ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

দঃ চীন সাগর ও ভূ-খন্ডগত ইস্যুঃ

দঃ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে অভিযোগের শেষ নেই। এ অঞ্চলে ব্রুনেই, কম্বোডিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, এবং ভিয়েতনাম স্বার্থগত বিষয়ে দ্বন্ধে জড়িয়ে রয়েছে। এসকল অভিযোগের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের সমূদ্র বিষয়ক কনভেনশন(আনক্লোজ) ২০০ কি.মি. এক্সক্লুসিভ অর্থনৈতিক জোন ও মহাদেশীয় সমূদ্র সীমা সংক্রান্ত নীতিমালা গঠনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশ ভিত্তিক দাবীসমূহঃ

ব্রুনেইঃ
ব্রুনেই এর দাবী হচ্ছে তার এক্সক্লুসিভ অর্থনৈতিক জোন(ঊঊত) স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত, কিন্তু তা তাকে ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছেনা। যদিও ব্রুনেই এব্যপারে কোন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেনি।
কম্বোডিয়াঃ
কম্বোডিয়া তার ইইজেড ও মহাদেশীয় সমূদ্রসীমা নীতিমালা এবং ঐতিহাসিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে থাইল্যান্ড উপসাগরের অংশবিশেষ দাবি করে আসছে। ১৯৮২ সালে কম্বোডিয়া ভিয়েতনামের সাথে ঐতিহাসিক জলভাগ নিয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যা পরবর্তীতে দু দেশের মাঝে সহযোগীতার অবস্থান তৈরী করে। ২০০৬ সালে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক তেল সম্পদের উপর যৌথ অধিকারের কথা ঘোষনা করে।
চীনঃ
চীন প্রায় সমগ্র দঃ চীন সাগরকেই দাবী করছে। সে স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের উপরও নিজের দাবি পেশ করছে। এবং ইতোপূর্বে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বেশ কিছু দ্বীপ দখল করে নিয়েছে। ১৯৭৪ সালে চীন ভিয়েতনামের নিকট থেকে প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জ অধিকার করে নেয়। এবং এখন পর্যন্ত এই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়াও চীন প্রাটাস দ্বীপপুঞ্জ দাবী করছে। দঃ চীন সাগরের উপর চীনের দাবী তার ইইজেড ও মহাদেশীয় সমূদ্রসীমা নীতিমালার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত যা হান(১১০খ্রীঃ) ও মিং(১৪০৩-১৪৩৩খ্রীঃ) স¤্রাজ্যের সময় থেকেই রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়াঃ
ইন্দোনেশিয়ার অভিযোগ হচ্ছে ইইজেড ও মহাদেশীয় সমূদ্রসীমা নীতিমালা অনুযায়ী তার সীমানা সে ভোগ করতে পারছেনা।
মালয়েশিয়াঃ
দঃ চীন সাগরে মালয়েশিয়ার অভিযোগ হচ্ছে ইইজেড ও মহাদেশীয় সমূদ্রসীমা নীতিমালা অনুযায়ী সীমানা তার দখলে নেই। এই নীতিমালার ভিত্তিতে সে থাইল্যান্ড উপসাগরের উপরওনিজের অধিকার দাবি করে থাকে। মালয়েশিয়া স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের তিনটি দ্বীপকে নিজের বলে দাবী করে থাকে। থাইল্যান্ড উপসাগরে অনুসন্ধান চালানোর লক্ষ্যে মালয়েশিয়া ১৯৮৯ সালে থাইল্যান্ডের সাথে একটি চুক্তি করে।
ফিলিপাইনঃ
ফিলিপাইন তার দ্বারা অধিকৃত স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জের আটটি দ্বীপকে নিজের বলে দাবি করে আসছে।
তাইওয়ানঃ তাইওয়ান সমগ্র দঃ চীন সাগরের উপর নিজের অধিকার দাবি করে। পাশাপাশি সে স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জও নিজের বলে দাবী করে এবং তাইপের সাথে এই দ্বীপপুঞ্জের বিমান যোগাযোগের ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে। এবং তাইওয়ান প্রাটাস দ্বীপপুঞ্জ দখল করে রেখেছে।
থাইল্যান্ডঃ
থাইল্যন্ড ইইজেড ও মহাদেশীয় সমুদ্রসীমা নীতিমালা অনুযায়ী থাইল্যন্ড উপসাগররে উপর তার অধিকার দাবি করে। ১৯৯৭ সালে থাইল্যান্ড ভিয়েতনামের সহিত সীমানা নির্দিষ্ট করার জন্য চুক্তি করে।
ভিয়েতনামঃ
ইইজেড ও মহাদেশীয় সমূদ্রসীমা নীতিমালা অনুযায়ী ভিয়েতনাম দঃ চীন সাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল নিজের বলে দাবি করে। ভিয়েতনাম স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জকে নিজের বলে দাবি করে এবং এর ২০ টি দ্বীপ সে দখলে নিয়ে নিয়েছে। চীন কর্তৃক অধিকৃত হওয়া সত্ত্বেও ভিয়েতনাম প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জকে নিজের বলে দাবি করে।

