ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

“চীন-ভারত-মার্কিন” ত্রিপাক্ষিক স্বার্থের কঠিন হিসেবে আটকে গেছে “আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ” এবং প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার। আমাদের প্রাণপ্রিয় এই দেশটা তার জন্মের ৪০ বছর পর সবচাইতে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, যেটা থেকে মুক্তি দিতে পারে একমাত্র বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

বাংলাদেশকে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক যেভাবে পারা যায় সেভাবে চাপে ফেলাই এই শক্তিগুলির বর্তমান নীতি। পদ্মা সেতুর দুর্নীতি ইস্যু, গার্মেন্টস শিল্পের সাম্প্রতিক অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের গার্মেন্টস প্রবেশে বিষয়ে ড্যান মজিনার হুমকি, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলা, বাংলাদেশে সৌদি রাষ্ট্রদুতের খুন হওয়া, নতুন করে পার্বত্য অঞ্চলে সহিংসতা, রামুর বৌদ্ধপল্লীর হামলা এই সবগুলিই একই সুত্রে গাঁথা । নিকট ভবিষ্যতে আরও ঘটনার সম্মুখীন আমরা হবো এটার লক্ষন এখনই টের পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্যালকুলেশন অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে সেটা ভুলে থাকার সুযোগ নেই।

সাম্প্রতিক কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধ পল্লীর হামলা একটা সুবিশাল প্ল্যানেরই অংশ। বৌদ্ধদের ওপর হামলা করে বৌদ্ধ-মুসলিম সংঘাতকে উস্কে দেয়া হচ্ছে। মিডলইস্টে মুসলিম-ইহুদী সংঘাত, ইউরোপে মুসলিম-খ্রীষ্টান সংঘাত, আর পুর্বে নতুন করে ফ্রন্ট খোলার চেষ্টা করা হচ্ছে মুসলিম-বৌদ্ধ সংঘাত দিয়ে। যেটা পূর্বে রোহিংগা(মুসলিম)-রাখাইন(বৌদ্ধ) দাঙ্গার সময়ই টের পাওয়া গিয়েছিলো। এমনকি বাংলাদেশের রামুর হামলার প্রতিক্রিয়ায় শ্রীলংকাতে মুসলিম-বৌদ্ধ সংঘাতের চেষ্টাও করা হয়েছিলো। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুটির সৃষ্টি ছিলো এই স্বার্থেরই অংশ হিসেবে, যা আমাদের এই ১৬ কোটি মানুষের গরীব দেশটাকে কঠিন পরিস্থিতির সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে । সেই স্বার্থেরই একটা ছকের অংশ হলো পরিকল্পিত রোহিঙ্গা-রাখাইন দাঙ্গা, সেটা দিন যতই যাচ্ছে ততই সবার কাছে পরিষ্কার হচ্ছে। আর এই স্বার্থের দুটি ঘুঁটি হলো বাংলাদেশ ও মায়ানমার। এই অঞ্চলে চীন ও ভারতের ক্রমবর্ধমান আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতা মার্কিন স্বার্থের জন্য হুমকি সরুপ সেটা অনেক আগেই পশ্চিমা লবী অনুধাবন করেছে।

আর চীন-ভারতের আর্থিক ও সামরিক অগ্রগতিকে ঠেকাতে না পারলে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অনেকটাই হ্রাস পাবে। আর তাই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিন এশিয়া অঞ্চলে হস্তক্ষেপ শুরু করে দিয়েছে। তাদের উন্নত কূটনৈতিক নীতি এবং চতুরতার মাধ্যমে তারা এই অঞ্চলে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্ম দেয়ার চেষ্টা অনেকদিন থেকেই চালিয়ে যাচ্ছিলো, যার মাধ্যমে চীন এবং ভারতের বর্তমান সময়ের ক্রম-উন্নতির ধারা কিছুটা হলেও স্লথ করে দেয়া যাবে। আর এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের গুরুত্ব বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। তাই এ অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশসমুহে বিশেষ করে বাংলাদেশ ও মায়ানমারে কোন অভ্যন্তরীন সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে অথবা কুটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে তাদের সামরিক অবস্থান জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

