ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

কিছুদিন পূর্বে দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নেতৃত্বে বিরাট পরিবর্তন আসছে বলে আভাস দেয়া হয়েছে। কেননা দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর সেই নির্বাচনে প্রত্যেকটি দেশের ক্ষমতাসীন দলগুলো নাজুক অবস্থায় রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এই প্রতিবেদন অবশ্যই উড়িয়ে দেয়ার মত নয়। বিশেষ করে যারা রাজনীতি সম্পর্কে একটু সচেতন তারা মাত্রই জানেন দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল এবং আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীনরা মোটেই সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। অথচ বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন সরকার জনগণের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তাদের জনপ্রিয়তা এখন নিম্নতলায়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এবং পরিবর্তনের আওয়াজ তুলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু তারা কি জনগণকে কোন পরিবর্তনের মুখ দেখাতে পেরেছে অথবা দেশ কি ডিজিটালাইজড হয়েছে? দেশ সামান্য যে ডিজিটালাইজড এর ছোঁয়া পেয়েছে তা আওয়ামী লীগের এজেন্ডার জন্য নয় বরং সময়ের প্রয়োজনে আপনাআপনিই হয়েছে। সুতরাং ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত দেশকে প্লাস পয়েন্ট কিছু দেখাতে পারেনি। বরং এই ধারনাটি একটি হাস্যতাচ্ছিল্লের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীদের দুর্নীতি, অদক্ষতা, ছাত্রলীগের রংবাজি, চাঁদাবাজি দেশবাসীকে হতাশ করেছে। গুম, হত্যা, শেয়ার বাজারে কেলেংকারি, কৃষিপণ্য নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তি, নারী নির্যাতন, সাংবাদিক নির্যাতন প্রভৃতি ইস্যু নিয়ে দেশের জনগণ আজ শঙ্কিত। অথচ গতজোট সরকারের কুশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতেই মানুষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু তারাও ক্ষমতায় এসে সেই পূর্বের সরকারের ধারাবাহিকতাই বজায় রেখেছেন। তাই দেশের জনগণ আজ আবার নেতৃত্বের পরিবর্তন দেখতে চাচ্ছে। সুতরাং আওয়ামী লীগ বিএনপি ছাড়া কোন বিকল্প না থাকায় সামনের নির্বাচনে জনগণ বর্তমান বিরোধী দলকেই বেছে নিতে পারে এমন ধারনা করা কখনই অসমীচীন নয়।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থাও একই। বিশেষ করে দুর্নীতির ইস্যুটি সেদেশের ক্ষমতাসীনদের একবারে ডুবিয়ে দিয়েছে। দুর্নীতি বিরোধী কর্মকাণ্ডের নায়ক এক আন্না হাজারের সমর্থনে এখন হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। একের পর এক কেলেংকারি, সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন বিষয়ে শরিকদের সঙ্গে মতভেদসহ নানামুখী চাপের মধ্যে আছে মনমোহন সিংয়ের সরকার। সর্বশেষ ইউপিএ জোট থেকে তৃণমূল কংগ্রেস বেরিয়ে যাওয়ায় সরকার টিকিয়ে রাখাই এখন কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এমনকি ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত ইউপিএ সরকারের টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়েও অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন। জোড়াতালি দিয়ে মেয়াদ পূর্ণ করতে পারলেও কংগ্রেসের আবার ক্ষমতায় আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েই চলেছে। জনপ্রিয় গণমাধ্যম আল জাজিরা মনে করে মনমোহন সরকারের জনপ্রিয়তা ক্রমেই কমছে। ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তারা উলে¬খ করেছে, দুর্নীতি আর কেলেংকারিতে কঠিন সংকটের মুখেই পড়ছেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন। কয়লা আর টেলিকম কেলেংকারি যেমন সামলাতে পারেনি তার সরকার, জনপ্রিয়তার ধসও তেমনি ঠেকাতে পারছেনা। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের এ চিত্র ফুটে উঠেছে জরিপেও। সিএনএন ও আইবিএনের সম্প্রতি করা যৌথ জরিপ বলছে, মাত্র ৩৮ শতাংশ জনগণ এ সরকারের ওপর সন্তুষ্ট রয়েছে। যেখানে অসন্তুষ্টের পরিমাণ ৫৯ শতাংশ। শহর এলাকার ৬৬ শতাংশ জনগণই মনে করে মনমোহন সরকার পরিচালনার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। ৮-১০ মে পরিচালিত ওই জরিপে উঠে এসেছে, ৪৯ শতাংশ মানুষই মনে করে এ সরকার আর ক্ষমতায় আসবে না। তাদের মতে, এনডিএ নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটই ক্ষমতায় আসছে। আর ৩৯ শতাংশই মনে করেন, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই হতে যাচ্ছেন ভারতের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। ১৭ শতাংশ জনতা বিজেপির এলকে আদভানিকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী দেখতে চান। সম্প্রতি করা হিন্দুস্তান টাইমসের জরিপেও মিলেছে প্রায় অনুরূপ চিত্র। দেখা গেছে, মাত্র ১৭ শতাংশ জনগণ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে আগামীতেও দেখতে চান। এক্ষেত্রে অবশ্য খানিকটা এগিয়ে রাহুল গান্ধী। ২৭ শতাংশ জনগণ চান প্রধানমন্ত্রী হোক রাহুল। তাই কে হতে যাচ্ছে ভারতের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী তা জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন। তবে মনমোহন যে হচ্ছেন না, সবাই বলছেন সে কথাই।

সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও শরিকদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি’র (পিপিপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করা নিয়ে আশংকা নতুন কিছু নয়। এর মধ্যেই বিচার বিভাগের সঙ্গে টানাপোড়েনে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছে সৈয়দ ইউসুফ রাজা গিলানিকে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফও বহু কষ্টে সামাল দিচ্ছেন পরিস্থিতি। এ আবস্থায় দেশটিতে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে গুঞ্জন উঠেছে। পিপিপির নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকদের প্রাপ্তির খাতায় জমা হয়েছে জঙ্গিবাদের দামামা, রক্তের বন্যা, মৃত্যুর মিছিল, অপশাসনের ঝনঝনানি, লাগামহীন দুর্নীতি, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মৌলিক অধিকারের চরম লংঘন। ফলের জারদারি জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপেও উঠে এসেছে তারই প্রতিফলন। মার্কিন গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপের ফল অনুযায়ী, ২০০৮ সালে জারদারির জনপ্রিয়তা ছিল ৬৪ শতাংশ। ২০০৯-এ ৩২, ২০১০-এ ২০, ২০১১-এ ১১ এবং এখন তা কমে ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এত কম জনপ্রিয় জারদারি কখনোই ছিলেন না। ২৭ জুন প্রকাশ করা এ জরিপের ফল অনুযায়ী, জারদারির বিপরীতে সাবেক ক্রিকেট তারকা ও পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রধান ইমরান খানের জনপ্রিয়তা দিনদিন বাড়ছেই। ২০১০ সালে তার জনপ্রিয়তা ছিল ৫২ শতাংশ, ২০১১-এ তা ৬৮ এবং এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের সাতজনই দেশটির নেতা হিসেবে এখন তাকেই চান। জরিপে বলা হয়েছে, জারদারির বিচারে এখনও ভালোই জনপ্রিয়তা টিকিয়ে রেখেছেন পাকিস্তান মুসলিম লীগ নেতা নওয়াজ শরিফ। ২০০৮ সালে তার জনপ্রিয়তা ছিল ৭৬ শতাংশ, কিছুটা কমে এখন তা ৬২। আর সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের প্রতি সমর্থন রয়েছে মাত্র ৩৯ শতাংশ মানুষের। ৩০ জুন ‘দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন’ এবং ১০ সেপ্টেম্বর দ্য নেশনের প্রতিবেদনেও জারদারি সরকারের প্রতি জনসমর্থন হারানোর বিষয় উঠে এসেছে। তাই ধারনা করা হচ্ছে আগামি নির্বাচনে পাকিস্তানে নতুন কোন প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখা যাবে।

বেশ কয়েক মাস যাবত নেপালের রাজনীতিতে সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে মাওবাদীদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দিয়ে দেশ চলছে। এ অবস্থায় আগামী বছরের এপ্রিল বা মে মাসে নতুন করে পার্লামেন্ট নির্বাচনের ডাক দিয়েছে সরকার। এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই নেপালে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটতে পারে। আফগানিস্তানে ২০১৪ সালের ৫ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির নির্বাচন কমিশন এ তারিখ ঘোষণা করেছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে এ নির্বাচনে দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। তাই আফগানিস্তানে নেতৃত্বের পরিবর্তন নিশ্চিত।

সুতরাং দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রত্যেকটি দেশে ক্ষমতাসীন সরকারের যে হালচাল দেখা যাচ্ছে তাতে প্রায় সবকয়টি দেশে নেতৃত্বে পরিবর্তন আসন্ন। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে সরকারের প্রতি জনগণের বিক্ষুদ্ধ হওয়ার একটি অন্যতম কারণ হল ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দান। এই তিনটি দেশেই রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করেছে এ বিষয়টি। আবার সংকট মোকাবেলাতেও ক্ষমতাসীনরা তেমন একটা সফলতার পরিচয় দিতে পারেননি। বাংলাদেশ সরকারের পদ্মা সেতুর মত একটি প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে না পারাটা সেদেশের সরকারের ব্যর্থতার চিত্রকে প্রকট করে তুলেছে। যে এজেন্ডা নিয়ে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেছিল তার সিকিভাগও পূরণ করতে পারেনি। পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী পূর্ব থেকেই বিশ্বখ্যাত দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বেনজির ভূট্টো ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার ফলেই পিপিপি জনগণের বিশাল সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু জারদারির নিষ্ক্রিয়তা ও অক্ষমতা সে জনপ্রিয়তাকে মুহূর্তেই ধুলিস্যাৎ করেছে। মনমোহন সরকার সকল ক্ষেত্রে সুবোধের পরিচয় দিলেও দুর্নীতি ইস্যুতে সে কুপোকাত হয়েছে। নেপালে এখন পর্যন্ত সংবিধানের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর একমত হতে না পারার বিষয়টি সে দেশকে অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছে। আবার আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। সুতরাং ২০১৪ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব পরিবর্তনের যে আশংকা টাইমস অফ ইন্ডিয়া করেছে তা অনেকটাই প্রাসঙ্গিক।