আঞ্চলিক সংকট ও তা সমাধানের পদক্ষেপঃ

দঃ চীন সাগরে নিজের আধিপত্য বজায় রাখাকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর মাঝে বিরোধ অনেক পুরোনো। ঐতিহাসিকভাবেই এই অঞ্চলটি সংঘাতময়। এক দেশের মাছ ধরার নৌকা প্রায়ই অন্য দেশ (যে ঐ অঞ্চলকে নিজের বলে দাবী করে) কর্তৃক ভোগান্তির শিকার হয়। এক দেশ কর্তৃক অনুমোদিত তেল গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত কোম্পানী অন্য দেশের সামরিক জাহাজ কর্তৃক বাঁধা প্রাপ্ত হয়।
এই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত কারো অজানা নয়। আর এগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে চীন ও ভিয়েতনামের মধ্যে হয়ে থাকে। ১৯৭৪ সালে চীন ভিয়েতনামের নিকট থেকে প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। ১৯৮৮ সালে চীন স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের নিকটে বেশ কিছু জাহাজ ডুবিয়ে দিলে প্রায় ৭০ জন ভিয়েতনামি নাবিক নিহত হয়।
দক্ষিণ চীন সাগরের সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য আসিয়ান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। আসিয়ান এর উদ্যোগে এই অঞ্চলের বিবাদমান দেশ সমূহের মাঝে একটি কার্যকর আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়। সর্বপ্রথম ইন্দোনেশিয়া ১৯৯০ সালে একটি ডায়ালগ ওয়ার্কশপের আয়োজন করে এবং এই অঞ্চলের বিরোধ মীমাংসায় কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও সহযোগীতামূলক চুক্তি করে।
১৯৯৬ সালে আসিয়ানের মন্ত্রীপরিষদ এই অঞ্চলের জন্য একটি নীতিমালা তৈরীতে একমত হয়, যার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, পাইরেসী নিয়ন্ত্রণ এবং মাদক পাচারের প্রচেষ্টাকে ব্যার্থ করে দেয়া হবে। ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে চীন ও আসিয়ানের ১০টি দেশের মধ্যে একটি যৌথ ঘোষনা অনুমোদিত হয় যেখানে বলা হয়- দক্ষিণ চীন সাগরে ভূ-খন্ডগত সমস্যা ও দাবি নিয়ে যে বিবাদ আছে তা শান্তিপূর্ণ উপায়ে মিটিয়ে ফেলা হবে, কোন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়। এছাড়াও আসিয়ানের আঞ্চলিক ফোরাম দঃ চীন সাগরের ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করছে।
২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে চীন ও ভিয়েতনামের মাঝে টনকিন উপসাগরের সীমান্ত ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মালয়েশিয়া এবং ব্রুনেই এর মাঝে ২০০৩ সালে একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা যৌথভাবে সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রগুলোকে রক্ষা করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ২০০৫ সালে চীন, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের তিনটি তেল কোম্পানি স্প্রাটলীসহ প্রায় ৫৫ হাজার বর্গমাইল এলাকায় ভূ-কম্পন ঘটিত সমস্যাগুলোর উপর জরিপ চালিয়েছে।
তবে কার্যত মালিকানা নিয়ে বিবাদ এখনও মীমাংসা হয়নি। এখনও কেউই ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। তাদের মধ্যে যে চুক্তিগুলো হয়েছে সেগুলো সবই পারিপার্শ্বিক বিষয় নিয়ে; দ্বন্দ্বের মূল বিষয়গুলোকে সবসময় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

