতীয়ত, এখানে তেল ও গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা রয়েছে যা উত্তোলনের মাধ্যমে কোন রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী হতে পারে।
সর্বশেষ, এই জটিল সমুদ্্ের পথে যে কোন ধরনের দ্বন্দ্ব যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানসহ আরও অনেক বৃহৎ শক্তির স্বার্থকে বিপদগ্রস্থ করতে পারে।

Allan Collins নামে এক গবেষক বলেছেন, চীন দক্ষিণ চীন সাগরের মালিকানাকে Irredentist Claim হিসেবে ব্যবহার করবে এবং প্রয়োজনে শক্তিও ব্যবহার করবে। এর জন্য চায়না তার সামরিক বাহিনীকে সুসজ্জিত করবে এবং সুযোগের সন্ধানে থাকবে। নৌ চালনা ও বিমান উড্ডয়নের জন্য এই স্থানকে নিরাপদ রাখা ও এই সমুদ্র পথকে কোন দেশের প্রভাব মুক্ত রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ কাজ করছে। কেননা এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ পারস্য উপসাগরে নৌ-বাহিনী ও বিমান বাহিনীকে চালনার জন্য দক্ষিণ চীন সাগর কে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। আবার দক্ষিণ চীন সাগরে বিশাল পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ আবিস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষত এখানকার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস যে কোন জাতিকে উন্নতির মুখ দেখাতে পারে। ১৯৯৫ সালে রাশিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান Institute of Geology of foreign countries এর এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্প্রাটলী দ্বীপ এলাকায় ৬ বিলিয়ন ব্যারেল তরল খনিজ মজুদ থাকতে পারে যার শতকরা ৭০ শতাংশ হতে পারে প্রাকৃতিক গ্যাস। চায়নার মিডিয়ায় দক্ষিণ চীন সাগরকে 2nd persian Gulf হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং কিছু কিছু চাইনিজ বিশেষজ্ঞ দাবি করেন এখানে ১৩০ বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে।

চায়না দাবি করে তার মূল ভূ-খ- থেকে ১০০০ হাজার মাইল পর্যন্ত তাদের সমুদ্রসীমা। চায়না মনে করে সমুদ্র এলাকায় কৌশলগত পরিবেশ নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য তাকে সম্পূর্ণ সাগরে প্রভাব বিস্তার করতে হবে। জাপানের নিকট এই সাগর খুবই গুরত্ব পূর্ণ। কেননা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া হতে অধিকাংশ তেলের চালান জাপান এই পথে আমদানী করে। আবার স্প্রাটলী দ্বীপপূঞ্জে যে অধিকার স্থাপন করবে সে এটাকে একটি দূর্গ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার সম্ভব। স্প্রাটলী দ্বীপপূঞ্জ হল দক্ষিণ চীন সাগরের সবচেয়ে গুরত্ব পূর্ণ দ্বীপ। চায়না দাবি করে বহু প্রাচীন কাল হতে এই দ্বীপটি চীনের ভূ-খ-ের অর্ন্তগত এবং এ দাবির পেছনে অনেক ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। কিছু কিছু কৌশলবিদ জোড়ালো ভাবে বলেছেন যে,প্রশান্ত মহাসাগরীয় রঙ্গমঞ্চে চীন ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি গুলো তাদের প্রভাব বজায় রাখার জন্য যে কোন পন্থা অবলম্বনের জন্য প্রস্তুত।

চলবে….