ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

বেশ কিছুদিন পূর্বে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এর সপ্তাহব্যাপী সম্মেলন শেষে নতুন নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি দশ বছর পর সিপিবি’র সম্মেলনে নির্ধারণ করা হয় পরবর্তী কর্ণধারদের। এ সম্মেলনে চীনের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন লি কেকিয়াং। আগামি বছরের মার্চে তারা দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। নতুন নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এ দেশ তাই ভবিষ্যতে আরও কতদুর অগ্রসর হবে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছে। ২০০২ সালে হু জিনতাও যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন তখন চীন ছিল বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। আর বিদায়ের বেলা তিনি দেশকে দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে রেখে যাচ্ছেন। এখন শি জিনপিং এই অবস্থা হতে কতটা উন্নতি করতে পারেন সেটাই দেখার বিষয়। সাথে সাথে বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের ভূমিকা ভবিষ্যতে কেমন হবে সেটাও দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন অনেকেই। চীন বর্তমানে তার অর্থনীতিকে জোরালো অবস্থানে নেয়ার জন্য এখনও বিশ্ব রাজনৈতিক ইস্যুগুলোতে তেমন প্রভাব বিস্তার করছেনা। বিশেষত তারা আরও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হয়েই বিশ্বের মোড়লিপনা নিয়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছুক।

চীনে এমন এক সময়ে ক্ষমতার পালাবদল হল যখন দলটিকে অভ্যন্তরীন এবং আন্তর্জাতিক নানামুখী চাপের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। অভ্যন্তরীন বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে দলীয় নেতাদের দুর্নীতি, রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য চাপ, বিভিন্ন প্রদেশে স্থানীয় কয়েকটি ইস্যুতে আন্দোলন, পার্টির নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। দুর্নীতি নিয়ে সিপিবি বর্তমানে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি সিপিবি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে দলের অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা ও পলিটব্যুরোর সদস্য বো শিলাইয়ের দুর্নীতির অভিযোগ জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সম্মেলনে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও সতর্ক করে দিয়ে জানান, ‘বর্তমানে দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে তা কমিউনিস্ট পার্টিকে যে কোন সময়ে ধ্বংস করে দিতে পারে।’ তাই নতুন নেতা শি জিনপিং দুর্নীতিকে কঠোর হস্তে দমনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

আবার খাদ্যঘাটতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, মজুরি নিয়ে বিরোধ, পরিবেশ বিপর্যয়, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব প্রভৃতি বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়ে দিনদিন বিক্ষোভের ঘটনা বাড়ছে চীনে। গত অক্টোবেরে সাংহাই প্রদেশের ৯০ মাইল দক্ষিণে বন্দরনগর নিংবোতে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। একটি রাসায়নিক প্রকল্প সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে ওই বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তারা। পরে কর্তৃপক্ষ জনগণের দাবি মেনে নেয়। জুনে সিচুয়ান প্রদেশে একটি তামা শোধনাগার প্রকল্পের বিরুদ্ধে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ওই মাসেই সাংহাই প্রদেশের কিদং এলাকায় বর্জ্য নিষ্কাষনের ব্যবস্থা নিয়ে বিক্ষোভ করে স্থানীয় ব্যক্তিরা। তিনটি ঘটনাতেই শেষ পর্যন্ত জনগণের দাবি মেনে নেওয়া হয়। তবে দেশব্যাপী সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে সাধারণ মানুষের ভূমি অধিগ্রহণ ও উচ্ছেদের বিষয়টি। তাই এই বিষয়গুলো ভবিষ্যতে যাতে আরও প্রকট হতে না পারে সেজন্য নেতৃবৃন্দকে যথেষ্ঠ সচেতন হতে হবে।

ইদানিং ইন্টারনেটে জনগণ ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী মন্তব্য করে বসছে। চীনে গুগল বন্ধ করে দেয়া হলেও অন্য আরেকটি সাইট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং সেখানে সরকারের সকল কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যদিও সরকারবিরোধী তৎপরতা বন্ধে গঠন করা হয়েছে ইন্টারনেট পুলিশ, তবে পুলিশের তৎপরতা সত্ত্বেও ইন্টারনেটে সরকারের সমালোচনা বন্ধ করা যাচ্ছেনা। তাই গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করাও একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে নতুন নেতৃত্বের জন্য।

আন্তর্জাতিক যে বিষয়গুলো নিয়ে নতুন নেতৃত্বকে চাপের মুখে পড়তে হবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পূর্ব চীন সাগরের মালিকানা নিয়ে জাপানের সাথে বিরোধ, বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রচেষ্টা, মিয়ানমার ও ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সখ্যতা বৃদ্ধি এবং চীনে এর প্রভাব প্রভৃতি। সম্প্রতি বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার এবং কম্বোডিয়া সফর করলেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন কৌশলগতভাবে চীনকে চাপে রাখতেই এ দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক শাসন চলাকালে মিয়ানমার যখন পুরোপুরি একঘরে ছিল ওই সময় দেশটির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল চীন। কিন্তু বর্তমানে মিয়ানমার কিছুটা শাসন সংস্কার করায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশটির সম্পর্ক ক্রমশ ভালোর দিকে যাচ্ছে যা চীনের স্বার্থকে খর্ব করবে। আবার জাপানের সাথে দ্বীপ নিয়ে চীনের বিরোধীতার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে সমর্থন এবং সাহস যুগিয়ে যাচ্ছে যেটা চীনের মাথাব্যথার কারণ। চীনের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সীমান্ত নিয়ে বিরোধ ও তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামাকে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে ভারতের সঙ্গে অনেকদিন ধরেই খিটিমিটি চলছে চীনের। তা সত্ত্বেও পারস্পরিক স্বার্থেই বন্ধুত্ব গড়ে তোলায় আগ্রহ রয়েছে দুই পক্ষেরই। শি জিয়ানপিংকে তাই ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।

বর্তমানে চীন তার প্রভাব এশিয়া, ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ না রেখে আফ্রিকাতেও তা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আফ্রিকায় চীন অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে। বিকল্প জ্বালানী উৎসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে চীন এর মধ্যে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। উভয় পক্ষের মধ্যে আমদানি-রপ্তানিও বাড়ছে। এই সম্পর্ককে আরও কিভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তার জন্য নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে শি জিনপিংকে।

চীনের নতুন নেতৃত্বকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে যে বিষয়টিতে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে সেটি হল অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো। এতে দেশের জনগণ সন্তুষ্ট থাকবে এবং স্থিতিশীলতা আসবে। শি জিনপিং আগামি ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। এর মধ্যে চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক সংকট চলছে তার মাঝেও চীন তার প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রেখেছে। তাই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তির অধিকারি এ দেশটি কিভাবে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং বিশ্বের দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিভাবে চীনের প্রতি নিবদ্ধ হয় তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববাসী। আর এর জন্য নতুন নেতৃত্বকে সবোর্”চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এক্ষেত্রে তারা যে বিজ্ঞানভিত্তিক সংস্কারের কথা বলছেন তা দেশের জন্য কতটুকু উপযোগী তা সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে যেকোন ভুল সিদ্ধান্ত এই মুহূর্তে চীনকে অনেকখানি পিছিয়ে দিতে পারে।