কতিপয় দেশের এনার্জি সেক্টরঃ

জাপানের এনার্জি সেক্টরঃ

জাপান হল বিশ্বের চতুর্থ প্রাকৃতিক সম্পদের ভোক্তা। এক যুগ সময় ধরে অর্থনৈতিক স্থবিরতা বিরাজ করারফলে জাপান সরকার প্রাকৃতিক শক্তির নিরাপত্তার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। জাপানের যে তেল কোম্পানীগুলো দেশের বাইরে কাজ করে জাপান সেগুলোকে আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদান করে। তবে যে কৌশলগুলো নেওয়া হয়েছে তা অনেক সময় খুব কমই সাফল্য বয়ে নিয়ে এসেছে। জাপানের নীতি নির্ধারকেরা জ্বালানী ইস্যু এবং নিরাপত্তা ইস্যুকেএক করে দেখে যা পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। মূলত পারস্য উপসাগর হতেই জাপানে অধিক পরিমাণে তেল সরবরাহ হয়। জাপান তেল সম্পদের ৮৬% মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানী করে থাকে। প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো হল- সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত এবং ইরান। চার দশক ধরে জাপান ওপেক এর সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে তার জ্বালানীর চাহিদা পূরণের জন্য।

কোরিয়ার এনার্জি সেক্টরঃ

কোরিয়া জ্বালানী শক্তি উৎপাদন, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে দক্ষ নয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল তাদের জ্বালানী উত্তোলন পরিবেশবান্ধব নয়। দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের ৫ম তেল আমদানিকারক এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে ২য়। দেশটি তার জ্বালানী চাহিদা মেটানোর জন্য ৫৫% তেলের ওপর নির্ভরশীল। দক্ষিণ কোরিয়া ৭০% পেট্রোলিয়াম আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। কোরিয়ার সরকার জ্বালানী তেল সংগ্রহ করার জন্য নানা রকম ব্যবস্থা নিয়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়া থেকে। এর পাশাপাশি সরকার কৌশলগত জ্বালানী তেল সংরক্ষণাগার স্থাপন করেছে, যা পরিচালিত হয় কোরিয়ার জাতীয় তেল ব্যবস্থাপনা সংস্থার মাধ্যমে। জাপানের ‘ট্রেডিং হাউজ’ এর মত কোরিয়ার ‘ঈযধবনড়ষ’ মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় জ্বালানী তেল সংগ্রাহক সংগঠন। কোরিয়া প্রধানত কাতার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং ওমান থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে। তারা ২১%কয়লা আমদানি করে চীন এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে। দঃ কোরিয়া ২০০৫ সালে জাপানের সাথে আঞ্চলিক সহযোগীতার ক্ষেত্র চালু করে যার দ্বারা যৌথভাবে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনে কাজ করবে। আবার দক্ষিণ কোরিয়া বিকল্প জ্বালানীর অনুসদ্ধান করছে। এর মাঝে রয়েছে পানি বিদ্যুৎ এবং পারামাণবিক শক্তি। দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে ১৯টি পারামানবিক চুল্লী কার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

চীনের এনার্জি সেক্টরঃ

সাম্প্রতিক সময়ে চীনের শক্তি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনের সাংবিধানিক ধারনা অনুযায়ী গত ৫ বছরে এর জিডিপি ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন আগে তার অভ্যন্তরীন জ্বালানী চাহিদা পূরণের জন্য কয়লার উপর নির্ভরশীল ছিলকিন্তু বর্তমানে তা তেলে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু তারপরও চীন এখন তার জ্বালানী চাহিদা পূরণে ৬৫% কয়লার উপর নির্ভরশীল। ২০০৩ সালে চীন জাপানকেঅতিক্রম করে ২য় অবস্থানে চলে আসে, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের পরেই তাদের অবস্থান যারা সবচেয়ে বেশি তেলের ভোক্তা। শুধুমাত্র ২০০৩ সালেই চীন ২৭৫ মিলিয়ন টন তেল আমদানি করে যা ২০০২ সালের তুলনায় ১১.৫% বেশি এবং বিশ্বের মোট তেল সম্পদ ভোগের ৭.৬%। ২০০৩ সালে বিদ্যুতের ভোগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে (১৫%) বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন তার জ্বালানী শক্তি আমদানীর জন্য ৬০ শতাংশ মধ্যপাচ্যের উপর নির্ভরশীল। ১৯৯০ সালের দিকে জ্বালানী তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় চীন ইরান এবং ইরাকের তেল ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ করতে শুরু করে এবং ইরানের তেলের নিরাপত্তা ইস্যুতে কাজ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রি-ইম্পসন মতবাদঃ

মার্কিন রাষ্ট্র্রপতি রিচার্ড নিক্সন তার শ্রেষ্ঠ কার্যের অন্যতম দঞযব জবধষ ডধৎ’ এ বলেছেন যে, আমেরিকা সামরিক অস্ত্রের ব্যবহারে কখনও ইতস্তত হবে না যখন এর বড় কোন স্বার্থ হুমকির সম্মুখীন হবে। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তার ডকট্রিন অব প্রি-ইম্পসন এ বলেন, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা নীতি হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কোন দেশ তাদের জন্য হুমকি হয়ে দাড়ালে তাকে যে কোন সময় যে কোন অবস্থায় আক্রমন করা যাবে বলে মতামত দেয়া হয়েছে। এমনকি কোন সহযোগী দেশের সাথে আলোচনা করা ছাড়াই আক্রমণ চালাতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দঘধঃরড়হধষ ঝবপঁৎরঃু ঝঃৎধঃবমু চধঢ়বৎ’ এ উল্লেখ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী কোন দেশে তারা অবরোধ আরোপ করতে পারবে এবং গণতন্ত্র ও মুক্তবিশ্ব গড়তে তার সম্পদসমূহ ব্যবহার করতে পারবে।
এই ডকট্রিন দেখা গিয়েছিল ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের সময়। এই সময় আমেরিকার বৃহৎ জাতীয় স্বার্থ হুমকির সম্মুখীন হলে এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য আমেরিকা তার অনেক আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে কুেয়তকে সমর্থন করে। এখানে এমন একটি কথাও প্রচলিত আছে যে ইরান ও উত্তর কোরিয়া তাদের পারামাণবিক প্রকল্প বাতিল না করায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধেও এই নীতি গ্রহণ করেছিল। এখান থেকেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এই প্রি-ইম্পসন নীতি কি চীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য! সম্ভবত নয়।


যুক্তরাষ্ট্রের নীতিঃ

যুক্তরাষ্ট্র তার একক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মত পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও তাদের আধিপত্য বিস্তারের জাল বুনেছে। পূর্ব এশিয়ার দেশ চীনকে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিন্তা করে। আর তাই এদেশের অবস্থানকে কিভাবে দুর্বল করা যায় সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের কৌশল গ্রহণ করছে। এমনকি চীনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উস্কে দিচ্ছে। তিব্বতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে তারা চীনকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে নিবারণের নিমিত্তে তাইওয়ানকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। গোটা নব্বই দশক জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে ও বিভিন্ন চুক্তির আওতায় তাইওয়ানকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করেছে। পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র হল জাপান। জাপান যুক্তরাষ্ট্রের অনুগামী হওয়ায় এই রাষ্ট্রটিকে কাজে লাগিয়ে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার চীনের প্রভাব খর্ব করতে

বর্তমান উদীয়মান শক্তি ভারতের সাথে মৈত্রী স্থাপেেন আগ্রহী হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। চীন সাগর এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি মিত্র হল দক্ষিণ কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার পারামাণবিক কর্মসূচী এবং এটি সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারী হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়াকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে সে উত্তর কোরিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
আবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়ার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি শত্রুভাবাপন্ন দেশ। তাই এই দেশটির প্রভাব খর্ব করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের অন্যান্য বৃহৎ শক্তিগুলোর সাথে মৈত্রী স্থাপন করেছে। এভাবে দেখা যাচ্ছে সমগ্র পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্র তার একক আধিপত্য বজায় রাখতে পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগুলোকে ঢেলে সাজিয়েছে।

পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনাঃ

¯œায়ুযুদ্ধ অবসানের পর যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। সেগুলো হলঃ
১. সেই অঞ্চলের শক্তিসাম্যাবস্থা,
২. সেই অঞ্চলের ত্রুটিপূর্ণ বা বিবাদপূর্ণ এলাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং
৩. সেই অঞ্চলে নতুন শক্তি উত্থানের প্রবণতা।
যেসব দেশ অর্থনীতিতে শক্তিশালী, জনসম্পদ ও সামরিক দিক থেকে প্রতাপশালী তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ধরছে। পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হল চীন, জাপান এবং রাশিয়া। এগুলো আঞ্চলিক শক্তি হলেও এখনও সুপার পাওয়ার নয়। এই তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে জাপানের সামরিক শক্তি ভালো না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেকেই এ অঞ্চলের প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে তিনটি শক্তির আনাগোনা লক্ষ্য করা যাবে। যথাঃ চীন, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে আবার চীন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কেননা চীনের অর্থনীতি দ্রুততার সাথে অগ্রসর হচ্ছে। আর এই অগ্রসরমান অর্থনীতিকে তারা যেকোন মুহুর্তেই সামরিক শক্তিশালীকরণে কাজে লাগাতে পারবে। আবার ¯œায়ুযুদ্ধ পরবর্তীতে রাশিয়ার অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তারা বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়েছে এবং বৈদেশিক নীতিরও তেমন কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। তাই এই অঞ্চলে রাশিয়া তার প্রভাব ধরে রাখলেও বাড়াতে পারবেনা বলে ধারনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে নিজেই এই অঞ্চলের প্রভাবশালী সদস্য আবির্ভূত হতে পারে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরে তার সামরিক শক্তি বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আবার দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং তাইওয়ানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্কের কারণে এ অঞ্চলে তার অবস্থান আরও সংহত হয়েছে। তদুপরী এ অঞ্চলে স্থায়ী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছে।

জাপান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলঃ

এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপান সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। জাপান তার সামন্তবাদী সমাজ থেকে বের হয়ে আসতে বাধ্য হয় যখন ১৮৫০ এর দশকে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক হুমকীর শিকার হয়। পরবর্তীতে পশ্চিমা প্রযুক্তি ও শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের একক অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়। যার ফলশ্রুতিতে ১৯০৫ সালে রাশিয়াতে আক্রমন করে তার শক্তির প্রদর্শন করে । পরবর্তীতে দঃ-পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশ ও পর্তূগীজ সা¤্রাজ্য বিলোপের লক্ষ্যে ইউরোপীয় শক্তি জার্মানি ও ইতালীর সঙ্গে হাত মেলায়। এবং জাপান এ অঞ্চলে তার নিজস্ব সা¤্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে ধীর লয়ে এগুতে থাকে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবারে আক্রমন করে বসে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৪৫ সালের ৬ও ৯ আগষ্ট যথাক্রমে হিরোসীমা ও নাগাসাকিতে পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ভূ-কৌশলগত কারনে চীন এবং রাশিয়ার সহিত জাপানের সম্পর্ক সর্বদাই দ্বান্দ্বিক। পুরোনো শত্রুতা , অর্থনৈতিক প্রতিযোগীতা এবং এশিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব চলছে। রাশিয়ার সহিত হোক্কাইডো দ্বীপ নিয়ে দ্বন্দ্ব, চীন কর্তৃক জাপানের অর্থনৈতিক বাজার দখল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে থাকা জাপান চতুর্মূখী সংকটে রয়েছে। তবে চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব এবং নতুন করে ভারত-মার্কিন মৈত্রী এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার নতুন সমীকরণে জাপানের ভূমিকা বাড়িয়ে তোলে,বিশেষ করে চীন যখন দঃ চীন সাগরে তার সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করে।

আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের ভূমিকা ঃ

আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের ভূমিকা বর্তমান সময়ে অগ্রগণ্য। বিশ্বের চতুর্থ সেনাবাহিনী ভারতের, নৌ-বাহিনীর অবস্থান বিশ্বে ৬ষ্ঠ এবং বিমান বাহিনীর অবস্থান ৮ম। ভারত হচ্ছে পৃথিবীর সপ্তম বৃহৎ রাষ্ট্র। উপরন্তু ভারত পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। শিল্প উৎপাদনের দিক দিয়েও ভারতের অবস্থান সপ্তম। প্রযুক্তিগত দিক হতেও ভারত অনেক এগিয়ে গেছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পাশ্ববর্তী দেশগুলোর উপরেও ভারতের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। ভারতের আঞ্চলিক শক্তির প্রভাবকে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট গুরত্ব দিচ্ছে। চীনের ক্ষমতাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমেরিকা ভারতের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে আগ্রহী।আমেরিকার ঘধঃরড়হধষ ওহঃবষষরমবহপব ঈড়ঁহপরষ (ঘওঈ) যেটি ঈওঅ সহ ১৫ টির মত গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করে সেটি অকপটে ঘোষণা করেছে যে,“১৫বছরের অধিক সময় ধরে ভারত হচ্ছে একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বি অর্থনৈতিক,সামরিক,প্রযুক্তি এবং পারমাণবিক ক্ষমতার অধিকারী।”
ভারতের এই আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব চীন,জাপান, রাশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জটিল করে তুলছে। ঘধঃরড়হধষ ওহঃবষষরমবহপব ঈড়ঁহপরষ (ঘওঈ) ভবিষ্যদ্বানী করেছে যে, ভারত, চীন এবং রাশিয়া কার্যত ভূ-কৌশলগত মৈত্রী জোট গঠন করতে পারে আমেরিকা ও পশ্চিমাদের প্রভাব ঠেকাতে। যদিও এটি কম সম্ভাবনাময়। ঈওঅ বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, ভারত হল একটি ংরিহম ংঃধঃব (দোলায়মান রাষ্ট্র)। যারা যুদ্ধ এবং শান্তিকে দোল খাওয়াচ্ছে। ভারত পুরোপুরি আগ্রহী নয় যে আমেরিকা তাদের সহযোগিতায় চীনের উপর প্রভাব বিস্তার করুক।
আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্কের ব্যাপারে চীন সচেতন। ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মৈত্রীকে চীন কখনই ভালো চোখে দেখেনা। বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ হেনরী কিসিঞ্জার বলেছেন- ‘কেন্দ্রীভূত শক্তি আটলান্টিক থেকে স্থানান্তরিত হয়ে প্যাসিফিক এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এখন ভারত হচ্ছে আমেরিকার সবচেয়ে বড় কৌশলগত সহযোগী।’
অন্যদিকে ভারত তার নিরাপত্তার জন্য চীনকে হুমকি মনে করছে। চীন এবং পাকিস্তান যদি সামরিক দিক দিয়ে জোট গঠন করে তবে তা ভারতের জন্য জটিলতর হবে। ভারত মনে করে চীন মায়ানমারের সহায়তায় এবং অন্যান্য প্রতিবেশি দেশকে নিয়ে তাকে একটি নিদিষ্ট গন্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলবে। আর এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ভারত। চীনের আধুনিকতাবাদ ও পারমাণবিক অস্ত্রের সমকক্ষতা অর্জনের জন্য এবং চীনকে নিবারণের জন্য সামরিক সহযোগিতার জন্য রাশিয়ার সাথে চুক্তি করেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহ ও যুক্তরাষ্ট্রঃ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহ নিজেকের মধ্যে বাণিজ্যিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সংহতি গড়ার জন্য আসিয়ান গঠন করেছে। আসিয়ান আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বিবাদ মীমাংসার প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে। আসিয়ান সাথে সাথে এখানে গড়ে উঠেছে এআরএফ। যার মাধ্যমে অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলো এই অঞ্চলের সাথে সংহতি স্থাপন করতে পারছে। আসিয়ান ভুক্ত কিছু কিছু দেশ এর সাথে চীনের সীমান্ত সংক্রান্ত ইস্যুতে বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, মালেশিয়া, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া।ভিয়েতনামের সাথে চীনের বিরোধ রয়েছে অনেক আগে থেকেই। তবে বর্তমানে এটি প্রতিয়মান হচ্ছে যে কিছু কিছু দেশ নিজেদেরকে অর্থনীতি ও নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়ে সাবলম্বী মনে করছে। জাপান ও চীন এর অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা ইস্যু আগের থেকে কিছুটা খর্ব হয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরে। আসিয়ান ভুক্ত কিছু কিছু দেশ চায় যে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারির ভূমিকা এখানে বৃদ্ধি হোক। যুক্তরাষ্ট্রও তাই এ অঞ্চলের দেশগুলোকে চীনের আগ্রাসন থেকে বাঁচানোর নাম করেনাক গলানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এর ফলে চীনের ভূমিকা কিছুটা খর্ব হবে। অন্যদিকে, বেইজিং চায় আসিয়ান ভুক্ত দেশগুলো ‘ইধহফ ধিমড়হ’এর ভূমিকা পালন করুক। এতে চীনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকবে এবং বৈরী সম্পর্ক এড়ানো যাবে।
আসিয়ান রিজিওনাল ফোরাম ঃ
আসিয়ান রাষ্ট্রগুলোর বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা আলোচনায় চায়নার সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটা অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা ভীতিও দূর করেছিল।
