ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

ঘটনার শুরু কি আসলে হিস্টেকটোমি বা জরায়ু অপসারণ দিয়ে? তাই বা বলি কি করে! সেই ‘৯১ সালের পর থেকে তো বাড়ন্ত রক্তচাপ আর হার্ট এনলার্জ ছাড়া আর সব ঠিকই ছিল। মানব শরীরের সবই তো হরমোনের খেলা, সেই হরমোনের খেলায় ফাউলটা হয়ে গেছে জরায়ু অপসারণ দিয়েই হয়তো। ছোট সাধারণ মাথায় কত কী ভাবি রাত বিরাতে! আহা! যদি পেতাম কোন উপায় বা টাইম মেশিন, এ আয়ুর কিছুটা দিয়েও যদি তাকে আমি ধরে রাখতে পারতাম!

ডায়াবেটিস নেই, পঁয়ষট্টি বছরের প্রায় পাঁচ ফুট ছোটখাটো মানুষটা টুকটুক করে রিটায়ারমেন্টের পর থেকে কাজ করে যায় বাসায়। মামুলি কিছু অসুখ বিসুখ ছাড়া তেমন কোন শারীরিক অভিযোগ নেই। ২০১৩ এর সেপ্টেম্বরে এই ছোটখাটে মানুষটার ডান ব্রেস্টে ছোট লাম্প হলো। সাথে সাথে গ্রীন লাইফ হসপিটালের ডাক্তার নিশাত বেগমকে দেখানো হলো । উনি অপারেশন করে লাম্প অপসারণ করলেন। মডার্ন ডায়াগনস্টিক থেকে অপারেশন পরবর্তী বায়োপসি বা হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্ট এলো নরমাল, রিপোর্টে লেখা Cystic Fibrodenoma; সব স্বাভাবিক, আর কোন ফলোআপ নেই। ডাক্তার না বলাতে।

২০১৫ এর জানুয়ারি মাসে সেই ডান ব্রেস্টে আবার লাম্প। নিশাত বেগম এফএনএসি করালেন NN Lab, The Laboratory -তে। রিপোর্টে লিখা “Possibilities of malignant phylloides tumor/sarcomatoid carcinoma/metaplastic carcinoma”; মাথায় মোটামুটি আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। ইন্ডিয়ার ভিসার জন্যে অ্যাপ্লাই করা হলো মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে। ভিসা হলো না।

হলি ফ্যামিলির প্রফেসর সার্জন অনকোলজি দেখলেন সব, দেখলেন অনকোলজিস্ট ফারুক। শেষ পর্যন্ত হলি ফ্যামিলির আহমেদ সাঈদ। ১১.০২.১৫ -তে ছোটখাটো নরম-সরম মানুষটির রাইট ব্রেস্ট সম্পূর্ণ রিমুভ করলেন। বায়োপসি করতে পাঠালেন The Laboratory -তে। ১৫.০২.১৫ এর রিপোর্ট অনুযায়ী ডায়াগনসিস Myofibroblastoma, যা Cancer নির্দেশ করে না। রিপোর্টটিতে সাইন করেন Prof. Mohammed Kamal, তারা রিপোর্ট -এ এডভাইস করেন Immunohistochemistry করবার জন্যে পি.জি (BSMMU) হাসপাতালে । BSMMU ১৯ দিন পর রিপোর্ট দেয় “Overall features are compatible with myofibroblastoma”, যা আগের রিপোর্ট এরই এক্সেটেন্ডেড ভার্সন; যা প্রমাণ করে পেশেন্ট এর কোন ক্যান্সার নেই।

এখানে উল্লেখ্য, যে এর মাঝে পি.জি (BSMMU) হাসপাতালের ডাক্তার Shabnam Akhter এর কাছে কয়েকবার যাওয়া হয়, উনি রিপোর্ট দেবার আগে বলেন পেশেন্ট এর ক্যান্সার আছে । কিন্তু রিপোর্ট দেন উল্টো- “overall features are compatible with myofibroblastoma”; পয়েন্ট টু বি নোটেড,  “The Laboratory” এর Prof. Mohammed Kamal এবং পি.জি (BSMMU) এর Pathology Chairman একই ব্যক্তি। এমতাবস্থায় সব রিপোর্ট নিয়ে সার্জন আহমেদ সাঈদের কাছে পরামর্শের জন্যে গেলে তিনি বলেন “No further treatment is required, patient is doing absolutely ok”.

নিজেদের মানসিক শান্তির জন্যে মার্চ ২০১৫ ‘তে পেশেন্ট থাইল্যান্ডের King Chulalongkorn Hospital এ অপারেশন পরবর্তী সব স্লাইড সহ রিভিউ এর জন্যে গেলে Hi-Tech Lab 24.03.2015 Review Report দেয় “Malignant spindle cell tumor, malignant phyllode tumor is possible. Malignant phyllodes tumor Vs metaplastic carcinoma Vs myofibroblastoma”.

