ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

মারকেন্ডি ক্যাটজু
লেখক,ইন্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক, সভাপতি ইন্ডিয়ান প্রেস কাউন্সিল।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে ভাষান্তরিত।

সাম্প্রতিক এক তরুণীকে গণধর্ষণের ফলে (দুর্ভাগ্যবশত মারা গেছেন) রাজধানী দিল্লী এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় যে আন্দোলন হচ্ছে তা আমাকে আন্না হাজারে এর নেতৃত্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল সেটার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। হাজারের ওই আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিঃশ্বেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলন দেখে আমি মনে করি এটাও ধীরে ধীরে কোন ফল ছাড়াই নিঃশ্বেষ হয়ে যাবে। হাজারের আন্দোলন দেশে ০.১ শতাংশ দুর্নীতিও কমাতে পারেনি। সুতরাং বর্তমান আন্দোলন হতেও তেমন সুফল আসবে বলে মনে হয়না।

অবশ্যই আমি চাই আইনের মাধ্যমে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেয়া হোক। তবে এর সাথে যে বিষয়টি আমি বলতে চাচ্ছি তা হলো- প্রথমত, কঠিন সমস্যাগুলোকে শুধুমাত্র আবেগ উন্মত্ততা প্রকাশ (যা সাধারনত টিভি চ্যানেলগুলোতে দেখা যায়) করে অথবা শুধুমাত্র আইন সংশোধন করে (যে বিষয়টি কেউ কেউ তুলে ধরেন) সমাধান করা যাবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত না সমাজে বিশাল পরিবর্তন আসবে। দ্বিতীয়ত, শুধুমাত্র গণধর্ষণই বড় সমস্যা নয় যেটা নিয়ে এত তর্ক-বিতর্ক চলছে বরং জাতির সামনে একই ধরনের আরও অনেক বড় বড় সমস্যা রয়েছে। যেমন- চরমমাত্রার দারিদ্র্য, উচ্চহারে শিশুর পুষ্টিহীনতা, কৃষকের আত্মহত্যা, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, গণশিক্ষার অপ্রতুলতা, চরম বেকারত্ব, আকাশছোয়া দ্রব্যমূল্য ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোকে আমাদের মিডিয়া একবারেই প্রধান্য দেয়না। এমনকি জনতর মন্তর, রামলীলা গ্রাউন্ড এবং ইন্ডিয়া গেটে এ বিষয়গুলো নিয়ে মধ্যবিত্তরা আন্দোলন করলেও তা প্রধান্য পায়না।

আন্না হাজারে এর দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং বর্তমান গণধর্ষণের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন তা একটা গভীর সংকটের পূর্বাভাষ দেয় এবং সেটা হল আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে চরম অসন্তোষ বিদ্যমান। যা তাদেরকে এখন রাস্তায় নেমে আন্দোলনের পথ তৈরি করে দিচ্ছে।

ইন্ডিয়াতে বর্তমানে ১.২ বিলিয়ন মানুষ বাস করে। এর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই হল দারিদ্র্যের শিকার। এখানে আবার মোট জনসংখ্যার ১৫-২০ শতাংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্গত। এই শ্রেণীটি স্বাধীনতার পরে (মূলত শিল্পায়নের কারণে) তৈরি হয়েছে এবং তারা ওই দারিদ্র্য ৮০ শতাংশের তুলনায় উচ্চ জীবণমান ভোগ করছে। তাদের আয়ও দরিদ্র্যদের তুলনায় অনেক বেশি। স্বাধীনতার পর এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীই ইন্ডিয়াতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চেষ্টা চালিয়েছে (উদাহরণস্বরূপ এজন্যই ইন্ডিয়াতে কোন গৃহযুদ্ধ নেই)। এ মধ্যবিত্ত শ্রেণীই আমাদের শিল্পায়ন টিকিয়ে রাখার জন্য বাজার সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের দেশে অনেক চাকুরীর সুবিধা সৃষ্টি করেছে এবং যুব সমাজে বেকারত্বের হার কমিয়েছে।
যাহোক, গত কয়েক বছরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রকৃত আয় এবং জীবণযাত্রার মান অনেক হ্রাস পেয়েছে। এর অন্যতম কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মাত্রাতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা (যার প্রভাব ইন্ডিয়াতেও পড়েছে, যেমন বেকারত্ব বেড়েছে)। মনে কর, পূর্বে কেউ প্রতি মাসে ২০,০০০ রূপি উপার্জন করত কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় ২০,০০০ রূপির প্রকৃত মূল্যমান এখন ১০,০০০ রূপি ( কেননা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে প্রকৃত আয়ের সম্পর্ক বিদ্যমান)। এটা হল ইন্ডিয়ার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাঝে অসন্তোষের প্রধান কারন এবং এই কারনেই তারা মূলত রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে। সুতরাং সহিংসতা এবং আন্দোলনের পেছনে শুধুমাত্র দুর্নীতি বা গণধর্ষণের বিষয়টিই জড়িত নয় বরং এর পেছনে আরও অনেক ( প্রায় কয়েক ডজন) গুরুত্বপূর্ণ কারন জড়িত রয়েছে যা মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সহিংস হয়ে উঠতে বাধ্য করছে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাথাব্যথার কারণ হল দীর্ঘদিন ধরে ( প্রায় স্বাধীনতার পর হতে) স্থিতিশীলতার ফলে তারা যে ধরনের সুবিধা পেয়েছে অস্থিতিশীলতার কারণে তা নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই যদি সরকার জনগণের আন্দোলনের কারন বুঝতে না পারে এবং সংকট মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়, তাহলে এই কারনে আমি ভীত যে ভবিষ্যতে ইন্ডিয়া দীর্ঘ নৈরাজ্য এবং বিশৃঙ্খলতার দিকে এগিয়ে যাবে।