এআরএফ তিনটি পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে :
(১) পারস্পারিক আত্মবিশ্বাসের নির্মাণ,
(২) কূটনৈতিক বাঁধার সমাধান এবং
(৩) দ্বন্দ্বের সমাধান।
চায়ানার সংযুক্তি এআরএফ কে স্পষ্টত দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত বিষয়ের সমাধানে উৎসাহিত করেছিল । ২০০৪ সালে জাতীয় সামরিক শ্বেতপত্রে বলা হয় যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এআরএফ হবে সব থেকে গুরুত্বর্পূণ দাপ্তরিক কেন্দ্র। এটা ইতিবাচক ভূমিকা পালনে এবং এ অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষা সহযোগিতায় আন্ত-রাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে আশার সঞ্চার করেছে।
এ আর এফ আলোচনারপরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করছে। কেননা, এআরএফ এর কারণে দক্ষিণ চীন সাগর সমস্যার ব্যাপারে চীন তার আচরণ নমনীয় করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক আইন এবং সমুদ্র আইন এর ভিত্তিতে স্প্রাটলী দ্বীপপুঞ্জসহ অন্যান্য দ্বীপের সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কুইং কুইচেন, চাইনীজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসিয়ানভুক্ত অংশীদারদের সাথে এক সভায় কেবল বহুপাক্ষিক বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছেন। চায়না চায় যে আসিয়ান রাষ্ট্রগুলোর সাথে তার বহুপাক্ষিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হোক । ১৯৯৬ সালের মে মাসে চায়না জাতীয় পরিষদের স্থায়ী কমিটিতে ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন সংশোধন করা প্রয়োজন। সেই সাথে চীন ঘোষণা করে তারা কাউকে চুক্তি করতে বাধ্য করবে না। আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে চীনের সম্পর্কের উন্নতি স্বত্ত্বেও কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত কারণে কেউই সামরিক আধুনিকিকরণেরসম্ভবনাকে হ্রাস করে নি।
রাশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলঃ
রাশিয়া কৌশলগত জটিল নিরাপত্তা পরিবেশে এখনো প্রভাবশালী সামরিক শক্তি হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও বর্তমানে তার কিছু অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সম্প্রতি আবারো তার অর্থনীতি মাথা তুলে দাড়াচ্ছে যা ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে।
প্রফেসর রোকসানা কিবরিয়া অনুভব করেছেন যে চীন ও রাশিয়া পুনরায় এশীয় প্রশান্তীয় অঞ্চলে কৌশলগত নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক স্থাপন করবে। যা একবিংশ শতাব্দীতে কৌশলগত বন্ধুত্বের চিহ্ন প্রকাশ করে। এই বন্ধুত্বের চাবিকাঠি হল নিরাপত্তা , রাজনৈতিক গভীরতা , অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন। ১৯৯২ সালে রাশিয়া , চীন, কাজাখাস্তান, কিরগিজিস্তান এবং তাজিকিস্তানের মধ্যে এক বেসামরিকরণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে সীমান্তের নির্দিষ্ট এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার ও আক্রমণাত্মক অস্ত্র হ্রাসের কথা বলা হয়। ১৯৯২ সালের মে মাসে চায়না-রাশিয়ার মধ্যে সীমান্ত ব্যাবস্থাপনা পদ্ধতি স্বাক্ষর হয়। ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ সালে তারা প্রথম পরমাণু অস্ত্র ব্যাবহার না করতে সম্মত হয়। চায়না, রাশিয়া ও মধ্য এশীয়ার দেশগুলো সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন গঠন করে। যার সম্প্রতি সফলতা হল উজবেকিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য বিতাড়ন করা। এতে করে এশিয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব ক্ষুন্œ হয়। রোকসেনা কিবরিয়া আরো বলেন, এই সংগঠনটি কিছুদিনের জন্য নিরাপত্তা জোটে রূপ নিতে পারে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কই রাশিয়া ও চায়নার মধ্যে সম্পর্কের অপরিহার্যতা এনে দিয়েছে। ২০০৫ সালে এই দুই সাবেক কমিউনিস্ট প্রতিযোগীর যৌথ সামরিক অনুশীলন অনুষ্ঠিত হয় যাতে চীন ও রাশিয়ার ১০হাজার সৈন্য অংশ নেয়। এটা হতে পারে মার্কিন-ইন্দো জোটের প্রতি একধরণের প্রতিক্রিয়া। একদিকে চীন সমর্থন করছে রাশিয়ার চেচনিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক কমিউনিটির নীতিকে অপরদিকে রাশিয়াও একমত চীনের সাথে তাইওয়ান ও তিব্বতের ব্যাপারে। এছাড়াও রাশিয়া ও চীন আমেরিকার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছে। যেমন ইরাক ইস্যু ও সম্প্রতি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে। যদিও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও কৌশলগত কিছু বিষয় রাশিয়া ও চীনের মাঝে উন্নত সম্পর্ক স্থাপন করেছে তারপরও তারা নিজেদের স্বার্থের ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে। রাশিয়া চীনের নিকট অস্ত্র বিক্রি করলেও চীনের ভবিষৎ এর ব্যাপারে রাশিয়া সুক্ষ্মভাবে সজাগ আছে যাতে চায়না তার জন্য ভীতিকর হয়ে না যায়। মূলত এশীয় প্রশান্ত অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব ক্ষুন্ন করতেই তারা পরস্পরকে সহযোগিতা করছে।


