ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার


জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান,
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহিয়ান্।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের উপরোক্ত চরণদু’টিই প্রমাণ করে জগতের প্রত্যেকটি সাফল্য, প্রত্যেকটি বিজয়, প্রত্যেকটি সৃষ্টির পেছনে নারীর অবদান কোন না কোনভাবে আছে। নারী মমতাময়ী আশ্রয়ে শিশুকে বড় করেছে, পুরুষের পাশে থেকে প্রেরণা যুগিয়েছে, পুরুষের মনোরঞ্জন করেছে, মধুর মিলনে স্বামীকে উৎফুল্লের চরম সীমায় পৌছাতে সহায়তা করেছে, ভ্রাতৃবন্ধনে সহোদরকে এগিয়ে যেতে পাথেয় যুগিয়েছে। নারীর সাহসে পুরুষ আকাশ জয় করেছে, হিমালয়ে উঠেছে, সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। তবে নারীরা যে শুধু পুরুষকে প্রেরণা, ভালোবাসা, আনন্দ দিয়েছে তেমনটি নয়, সাথে সাথে বিভিন্ন সময়ে নারী পালন করেছে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। উপমহাদেশের নারীনেত্রী ইলা মিত্র দেখিয়েছেন কিভাবে পরাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার দেখিয়েছেন কিভাবে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম দেখিয়েছেন কিভাবে রাজাকারদের বিচার করতে হয়, জননেত্রী শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন কিভাবে পৃথিবীতে শান্তির মডেলকে কাজে লাগাতে হয়। এ তো গেল মাত্র উপমহাদেশের নারীদের সাহসী বিপ্লবী নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। পৃথিবীর অন্যান্য দিকে তাকালে নারীর এ ভূমিকা অহরহ চোখে পড়বে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর ক্ষুদ্র একটি জনবহুল দেশ। অত্যন্ত জনসংখ্যার চাপ, দুর্নীতি, গুম-হত্যা, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত দেশটি। এতকিছুর পরেও দেশটি এগিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমারা ধারনা করছেন আগামিতে দেশটি অতিসত্ত্বরই উন্নত রাষ্ট্রের সমপর্যায়ে চলে আসবে। তবে নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশকে পৃথিবীতে আরেকটি পরিচয় এনে দিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আজ অনেক দেশই অনুসরণীয় বলে মনে করে। বাংলাদেশের মত একটি দেশের সরকার প্রধান এবং বিরোধী দলের প্রধান উভয়ই হলেন নারী। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসে নারীর ক্ষমতায়নকে আরও সংহত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ এ উন্নীত করেছেন। মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের অধিষ্ঠিত করেছেন। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের কর্তার আসনে বসিয়েছেন (অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে সেই নারীমন্ত্রি নেই) । সংসদ উপনেতা হিসেবেও একজন নারীকে বেছে নিয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার। তাছাড়া আরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা আসীন রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রধান হিসেবেও বাংলাদেশে নারীদের স্থান দেখা যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নারীর এত ক্ষমতায়নের পরেও কি এদেশে নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে? নারীদের প্রতি নির্যাতন, বৈষম্য কি সামান্য পরিমান হ্রাস পেয়েছে? উত্তরে বলব ‘না’। বাংলাদেশ এখনও নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। এখনও পারেনি নারী নির্যাতন রুখতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। বরং নারীর প্রতি সহিংসতা আরও মাত্রাতিরিক্তহারে বাড়ছে। মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে এক নারীকে ধর্ষণ করে দিল্লীর ঘটনার পূণরাবৃত্তি ঘটানো হয়েছে বাংলাদেশেও। চট্টগ্রামে সিএনজি চালিত অটো রিকসায় ধর্ষিত হয়েছেন এক নারী। নারীর প্রতি যৌন লালসার হিং¯্রতা থেকে বাদ যাচ্ছেনা ছোট নারী শিশুরাও। গত কয়েকদিনে আমরা দেখেছি কয়েকটি শিশু ধর্ষণের ঘটনা। এমনকি অনেকক্ষেত্রে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে নিষ্পাপ শিশুকে।

নারী আজ কর্মস্থলে নিরাপদ নয়। শিকার হচ্ছে ইভটিজিংয়ের তারই সহকর্মীর দ্বারা। অথবা রাজি হতে হচ্ছে বসের যৌন বাসনা পূরণ করতে। লোক লজ্জ্বার কারণে প্রকাশ করতে পারছেনা মনের ভেতর জমা ক্ষোভ। নারী তাই সমাজ থেকে শুধু প্রতারিতই হচ্ছে। রাতে স্বামীর চাহিদা পূরণ, দিনে অফিসে সহকর্মীর দ্বারা ইভটিজিং নারীকে বাধ্য করছে একজন পুরুষকে হিংস্র হিসেবে ভাবতে।

তাই বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন হলেও নারীমুক্তি এখানে এখনও আসেনি। এমনকি নিকট ভবিষ্যতেও আসবে বলে প্রতিপন্ন হয়না। শুধু নারীর ক্ষমতায়ন নারীর মুক্তি নিয়ে আসবেনা। নারীর মুক্তির জন্য প্রয়োজন পুরুষ শাসিত সমাজে পুরুষের মানসিকতার পরিবর্তন। পুরুষ যতদিন না নারীকে তার সহযোগী ভাবতে শিখবে, যতদিন না নারীকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভাবতে শিখবে ততদিন এ সমস্যার সমাধান হবেনা।