ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

নতুন করে মায়ানমারের রাখাইন / আরাকান প্রদেশে দাংগা ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত বিশ্ব সংবাদসূত্র মারফত জানা গেছে ৮০ জনের উপরে নিহত হয়েছেন। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন দাংগার জন্য তার সরকারের দায় স্বীকার করেছেন বিবিসির সা্ক্ষাতকারে। নতুন করে সেখানে দাংগার কারনে বাংলাদেশে রোহিংগা অনুপ্রবেশএর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ১৬ কোটি মানুষের নিরাপত্তা ও দেশের স্বার্থে আমাদেরকে সচেতন থাকতেই হবে এবং বাংলাদেশকেও তার পূর্বের অবস্থানে ঠিক থাকতে হবে। আমাদের সরকারের পূর্ববর্তি অবস্থানের কারনেই এবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দাংগা বন্ধের জন্য লজ্জার খাতিরে হলেও মিয়ানমার সরকারকে মিউ মিউ করে চাপ দিচ্ছে এটাই আমাদের অর্জন।

গত জুন এ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মায়ানমারের আরাকান প্রদেশে কয়েকদিনের দাংগায় অনেক মানুষ আহত ও নিহত হয়েছিলো এবং অনেক বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিলো সেটা বিক্ষিপ্ত নিউজ মারফত আমরা জেনেছিলাম। সেখানে আসলে কি ঘটেছে বা কতটুকু ভয়ংকর অবস্থা তা সেখানকার সরকারের নিয়ন্ত্রিত সংবাদ প্রকাশের কারনে ভালকরে আমরা এখনও জানতে পারিনি। আর মায়ানমার সরকার দাঙ্গা পরিস্থিতির উত্তরনের জন্য ভালমতই চেষ্টা চালিয়েছিলেন সেটাও এখন অনেকটাই পরিষ্কার । তারপরও নতুন করে দাঙ্গা বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর।

মায়ানমারের আরাকান এর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির সংখ্যা বর্তমানেই অনধিক ১০ লাখ, যারা ধর্মের দিক দিয়ে মুসলিম এবং সংখ্যালঘু। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধধর্মাবলম্বি রাখাইনদের সাথেই গত প্রায় কয়েক শতাব্দিযাবত বসবাস করে আসছে। আজথেকে ২০ বছর আগে একবার এই উভয়জনগোষ্ঠির দাংগাজনিত পরিস্থিতির কারনে প্রায় ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আমাদের দেশে পালিয়ে এসেছিলো, যার সিংহভাগই আর কখনও সেদেশে ফেরত যায়নি। বাংলাদেশে থেকে যাওয়া এই রোহিংগা জনগোষ্ঠি আমাদের জন্য “গোদের উপর বিষফোঁড়া” অবস্থার সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘ ও এর অংগসংস্থাগুলির নপুংসক আচরন আমাদের মত গরিব দেশকে ততোধিক বিপর্যয়কর অবস্থার মুখে রেখেছে আজ প্রায় ২০ বছরেরও অধিককাল।

আজ হতে কয়েকশত বছর আগে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং মায়ানমারের আরাকান অঞ্চল একই শাসনাধীন এলাকা ছিলো তাই মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে এদেশ থেকে ওদেশে মাইগ্রেট করেছে। আবার সেখান থেকেও মাইগ্রেট করে আমাদের এখানে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠী এবং বরিশাল অঞ্চলের কুয়াকাটার উপজাতি জনগোষ্ঠী। আজ আমরা যদি বলি ওরা বাংগালী নয় তাই তাদেরকে এদেশ থেকে তাদের পূর্বের ঠিকানায় চলে যেতে হবে, তা কি কোন যৌক্তিক কথা হবে ? কোন মতেই তা হবে না। যুগ যুগ এদেশে বসবাসের কারনে সবাইই বাংলাদেশী হয়ে গেছে। এটা সবাইকেই মেনে নিতে হবে এবং আমরা বাংগালীরা তা মেনে নিয়েছি। সবচাইতে বড় কথা যখন এসমস্ত মাইগ্রেশন ঘটেছে তখন তা একই দেশের ভিতরেই ঘটেছে।

