ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

পশ্চিমা গণতন্ত্রের আদর্শের দিকে মিয়ানমার ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। শাসনব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর আধিপত্য এখনও সেখানে রয়ে গেলেও বেশ কিছু সংস্কার পশ্চিমা নেতৃবৃন্দকে আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে ২০১০ সালে সে দেশের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচিকে গৃহবন্দীত্ব থেকে মুক্তি দেয়া হলে এবং পরবর্তীতে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নিকট সহজেই মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন থেইন সেইন সরকার। ফলে ভূ-কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ দেশটিকে নিজের মতাদর্শে পুরোপুরি বিশ্বাসী করে তোলার জন্য বিশ্বের মোড়ল বলে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উঠেপড়ে লেগেছে। যার সর্বশেষ নজির আমরা দেখতে পেলাম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মিয়ানমার সফরের মধ্যে দিয়ে।

গত ৬ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ৫৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই তিনি বৈদেশিক নীতির অংশ হিসেবে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং কম্বোডিয়া সফর করলেন। দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের অধীনে থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিয়ানমারের কোন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেনি এবং মিয়ানমার ছিল বিশ্ব সম্প্রদায় হতে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু বর্তমানে মিয়ানমারের অবস্থার পরিবর্তন হওয়ায় বারাক ওবামা প্রথম কোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সে দেশ সফর করলেন। এ সফর এটাই নির্দেশ করে যে, ভবিষ্যতে মিয়ানমারে যদি গণতান্ত্রিক শাসন অব্যাহত থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তার পাশে থাকবে।

ভূ-কৌশলগত দিক থেকে মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্রের নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ভবিষ্যতে পৃথিবীতে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার পথে চীনই হবে তার প্রধান বাধা। বিশেষ করে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেভাবে ঘটছে তা যেকোন মুহুর্তে বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ছিটকে ফেলে দিতে পারে। আবার চীনের সামরিক প্রধান্যও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র চীনকে তার পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকার পথে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছে। আর এই চীনের একটি সীমান্তবর্তী দেশ হল মিয়ানমার এবং মিয়ানমারের সাথে চীনের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই চীনকে ভবিষ্যতে প্রতিহত করতে হলে মিয়ানমারকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রয়োজন।

ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগর এলাকায় চীন অন্যতম নৌ-পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই এই অঞ্চলে সামরিক অবস্থান জোড়ালো করতে মিয়ানমারের প্রয়োজনীয়তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সর্বাধিক। আবার মিয়ানমার হল অপার প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী। বিশেষ করে তার প্রচুর পরিমাণে গ্যাসের মজুদ রয়েছে। এই মজুদে অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করার ক্ষেত্রেও মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্রের নিকট তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার সাথে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুরাষ্ট্র বলে বিবেচিত। তাই উত্তর কোরিয়ার সাথে মিয়ানমারের সম্পর্কের অবনতি ঘটানোও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

বিশ্লেষকরা ধারনা করছেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল হবে ভবিষ্যতের ¯œায়ুযুদ্ধের ক্ষেত্র। আর এই ¯œায়ুযুদ্ধে নেতৃত্ব দেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন পরষ্পর বিরোধী ভূমিকায়। যুক্তরাষ্ট্র তাই আগেভাগেই এ অঞ্চলে তার মিত্র খোঁজার চেষ্টায় রত রয়েছেন। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় ওবামার সাম্প্রতিক সফর সেটাই ইঙ্গিত বহন করে। চীনকে চাপে রাখার জন্য উপরোক্ত দেশগুলো কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সময়ে বারাক ওবামা মিয়ানমার সফর করায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি আবার সামনে চলে এসেছে। এই সফর বাংলাদেশের নিকটও বিশেষ তাৎপর্যবহ। কেননা রোহিঙ্গা ইস্যুটির সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বারাক ওবামার মিয়ানমার সফরের পূর্বে সে দেশের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচি ভারত সফর করেছিলেন। সেই সফরে তিনি এনটিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে যে মন্তব্য করেছেন তা বাংলাদেশকে হতবাক করেছে। তিনি বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে জাতিগত বৌদ্ধ ও মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যকার সহিংসতা বড় ধরনের ‘আন্তর্জাতিক ট্র্যাজেডি’। তার মতে, বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত এই ঘটনার জন্য বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীরাই প্রধানত দায়ী। তাই তিনি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের পশ্চিমাংশে অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করার দাবি জানান।
গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামে রত নেত্রীর এই বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষ কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। ক্ষমতায় আসার লোভে সুচি সম্পূর্ণ মিথ্যাচার করেছেন বলে অনেকে ধারনা করছেন। বলা হয়ে থাকে সুচি মহাত্মা গান্ধী এবং গৌতম বুদ্ধের মত অহিংসা এবং অহিংসতার দর্শনে বিশ্বাসী। এখন দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়ার জন্য তিনি মিথ্যা ও অনৈতিহাসিক তথ্য দিয়ে হিংসা এবং সহিংসতাকে উস্কে দিচ্ছেন। সুচির মত অক্সফোর্ডের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত, আধুনিক, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াকু নেত্রী যখন তার দেশের নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে এমন নিষ্ঠুর মনোভাব প্রকাশ করেন তখন বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকেনা।