মূল্যায়নঃ

পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মাহসাগরীয় অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর মাঝে বিবাদ নতুন নয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ বিবাদই প্রমান করে এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব কত অপরিসীম। ¯œায়ুযুদ্ব পরবর্তী একক বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বের প্রতিটি কোনে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে আরো জটিল করে তুলেছে । পরমানুশক্তিধর চীন, ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রই মূলত এ অঞ্চলের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাই সমস্যা সমাধানেও তাদেরকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। যদিও বিভিন্ন সময়ে এ আর এফ এর মাধ্যমে বিবাদ মীমাংসায় অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তার অধিকাংশই সফলতার মুখ দেখেনি। তাই আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর শক্তিবৃদ্ধি এখন সময়ের দাবী। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার একরোখা নীতি যেকোন পদক্ষেপকেই ব্যর্থ করে দিতে পারে। কারন এই অঞ্চলের অন্যতম শক্তি জাপান যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় নিজের সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করে থাকে। তাছাড়া ভারতের সহিত নয়া মৈত্রী যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে আরোএকধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি শুধু এই অঞ্চলের জন্যই নয় দঃ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্যও হুমকিস্বরুপ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহর প্রেরণের যে গুজব উঠেছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব খর্ব করা বলে অনেকেই মনে করেন। এ অঞ্চলের যেকোন সংঘাত বিশ্বে অনেক দেশকেই হুমকির মুখে ফেলে দেবে। বিশেষ করে পারমানবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায়না। তাছাড়া বিশ্বের তেল বাণিজ্যের প্রধান পথ হওয়ায় এ অঞ্চলের গুরুত্ব সর্বাধিক। তাই একে স্থিতিশীল রাখারও বিশ্বের শান্তিকামী দেশগুলোর কর্তব্য।