নতুন করে গত কয়েকদিনের আরাকানের দাংগাজনিত কারনে রেহিংগা জনগোষ্ঠির অনেকেই পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে বা আসতে চাচ্ছে যা সেখানকার বিপর্যয়কর অবস্থারই নির্দেশক। বাংলাদেশের বর্ডারগার্ড ও কোষ্টগার্ড এনিয়ে খুবই কঠোর সিমান্ত টহলের ব্যাবস্থা নিয়েছে তাও আমরা পত্রিকা মারফত জেনেছিলাম। বাংলাদেশের সরকারও তার অবস্থান পরিষ্কার করে তখন বিবৃতি দিয়েছিলো। মোটকথা বাংলাদেশে নিজের জনসংখ্যা নিয়েই যেখানে জটিল সমস্যা আক্রান্ত সেখানে নতুন কাউকে গ্রহন করতে প্রস্তুত নয়। সর্বোপরি রোহিঙ্গারা এদেশে শরনার্থি হিসেবে আসছে না, তাদের উদ্দেশ্য এদেশে স্থায়ীভাবে থাকা, যাদেরকে আমাদের এখানকার ধর্মান্ধ একটি গোষ্ঠি মদত দিয়ে যাচ্ছে। আর না বুঝে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত কিছু বোকা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

ব্লগেও রোহিংগাবিষয়ক জ্বালাময়ী পোষ্টের অভাবও দেখা যাচ্ছে না, যার বেশীরভাগই তাদেরকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া নিয়ে। মিনিটে মিনিটে নতুন নতুন পোষ্ট প্রসব করা হচ্ছে কান্নাকাটি করে। সাথে সাথে জাতিসংঘের নপুংসক সংস্থা “ইউএনএইচসিআর” রোহিংগাদেরকে আমাদের দেশে ঢুকতে দেয়ার জন্য মায়াকান্নাও শুরু করেছিলো। আরেকটা মানবাধিকারের ফেরিওয়ালা “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ” ও তার সাথে সুর মিলিয়েছিলো। তবে সরকারের রোহিংগা বিষয়ে সরকারের অবস্থানের কারনে তাদের অবস্থান পাল্টেছে সেটা পরিষ্কারভাবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

এই দুটি সংস্থার কার্যক্রম ও আচরন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এবং দিচ্ছে। বিশ্বরাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে এদের যে সুদুরপ্রশারী কার্যক্রম আছে তা এখানে বলতে গেলে পোস্টের আকার অনেক বড় হয়ে যাবে। এদের পূর্বের অনেক কার্যক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ।

ওদের কাছে আমাদের প্রশ্ন, আপনারা দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশী হয়ে যাওয়া কক্সবাজারের রোহিংগা বিষয়ক সমস্যা এখনও সমাধান করতেই পারলেন না, তার উপর এখন নতুন শরনার্থী নেয়ার জন্য বাংলাদেশকে কোন অধিকারে চাপ দেন ? বাংলাদেশ গরীব ও ছোট দেশ তাই তাকে চাপে ফেলা সহজ । মায়ানমার সরকারকে চীনের মাধ্যমে চাপে ফেলে সেখানকার সংখ্যালঘুদেরও উপর নৃশংসতা বন্ধ করার ব্যাপারে আপনাদের কোন কার্যক্রম আছে কি ?

৯০ এর দশকের রোহিংগা শরনার্থী সমস্যার সময়ে বাংলাদেশে এসেছিলো ৫ লাখ রোহিংগা তাদের সামান্যই মায়ানমারে ফেরত গেছে। আর জাতিসংঘের তত্বাবধানে বর্তমানে মাত্র ২৫০০০ রোহিংগা কক্সবাজারের ক্যাম্পে আছে। তারমানে বাকী সাড়ে ৪ লাখ রোহিংগা বাংলাদেশের মানুষের সাথে মিশে গেছে।

আর ব্লগে যারা “মুসলিম-মুসলিম ভাই-ভাই” বলে গলা ফাটাচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্যে কয়েকটা প্রশ্ন করি। আপনাদের আসল ধান্ধা আমরা মনে হয় ধরতে পেরেছি। আচ্ছা বলুন তো মুসলিম জাহানের কেন্দ্র বলে আমরা যাদেরকে জানি, সেই সৌদি আরব বা আরব দেশগুলি কি তাদের মুসলিম ভাই রোহিংগাদের জন্য কোন কার্যক্রম গ্রহন করেছে ? তারা দু একটি ধমকও কি মায়ানমার সরকারকে দিয়েছে এ ব্যাপারে ? উত্তর হল না দেয় নি। কেন দেয় নি জানেন ? তারা আমাদের মত গাধা নয়। নিজের দেশের স্বার্থ তারা ভাল করেই বুঝে। মিয়ানমারের তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো মালিকানা কাদের তা জানলে অনেকেই চুপ করে যাবেন। বঙ্গোপসাগর থেকে মায়ানমারের আরাকান হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত যে প্রস্তাবিত তেল ও গ্যাস লাইন যাবে তারই প্রতিক্রিয়ায় এই দাঙ্গা সেটা কি বুঝিয়ে বলার দরকার আছে ?

এবার আরেকটা প্রশ্ন করি আপনাদেরকে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পূর্বভারতের আসাম, মিজোরাম, ত্রিপুরায় কয়েক বছর পরপরই বাংগালী খেদাও নামে একটা দাংগাজনিত অবস্থা প্রায়ই সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়। ভারতের জাতীয় একটি দল বিজেপিও মাঝে কয়েকবার ভারতের বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠিকে বাংলাদেশ থেকে আসা বলে অপপ্রচার চালিয়েছিলো এবং সীমান্তরক্ষী বিএসএফ কর্তৃক পুশইন করার চেষ্টা করেছিলো। আজ যদি আবার একই রকম অবস্থার সৃষ্টি করা হয় আপনাদের অবস্থান তখন কি হবে ? নাকি ভারত ও বার্মার সকল নাগরিককে মুসলিম বলে বুকে টেনে নিবেন ?

এব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার যে অবস্থান নিয়েছে তাকে সচেতন ও দেশপ্রেমিক সবাই সমর্থন দিবে। তবে শুধু বাংলাদেশ সরকারের এই অবস্থান থাকলেই হবে না, মায়ানমার এর রাষ্ট্রদূতকে প্রেসিডেন্ট ভবনে ডেকে পাঠিয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করে দিতে হবে। সাথে সাথে তাদের দেশের বিপর্যয়কর অবস্থার অবসানে তাদের অগ্রগতির ব্যাপারে জানা যেতে পারে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দিপুমনি জাতীয় সংসদে এই পুরো ব্যাপারটা নিয়ে বিবৃতিতে বাংলাদেশের অবস্থান পরিস্কার করে দিয়েছেন। তার বক্তৃতায় অনেকেরই থলের বিড়াল বের হয়ে গেছে। তিনি কি বলেছেন তা নুতন করে এখানে আর বলার দরকার আছে বলে মনে করি না। স্বাধীন দেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিৎ তার একটা ছিঁটেফোঁটা নমুনা তার বক্তৃতায় দেখা গিয়েছিলো। সব ব্যাপারেই ভবিষ্যতে এরকম অবস্থান যেন বাংলাদেশের থাকে সেটা আমরা আশা করব।

সর্বোপরি মায়ানমার স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ তার অভ্যন্তরীন ব্যাপারে চাইলেই যা খুশি আমরা তা বলতে বা করতে পারিনা। তাছাড়া তাদের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক বিদ্যমান। বন্ধুপ্রতিম একটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে গায়ে পড়ে ঝামেলা সৃষ্টি করা কোন শুভবুদ্ধির মানুষ চাইতে পারে না। আমরা শুধু তাদের কারনে আমাদের এখানে যেন কোন বিপর্যয়কর অবস্থার সৃষ্টি না হয় তা তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে পারি। আর সীমান্ত খুলে দিতে যারা ব্যাকুল তাদের উদ্দেশ্যে বলি সীমান্ত খুলে দেয়ার মানে হল মায়ানমারের সাথে ঘোষনা দিয়ে বৈরিতা শুরু করা যা কোনমতেই কাম্য হতে পারে না। ধর্মের আওয়াজ তুলে সীমান্ত খুলে দিয়ে আমাদের দেশের অর্থনীতির উপর, সমাজব্যবস্থার উপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা দেশপ্রেমিক কোন নাগরিক চাইতে পারেন না।

সর্বোপরি, আমার দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও জনগনের নিরাপত্তা অন্য যেকোন কিছুর চাইতে বড়, হোক না সেটা মানবতা।