মায়ানমার যেহেতু ঐতিহাসিকভাবেই চীনের মিত্র, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র সহজে হাত বাড়াতে পারবে না, তাই বাংলাদেশই হল যুক্তরাষ্ট্রের সহজ টার্গেট । বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে দিয়ে তাদের স্বার্থউদ্ধার করাটাই তার পক্ষে সহজ। এরই ফলশ্রুতিতে ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-বাহিনীর ভবিষ্যত আনাগোনা আমরা এখনই দেখতে পাচ্ছি। ঠিকভাবে যদি আমরা পুরো ব্যাপারটাকে ট্যাকল না করতে পারি তাহলে বঙ্গোপসাগরের উপর আমরা নিশ্চিতভাবেই আমাদের অধিকার হারাবো। আমাদের সেনাশক্তির সাথে ততোধিক শক্তিশালী করে নৌশক্তি বাড়ানো এখন অন্য যেকোন কিছুর চাইতেও বেশী দরকার। বর্তমানের দুধ-ভাত নৌবাহিনীর বদলে শক্তিশালী ও ক্ষিপ্র নৌশক্তি আমাদেরকে বঙ্গোপসাগরের অধিকার বজায় রাখতে সহায়তা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কারনেই বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র “বন্ধু অথবা শত্রু” পরিস্থিতিতে ফেলেছে । বাংলাদেশ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বহুদিনের তাদের নৌশক্তির ঘাঁটি হিসেবে, চট্টগ্রাম অঞ্চল যার জন্য সবচাইতে আকর্ষনীয়। এরই অংশ হিসেবে তাদের নজর চট্টগ্রাম পোর্টের দিকে। কন্টেইনার টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব তাদের বহুদিনের। এখানে যদি কোনভাবে সে ঢুকতে পারে তাহলে চীনকে সে ঘাড়ের উপর বসে চোখ রাঙ্গাতে পারবে।

আর পার্বত্য সমস্যাটি স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ যথেষ্ট মাথাব্যাথার কারন, যা ১৯৯৮ সালের শান্তিচুক্তির পর কিছুটা স্তিমিতই ছিলো। তবে বাংলাদেশের স্থানীয় মানবাধিকারের ফেরিওয়ালারাতো নিজেদের সবকিছু সাম্রাজ্যবাদীদের চরনে সঁপে অনেক আগেই বসে আছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করার প্রয়োজন হলে পশ্চিমাদের হাতের ইশারাতেই এঁরা সক্রিয় হয়ে উঠবেন এটা বিভিন্নসময়ই প্রমান হয়েছে। প্রচার মাধ্যম জমিয়ে রাখতে এদের তুলনা নেই। কেননা মানবাধিকারের বুলিটা খুবই চিত্তাকর্ষক ও আকর্ষনীয়।

আর পার্বত্য সমস্যার সাথে নতুন করে রোহিংগা সমস্যা যোগ করে পুরো চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক সুতোয় বাঁধা কোন কঠিন কাজ নয় মোটেও। ভারত এক্ষেত্রে নিজের এবং মার্কিন স্বার্থের কারনে সবসময়ই একপায়ে খাড়া। রোহিঙ্গারা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উপর বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলেছে। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সামাজিক অস্থিরতার মূল কারনই হয়ে গেছে এই রোহিঙ্গারা। ইতোপূর্বে বাংলাদেশে এসে থেকে যাওয়া রোহিংগাদের সংখ্যা কয়েক লাখ, এর সাথে আরও কয়েক লাখকে যদি কোনভাবে এনে এদেশে ঢোকানো যায় তাহলে তাদের প্ল্যান কার্যকর করতে খুব বেশী বেগ পেতে হবে না।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে ভয়ংকর এক খেলায় নেমেছে পশ্চিমা বিশ্ব, যেখানে এ অঞ্চলকে কেটে নতুন একটা ভুখণ্ড সৃষ্টিও অসম্ভব কিছু নয়। যেখানে আমাদের দেশের ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয় এদেশে যেমন তিতুমীর, ঈসাখাঁ, সুর্য্যসেন, ভাষানী, শেখ মুজিব জন্ম নিয়েছে ঠিক তেমনই এ দেশেই মীরজাফর, নাজিমুদ্দিন, গোলাম আজমরা, নিজামীও জন্ম নিয়েছে।

বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী দলটিকে ব্যবহার করা এক্ষেত্রে মার্কিনীদের জন্য খুব সহজ সেটা হলফ করেই বলা যায়। কারন এই টাইপের দলগুলির জন্মই হয় ব্যবহৃত হবার জন্য। জিহাদী জোসে এরা বারবারই দেশের সাথে বেঈমানী করেছে। কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধপল্লীতে হামলাতেও জামায়াত ও জামায়াতমনাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমানিত। এমনকি কয়েকমাস পূর্বের মিয়ানমারের দাঙ্গার বিষয়ে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে মায়ানমারের কাছ থেকেই অভিযোগ এসেছিলো। তাছাড়া রামুর ঘটনায় বিভিন্ন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কিছু নেতার সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে। সরকার নিরপেক্ষভাবে দেশের স্বার্থে জড়িত প্রতিটি কালপ্রিটকে কঠিন বিচারের সম্মুখিন করবে এটাই সবাই আশা করি। এখানে যদি একটুও অবহেলা করা হয় তাহলে বাংলাদেশকে অনেক বড় মাশুল দিতে হবে, যেটা সহ্য করার ক্ষমতা এই দেশের নেই।

আর মায়ানমারের অং সান সুচিকে পশ্চিমারাই গনতন্ত্রের জামা পরিয়ে তৈরি করেছে অনেক সময় জুড়ে। মায়ানমারের গনতান্ত্রিক অং সান সুচি’র চাইতে সামরিকজান্তাই আমাদের দেশের জন্য বেশী ভাল ছিলো তা অল্পদিনেই আমরা হয়তো বুঝতে পারব।

যুক্তরাষ্ট্রের ও পশ্বিমা দেশগুলির স্বার্থ সংরক্ষন করাই হল বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত নিউজ মিডিয়া এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মূল কাজ। বিবিসি, সিএনএন অথবা ভয়েস অব আমেরিকা’ই হল আমাদের মত গরিব দেশগুলির খবরের মূল উৎস। তাই বিবিসি, সিএনএন যাই বলুক না কেন বাকিরা তার সাথেই ঠোঁট মিলায়। দুঃখজনক ব্যপার হল আমাদের মত তৃতীয়বিশ্বের দেশগুলির মিডিয়াও তাদেরই স্বার্থেরই বর্ধিত প্রান্ত। বিশ্বের দুর্বল দেশগুলিতে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এসব সংবাদ মাধ্যম এবং তথাকথিত মানাবাধিকার সংগঠনগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

“ইউএনএইচসিআর” এবং “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ” এ ধরনেরই সংস্থা। এক্ষেত্রে “ইউএনএইচসিআর” এর গায়ে জাতিসংঘের লেবাসটা আছে শুধু। এই দুটি সংস্থার কার্যক্রম ও আচরন অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বব্যাপি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ও দিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলি যে বিশ্বের বড় দেশগুলির হাতের পুতুল তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বরাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে এদের যে সুদুরপ্রসারী কার্যক্রম আছে তা অনেকেই অবগত। এদের পূর্বের অনেক কার্যক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ।

“ইউএনএইচসিআর” এর কারনেই রোহিঙ্গা সমস্যার আজ এতবছর পরেও সমাধান বাংলাদেশ করতে পারেনি। তারা এই সমস্যাকে তাদের প্রয়োজনে জিইয়ে রেখেছে। বাংলাদেশকে এখন নিজের স্বার্থেই কঠোর হতে হবে “ইউএনএইচসিআর” এর ব্যাপারে। তবে সবদিকেই জটপাকিয়ে ফেলা এবং সবদিক থেকেই আক্রান্ত বর্তমান সরকারের সেই ক্ষমতা আছে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আর সত্যি করে বললে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের সেই শক্তি আছে কিনা সেটাও বড় প্রশ্ন। তাদের যোগ্যতা আমাদেরকে খুব বেশী আশা কি দেখায় ?

আজ তাই আওয়ামীলীগ বিএনপির গোষ্ঠীগত স্বার্থচিন্তা ত্যাগ করে দেশটাকে অখন্ড ও শান্তিপূর্ন রাখার স্বার্থে সকল পক্ষের একমত হতে হবে। কারন সবাইকে বুঝতে হবে দেশটার অস্তিত্বই যদি না থাকে তাহলে সবকিছুই অর্থহীন হয়ে পড়বে। এজন্য সবার আগে সাধারন মানুষকে সচেতন হতে হবে, তারপরই রাজনৈতিক সকল পক্ষকে সাথে পাওয়া যাবে। আর পার্বত্য সমস্যার শুরু থেকেই আমাদের সেনাবাহিনী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদেরকে আরও বেশী করে পার্বত্য ইস্যুর সাথে জড়িত করতে হবে সুদুরপ্রসারী চিন্তা থেকে। এছাড়া আমাদের জন্য আর কোন পথ খোলা নেই।

কেননা শান্তি বজায় রাখার জন্য বিচক্ষন রাজনৈতিক শক্তির সাথে শক্তিশালী সামরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।