থাইল্যান্ড ২০১৩ এর  প্রথম অপারেশনের স্লাইড চেয়ে বসে, রেডিওথেরাপি সাজেস্ট করবার জন্যে। পাসপোর্ট এর মেয়াদ শেষ হওয়াতে দ্বিতীয়বার থাইল্যান্ড যেতে যেতে মে ২০১৫ হয়। ২০১৩ এর অপরেশনের পূর্বের স্লাইড পাওয়া গেলেও অপারেশন পরবর্তী স্লাইড Modern Diagnostic দিতে পারে না। মধ্যবর্তী সময়ে আহমেদ সাঈদকে থাইল্যান্ডের সব রিপোর্ট দেখানো হলে তিনি আবার বলেন ”দেশে-বিদেশে অনেক রিভিউ হয়েছে, পেশেন্টের কোন ক্যান্সার নেই, তিন মাস পর দেখা করলেই হবে”।

মে ২০১৫, King Chulalongkorn Hospital, Doctor Choalit ৩০টি রেডিও থোরপি দিতে বলেন বাংলাদেশে। পেশেন্টের আপনজনরা আহমেদ সাঈদের মন্তব্য উপদেশ আঁকড়ে ধরে রেডিওথেরাপি দেয়ার কোন উদ্যোগ নেয় না, থাইল্যান্ডে যাওয়া বৃথা যায়। এতকিছুর ভেতর কোন ডাক্তার একটি সিম্পল PET CT Scan করার পরামর্শও দেন না। জুলাই

২০১৫-্ইউনাইটেড হাসপাতাল-Doctor Ashim Kumar Sengupta এর কাছে যাওয়া হয় রোগিকে রেডিওথেরাপি দেয়ার জন্যে। রেডিওথেরাপি দেয়ার আগে CT Simulation করতে হয়। সে রিপোর্টে দেখা যায় রোগীর লাঙসে মাল্টিপল স্পট। Doctor Ashim PET CT Scan ও CT Guided FNAC করান। Report আসে – ÓMetastatic Malignant spindle cell tumour/malignant Phyllodes Tumour, Carcinoma Right Breast with metastasis to lung”; Doctor Ashim বলেন, উনি কেমো দিয়ে চেষ্টা করবেন। প্রতি ২১ দিন পরপর তিনটি কেমো দেয়ার পর CT Scan রিপোর্ট সন্তোষষজনক না হওয়ায় আপাতত কেমে দেয়া বন্ধ।

পেশেন্টের দুর্ভাগ্য :
১. The Laboratory এর ভুল রিপোর্ট
২. পি.জি (BSMMU) Hospital এর ভুল রিপোর্ট
৩.  The Laboratory এর এবং পি.জি (BSMMU) Hospital এর প্যাথলজি হেড একই ব্যক্তি প্রফেসর মোহাম্মদ কামাল হওয়া
৪. থাইল্যান্ডের ডাক্তারের কথা না শুনে বারবার ডাক্তার আহমেদ সাঈদের মতকে প্রাধান্য দেয়া
৫. অপারেশন পরবর্তী ও পূর্ববর্তী কোন সময়েই কোন ধরনের টেস্টের যেমন CT Scan , PET CT Scan এর উপদেশ ডাক্তারদের কাছ থেকে না পাওয়া
৬. ইন্ডিয়ার ভিসা না পাওয়াসহ আরো অনেক না মনে পড়া গাফিলতি, দুর্ভাগ্য

ঢাকা শহরে থেকে, মোটামুটি আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ছোটখাটো মানুষটি এখন অন্য কোন অজানা জায়গায় যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। লৌকিক অলৌকিক যেখানে ম্লান হয়ে যায়। কি অদ্ভূত এ মানুষেরা! নিজের দেয়া রিপোর্টকে সত্য প্রমাণিত করবার জন্যে জেনেশুনে প্রফেসর মোহাম্মদ কামাল পিজির শবনমকে দিয়ে একই রিপোর্ট দেয়ালেন। কি বিস্ময়কর আহমেদ সাঈদ থাইল্যান্ডের রিপোর্ট দেখেও বললেন, আর কোন চিকিতসার প্রয়োজন নেই। কত আশ্চর্যজনক পেশেন্টের স্বজনেরা নিশ্চিন্তে তাদের জীবন যাপন করে গেছেন।

হরমোনের দীর্ঘ যাত্রা সাঙ্গ হলো বলে.. কে নেবে এ দায়? সেই পুরনো নিয়তি!!!