ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

স্বাধীনতার পক্ষের-বিপক্ষের শক্তি নিয়ে আলোচনা,সমালোচনা,তর্ক-বিতর্ক,সমীক্ষা-নিরীক্ষা,টকশো,লেখালেখি গত ৪০ বছর ধরে চলছে। আমারা সাধারণ মানুষ সাধারণত: এসব বিষয়ে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মতামতের উপর অনেকটা নির্ভরশীল এবং এসব বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশের সাধারণ সমীকরণে ১৯৭১ এর স্বশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে যে বা যারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে ছিলেন তাদেরকে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি এবং যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন তাদেরকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই সাধারণ সমীকরণ একটা সময় পর্যন্ত সঠিক ছিলো বলা যায় কিন্ত অনেক বছর পেরিয়ে এসেছি আমরা,বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়েছে অনেক। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের সাধারণ সমীকরণের ফলে স্বাধীনতার পক্ষের-বিপক্ষের শক্তি সর্ম্পকে একটা মেঘাচ্ছন্ন ধারনার সৃষ্টি হয়েছে । শুধুমাত্র ১৯৭১ এর ভূমিকাকে কেন্দ্র করে ২০১১ সালে এসে স্বাধীনতার পক্ষের-বিপক্ষের শক্তি নির্ধারিত হলে এই ৪০ বছরে বেড়ে উঠা স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিসমূহ মেরুদন্ড সোজা করে দাড়িয়ে ধূলিসাৎ করবে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব,অন্ধকারাচ্ছন্ন করবে আমাদের উত্তরাধিকারদের অনাদি ভবিষ্যত। শুধু আমাদের দেশে নয়,প্রতিটা দেশেই ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে অনেক ব্যক্তির ভূমিকা যেমন নন্দিত আবার অনেক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভূমিকা তেমন নিন্দিত। ইতিহাসের একটি অধ্যায়ে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভূমিকা নন্দিত হলেও পরবর্তী অধ্যায়ের ভূমিকা নিন্দিত হবেনা তা নিশ্চিত করে বলা বিজ্ঞান সম্মত হবেনা ।

বিখ্যাত রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ও দার্শনিক হ্যারল্ড লাস্কির শিক্ষক “হেনরী ডব্লিউ নেভিলসন” বলেন’ ভালোবাসার মত স্বাধীনতার জন্য আমাদের নিরন্তন সংগ্রাম করতে হয়।ভালোবাসার মত স্বাধীনতাকেও প্রতিদিন নতুন করে জয় করে নিতে হয়। আমরা সর্বদা ভালোবাসার মত স্বাধীনতাকেও হারাচ্ছি কারন প্রত্যেক বিজয়ের পর আমরা ভাবি আর কোন সংগ্রাম ছাড়াই বিজয়ের ফল স্থির চিত্তে উপভোগ করে যাবো। স্বাধীনতার যুদ্ধ কখনো শেষ হয়না, কারন এ এক নিরন্তর সংগ্রাম । আমরা যদি হেনরী ডব্লিউ নেভিলসন এর সাথে একমত হই তবে একথা অনস্বীকার্য যে,স্বাধীনতা সংগ্রামে ৭১ অধ্যায় স্বশস্ত্র সংগ্রাম থাকলেও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। কিন্ত ৭১ এর স্বশস্ত্র সংগ্রামের পর আমাদের দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী চিন্তা-চেতনা ও কার্যক্রমে স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্পৃক্ত নেই।রাষ্ট্র বিজ্ঞানী সিরাজুল আলম খান(দাদা) বলেন,মূলত:বিদেশী শাসক বদলিয়ে দেশীয় শাসকদের ক্ষমতায় বসিয়ে উপনিবেশিক আমলের শাসন কাঠামো দিয়ে দেশ পরিচালনা করা জনগনের জন্য এক ধরনের পরাধীনতা। যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলে আভ্যন্তরীন উপনিবেশবাদ বা internal colonialism। ১৯৭১ এর রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন দেশের সংখ্যা বেড়েছে যার নাম বাংলাদেশ এবং জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের অন্যান্য পতাকার পাশে স্থান করে নিয়েছে নতুন একটা পতাকা।

আমরা কেন ১৯৭১ স্বশস্ত্র যুদ্ধে নেমেছিলাম ? কেন আমাদের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো? ১৯৪৭ এ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তানের একটি প্রদেশের নাগরিক হিসেবে অবশ্যই আমরা শোষিত-নির্যাতিত ছিলাম। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নানা ভাবে আমাদের শোষণ নির্যাতন করতো। ব্রিটিশ বেনিয়াদের মত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আমাদের সম্পদ লুন্ঠন করতো,আমাদের মাতৃভাষার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিলো। আমাদের সাথে তারা প্রভূর মত আচরন করতো। আমাদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছিলো না। অনেক অনেক কারনে ধীরে ধীরে স্বায়ত্ব শাসনের দাবী এক পর্যায়ে ইতিহাসের দ্বান্দিকতায় স্বাধীনতার দাবী উঠলো। প্রথমত শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাধানে আমরা ব্যর্থ হলাম অপরদিকে সুপরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানি এবং তাদের এ দেশীয় দালালরা আমাদের দেশে গণহত্যা শুরু করলো। আমাদের দেয়ালে পিঠ লেগে গিয়েছিলো,প্রতিঘাত না করে পথ ছিলো না অপরদিকে স্বাধীনতার চেতনা আমাদের স্বশস্ত্র সংগ্রামের পথ দেখালো। ত্রিশ লাখ শহীদের তাজা রক্ত আর আড়াই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সহযোগিতায় অবশেষে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিকতার শিকল ছিন্ন করে আমরা স্বাধীন হলাম।স্বাধীন দেশে গাড়ো সবুজের মাঝে রক্তস্নাত লাল দিয়ে তৈরি হলো আমাদের জাতীয় পতাকা,৫৫ হাজার ১ শত ২৬ বর্গমাইল জায়গা নিয়ে গঠিত হলো আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

স্বাধীন রাষ্ট্রে আমাদের স্ব-ভাষী শাসক এলেও এবং দেশপ্রেমিক,জাতীয়তাবাদী-স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে দাবী করলেও গত ৪০ বছরে শাসকদের চরিত্রে সেরকম কিছু পেয়েছি ? সত্যি যদি দেশপ্রেমিক,জাতীয়তাবাদী-স্বাধীনতার পক্ষের ক্ষমতায় থাকতো তাহলে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ,মানবিক সম্পদ,সাংস্কৃতিক সম্পদ, প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সম্পদকে ব্যবহার করে জাতীয় পূঁজিকে বিকশিত করে আমাদের নাগরিকদের জীবন ও জীবিকার মান উন্নয়ন করে আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে শোভা বর্ধন করতাম।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই ক্ষমতায় থাকা শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা দেশের সম্পদ বিকশিত করে জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের কোন ইতিহাস আমাদের জানা নেই। বরং শাসকরা যারা আমার ভাষাতেই কথা বলে এবং আমার মাতৃভাষাতেই লিখলো উপনিবেশিক ধ্যান ধারনার শাসন কাঠামো। বিদেশী শাসক বদলিয়ে দেশী শাসকদের ক্ষমতায় বসিয়ে উপনিবেশিক শাসন কাঠামো দিয়ে দেশ পরিচালিত হলো এবং হচ্ছে। আমাদের দেশীয় শাসকরা যতটা না তাদের ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষা করছে সে তুলনায় দেশের স্বার্থ মোটেই রক্ষা করেনি।স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে অবশ্যই দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার কথা ছিলো কিন্ত আমরা দেখি আমাদের শাসকরা জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কার্যক্রম যথা লুটপাট,চুরি,দূর্নীতি করছে এবং রঙ-বেরঙের বহুজাতিক কোম্পানির সাথে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী অসম চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে সাম্রাজ্যবাদী দালালে পরিনত হয়েছে। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে অপরদিকে দেশের সংখ্যাগুরু কোটি কোটি মানুষের জীবনের গুনগত মানের কোন পরিবর্তন হয়নি। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আসলে কে বা কারা ? যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বাধীনতার সুযোগ ব্যবহার করে ফুলে ফেপে উঠছে বা যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বা হচ্ছে ,যারা ক্ষমতায় থেকে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করছে তারা কি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন বা আছেন,তারা নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক-জাতীয়তাবাদী-স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে জাহির করতে চাইলেও এসব রাজনৈতিক দলগুলোর কোনটারই স্বাধীন জাতীয় চরিত্র নেই। সমাজ ও অর্থনীতির গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য দরকার স্বাধীন জাতীয় চরিত্র বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব।মূলত: যারা আমাদের দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন তারা আসলে জাতীয় স্বার্থকে বা সংখ্যাগরিষ্ট জনগণের স্বার্থকে আদৌ গুরুত্ব দেয়নি। এসব দলগুলোর মধ্যে পার্থক্য শুধু নামের। কাজের অর্থাৎ শ্রেনী চরিত্রের কোন প্রভেদ নাই। এসব দলগুলো মূলত: বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিসমূহের বানিজ্য ও আর্থিক বিনিয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবাধ করে দিয়েছেন। বিদেশী বিনিয়োগকারী সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক,আ.এম.এফ,এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক(এ.ডি.বি) এর শর্তানুযায়ী কাজ করছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দেশীয় পুঁজির কতৃত্ব যাতে প্রতিষ্ঠিত না হতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। তাহলে এসব রাজনৈতিক দলগুলো কি আসলেই স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি?

একথা সকলের জানা যে ভারতীয় উপমহাদেশ প্রায় দুশো বছর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপনিবেশ ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য উপনিবেশ থেকে সম্পদ লুণ্ঠন করে ব্রিটিশরা তাদের নিজ দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে যে প্রয়োজনীয় পুঁজির দরকার ছিলো সেটা সংগ্রহ করেছে। উপনিবেশিক শোষন ও লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার প্রয়োজনে ব্রিটিশরা এদেশে যে আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পত্তন ঘটায় সে আমলা নির্ভর রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা আজও আমাদের দেশে বহাল আছে। এই রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে ব্রিটিশ পরবর্তী সময় থেকে অদ্যাবধি যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তারা কোন স্বাধীন জাতীয় স্বত্বা নিয়ে গড়ে উঠেনি বরং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের তর্পী বাহক হিসেবে তাদের জন্ম ও বিকাশ। ব্রিটিশ পরবর্তী সময়ে এ কারনে এদেশের সম্পদ লুণ্ঠনে সাম্রাজ্যবাদীদের আর কোন পলাশী যুদ্ধ জয়ের নাটক রচনা করতে হয়নি।

ব্রিটেনের সাথে সাথে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র সহ ইউরোপিয়ান বহুজাতিক কোম্পানিসমূহের শোষন-লুন্ঠন প্রক্রিয়া কখনো নিরবে কখনো প্রকাশ্যে অব্যাহত রয়েছে। আমাদের দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের এই ধারাবাহিকতার কারনেই এদেশের সমাজ ও অর্থনীতির জাতীয় পুঁজিবাদী বিকাশ হয়নি। যে পুঁজিবাদ আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বিকশিত হয়েছে তার চরিত্র জাতীয় নয়, বিজাতীয়। সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির পরিপূরক হিসেবে শুধু আমাদের অর্থনীতির পুঁজিবাদী বিকাশ হয়েছে। পুঁজিবাদ বিকাশের প্রথম যুগে ইউরোপীয় পুজিবাদ যে স্বাধীন চরিত্র নিয়ে বিকশিত হয়েছিলো সেই পুঁজিবাদে
উৎপাদনশীল পুজি বা শিল্পপুঁজি সেদেশের অর্থনীতিতে কতৃত্ব করতো কিন্ত আমাদের দেশের পুঁজিবাদে তা লক্ষণীয় নয়,সে জন্য এদেশে শিল্প পুঁজির চেয়ে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির সহায়ক ব্যবসায়ী পুঁজির দাপট খুবই প্রখর। আমাদের অর্থনীতিতে যে পুঁজিবাদ বিরাজ করছে তার ফলে এদেশীয় সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটছে সাম্রাজ্যবাদী দেশ সমূহে। আমাদের অর্থনীতিতে শ্রমজীবি জনসাধারণ যে মূল্য সৃষ্টি করছে সেই মূল্যের নিয়ন্ত্রন কর্তা হচ্ছে রঙে-বেরঙের বহুজাতিক কোম্পানি সমূহ এবং তাদের সহযোগী বিশ্ব ব্যাংক,আই.এম.এফ. ও এ.ডি.বি. সহ নানা নামের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠান। এজন্য আমাদের জাতীয় অর্থনীতি বিকশিত হতে পারছেনা,ঋণের বোঝা শুধু বেড়েই চলেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী বা গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজির সঞ্চায়ন বাধাগ্রস্থ হতেই থাকবে। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর এই যখন আমাদের অর্থনৈতিক বিকাশের অবস্থা,সেখানে আসলে স্বাধীনতার পক্ষের মুক্তি কে বা কারা?

যে দেশের রাজনীতিবিদ,আমলা ও ব্যবসায়ীদের এক বিরাট সংখ্যা গত ২০০৭ এ জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন, দূর্নীতি ও ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগে কারাগারে ছিলেন,পলাতক ছিলেন বা যারা কারাগারে পাঠিয়ে ছিলেন তারা কি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ? যে আমলা দূর্নীতির মধ্য দিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থের মালিক হয়েছেন তাদের মুখে স্বাধীনতার কথা শুনলে ভূতের মুখে রাম নামের মত মনে হবেনা ? যে আইনজীবি এশিয়া এনার্জির এদেশের আইন উপদেষ্টা ,তিনি আর যাই হোন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হতে পারেন না। জীবিকা নির্বাহের জন্য জাতীয় স্বার্থ বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের তল্পিবাহক হয়েও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি দাবী করা কি যুক্তিসঙ্গত?

যে পুলিশ অফিসার হেফাজতে থাকা অবস্থায় অসহায় নারীকে পাক বাহিনীর মত অমানবিকভাবে ধর্ষন করতে পারে সে আর যাই হোক স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হতে পারেনা। যে ব্যবসায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি অবৈধভাবে গুদামজাত করে পরিকল্পিতভাবে মূল্য বৃদ্ধি করছে,যে চোরাকারবারী পাশ্ববর্তী দেশসমূহের পণ্য, মাদকদ্রব্য, ১০ ট্রাক অস্ত্র নিয়ে আসছে,তারা নিশ্চয় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হতে পারেনা।ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সেব রাজনৈতিক দল দেশীয় কোম্পানিকে সুযোগ না দিয়ে বা দেশীয় কোম্পানীর সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা না করে তেল,গ্যাস,কয়লা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নাইকো,এশিয়া এনার্জি,অক্সিডেন্টাল,এনরন,ইউনিকল, শেল,কেয়ার্ন,তাল্লো, টেক্সাকো সহ বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির সাথে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী অসম চুক্তি করতে পারে তারা কি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ?
আমি জনৈক খেতাবধারী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জানি,যিনি একাত্তরের রণাঙ্গণে সত্যিই বীর ছিলেন( ৭১ এর গৌরবময় ভূমিকার কারনে তার নাম প্রকাশ করলাম না)কিন্ত স্বাধীনতার ৪০ বছর পরে এসে দেখি বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋন খেলাপির কালো তালিকায় তার নাম এবং সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কর্তৃক ২০০১ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এর পরে বিজয় মিছিল থেকে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার হোগলারচকে ও কানাখালীতে মন্দির ধ্বংসের খবর বি.বি.সি বাংলার শিরোনাম হয়ে আসে এবং মুক্তিযোদ্ধা পিতা তার পুত্রের সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় উস্কানি দেন তারপরেও কি এখন সেই মুক্তিযোদ্ধাকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে বিশ্বাস করতে হবে ?

বিদেশী বহুজাতিক পূঁজির পক্ষে যারা সাফাই গায়,লোকসানের অজুহাতে যারা দেশীয় শিল্প-কল-কারখানা বন্ধ করে দেয়,তেল,গ্যাস,খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দেশীয় কোম্পানিকে কোণঠাসা করে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিসমূহকে কমিশনের বিনিময়ে অবাধ লুণ্ঠনের সুযোগ করে দেয়,তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের কথা বলে পল্লীর দরিদ্র মানুষকে টেলিযোগাযোগের ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে ঠান্ডা মাথায় কোটি কোটি ডলার বিদেশীদের হাতে তুলে দেয় তারা আর যাই হোক স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হতে পারেনা।

২০০৭ এর ১১ জানুয়ারিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দূর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষনা করে দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী,এম.পি.আমলা ব্যবসায়ী,ইউ.পি. চেয়ারম্যানসহ অনেককে গ্রেফতার করে জেলে পাঠালেও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী চুক্তিগুলো বাতিল করার সাহস দেখাতে পারেনি।

প্রিয় পাঠক,স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি অবশ্যই খেটে খাওয়া সাধারণ জনগন,যারা নিরন্তর জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত এবং যারা বারবার দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নির্ভীক সৈনিক। ৭১ এর পর জনগন ভেবেছিলো স্বাধীনতা আসা মানেই আর শোষন-নির্যাতন হবেনা,৯০ এর সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পর,১/১১ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এবং সর্বশেষ ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ এ ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার সুফল পাওয়ার আশায় বুক বেঁধেছিলো। কিন্ত তা হলোনা। সত্যিকারের দেশকে ভালোবাসার মত মানুষ এবং দেশকে গড়ার মত মানুষেরা কবে ক্ষমতায় যাবে ? দুর্নীতিগ্রস্ত্র রাজনীতিবিদ,লুটেরা আমলা-কর্মচারী এবং অতিলোভী ভেজাল ব্যবসায়ী,এই ত্রিরত্নের হাতে জিম্মি হয়ে আছে আমাদের প্রিয় ৫৫ হাজার ১ শত ২৬ বর্গমাইল। আশাকরি ইতিহাসের দ্বান্দিকতায় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা পূরনে অগ্রনী ভূমিকা রেখে তথাকথিত স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির মুখোশ উন্মোচন করতে পারবে।