আমরা সুচিকে মনে করে দিতে চাই, রোহিঙ্গারা যুগ যুগ (অন্তত চারশো বছর) ধরে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্য রাখাইনে বসবাস করে আসছে। এ ইতিহাস কারও অজানা নয়। ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে ‘রোহিঙ্গা’ বা ‘রোসাঙ্গ’ নামের স্বাধীন রাজ্য ছিল। রোহিঙ্গারাই শাসন করত সে রাজ্য। মিয়ানমারের রাজা বোদাওয়াফা এ অঞ্চল দখল করার পরেই না সেখানে বৌদ্ধ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বার্মা যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা পেয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রে যাত্রা করে তখন পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। সবকিছু তো পাল্টে গেলো ১৯৬২ সালে। গণতন্ত্র হত্যা করলেন জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। তারপর থেকেই না মানবাধিকার কেড়ে নেওয়া হল রোহিঙ্গাদের, ভোটাধিকার হরণ করা হলো, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসুযোগ হরণ করা হলো, জন্ম নিবন্ধন বাতিল করা হলো, জাতিগত পরিচয় প্রকাশের অধিকার হরণ করা হলো।

রোহিঙ্গারা ভেবেছিল সুচি হয়তো তাদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হবেন, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবেন। কিন্তু সুচির সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে বোঝা গেল সে আশা গুড়েবালি। সুচির মন্তব্য যেমন হতাশ করেছে রোহিঙ্গাদের, তেমনি হতাশ করেছে বাংলাদেশকে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়কে।

উল্লেখ্য যে, গত জুনের পর থেকে রাখাইন রাজ্যের জাতিগত বৌদ্ধ এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যকার দু’দফা সহিংসতায় মিয়ানমারের হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। গত মাসে সহিংসতায় সেখানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। শত শত ঘরবাড়ীতে আগুন দেয়া হয়। সরকারি হিসাবেই দু’দফা সহিংসতায় কমপক্ষে ১৬৮ জন নিহত হয়েছে। এরই মধ্যে গত ১৯ নভেম্বর বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডেন্ট মিয়ানমার সফর করায় তা কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। মিস্টার ওবামা মুসলিম রোহিঙ্গা ও বৌদ্ধদের মধ্যে সহিংসতা বন্ধের আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে রাখাইন সম্প্রদায় এবং মুসলমানদের মধ্যে সহিংসতার পেছনে কোন অজুহাত দ্বার করানো উচিৎ হবেনা। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের সমাজে অন্তর্ভূক্ত করার আহবানও জানিয়েছেন তিনি। রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া ভাষণে ওবামা বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। সহিংসতা বন্ধ না করলে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবেনা। অন্যদের মত রোহিঙ্গাদেরও সমমর্যাদা পাওয়া উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। বারাক ওবামা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যে অভিমত পোষণ করেছেন তা আশাব্যঞ্জক। অন্তত সুচির মত তিনি মিথ্যা প্রলাপ করেননি। এজন্য ওবামাকে সাধুবাদ জানাই। তবে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু প্রতিশ্রুতিমূলক বক্তব্যই যথেষ্ঠ নয়, তার জন্য যথেষ্ঠ কাজ করতে হবে।

মিয়ানমার সরকার এই মুহুর্তে তার দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার স্বার্থে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। রাজনীতিতে সেখানে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। জনগণ এখন কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। মিয়ানমারের এ পরিবর্তন বিশ্ববাসীর মনেও আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে গণতন্ত্রকামী দেশগুলো মিয়ানমারকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। তাই এসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব সম্প্রদায় যদি রোহিঙ্গা ইস্যুটিতে মিয়ানমার সরকারকে পরিমিত চাপ প্রদান করে তবে এ ঐতিহাসিক সমস্যার সমাধান হতেও পারে।

রোহিঙ্গা ও বৌদ্ধদের মধ্যে সৃষ্ট দাঙ্গার ব্যাপক প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে। বাংলাদেশও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চায়। তাই বারাক ওবামা রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তা কতটুকু বাস্তবায়িত হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। আবার দৃশ্যত সামরিক শাসন থেকে বেড়িয়ে আসা মিয়ানমারের সংস্কারকে তিনি আরও কতদূর এগিয়ে নিতে পারেন তা জানার আগ্রহ সবার মধ্যে। ওবামার এ সফরের আগেই মিয়ানমারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পর্কের নতুন এক সমীকরণ রচিত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয় বিশ্বের সব পরাশক্তিই এখন মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মুখিয়ে আছেন। মিয়ানমারের প্রাকৃতিক সম্পদ তাদেরকে প্রলুব্ধ করে তুলছে। যা এ অঞ্চলের প্রভাবশালী বলে পরিচিত চীনকে চিন্তিত করে তুলছে। এতদিন মিয়ানমারের প্রাকৃতিক সম্পদে একাই ভোগ দখল করে রেখেছিল চীন। সেটা ভবিষ্যতে সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে চীনের নতুন নেতৃবৃন্দ চিন্তিত। শুধু প্রাকৃতিক সম্পদে ভাগ বসানোই নয় বরং এ অঞ্চলে পশ্চিমাদের সামরিক প্রাধান্য স্থাপনেও মিয়ানমারকে তাদের প্রয়োজন। আর সেই প্রয়োজনে মিয়ানমার ধীরে ধীরে সাড়া দিচ্ছে। এ বিষয়টিও চীনকে মর্মাহত করেছে। তাই ভবিষ্যতের চীন মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের ক্ষেত্রে মিয়ানমার কার পক্ষাবলম্বন করবে এবং এতে কোন পক্ষ লাভবান হবে সেটাই দেখার অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববাসী।