ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ত্ত্বাধীন একটি কলেজের নাম হচ্ছে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ। এই কলেজটির নামের সাথে মহিলা শব্দটি যুক্ত না থাকলেও এই কলেজে শুধুমাত্র মেয়েরাই অধ্যয়ন করার সুযোগ পায়। এই কলেজে ছেলেদের কোন প্রবেশাধিকার নেই।

স্বাভাবিক বোধ থেকে প্রশ্ন জাগে, গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ক জ্ঞান কি শুধু মেয়েদেরই জানার দরকার; ছেলেদের বোঝার দরকার নেই? আচ্ছা ধরেই নিলাম, গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে মেয়েদের একচেটিয়া অধিকার; সেখানে ছেলেদের কোন ধরনের প্রবেশাধিকার নেই । কিন্তু এটা ধরে নিলে স্বাভাবিক ভাবেই যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসে সেটি হলঃ সাধারণ অর্থনীতি বিষয়ক যে জ্ঞান তাতে মেয়েদের প্রবেশাধিকার থাকবে কি না?

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, সাধারন অর্থনীতি বিষয়ক জ্ঞান, ছেলে-মেয়ে সবাই অর্জন করছে। কিন্তু পূর্বে অর্থনীতি বিষয়ক জ্ঞান তো দূরের কথা শিক্ষা লাভের কোন অধিকারই মেয়েদের ছিল না । সমাজের ক্রমবিবর্তন এবং নানা মনীষীদের অবদানে মেয়েরা বর্তমানে শিক্ষা লাভের অধিকার পাচ্ছে । কিন্তু আমাদের সমাজে পুরুষরা আজো গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ক জ্ঞানে অধিকার পেলো না!

বর্তমান সমাজে নারীদের কিছু ভাসা ভাসা অধিকার আইনগত ভাবে স্বীকৃত হলেও এ অধিকারগুলোর শক্ত কোন সামাজিক ভিত্তি নেই । এবং তাদেরকে আজো অবলা, ললনা, রমনী, কামিনী, মহিলা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতা ও নিগ্রহ জ্ঞাপক বিভিন্ন ধরনের শব্দে ডাকা হয় ও সমাজে তাদের প্রতি আচরণ ওরকমই-শব্দ ব্যাবহারের সাথে অনেকটাই মিলে যায়। কিন্তু পুরুষকে ঠিকই সম্বোধন করা হয় বিভিন্ন ধরনের শক্তিব্যঞ্জক শব্দে। এবং বড় বড় পদবাচক শব্দগুলো এখনো পুরুষবাচক। ইংরেজি ভাষায় পুরুষ পদবাচক শব্দগুলো পরিবর্তন করে নৈর্ব্যত্তিক শব্দ প্রবর্তিত হচ্ছে। যেমনঃ চেয়ারম্যান এর বদলে চেয়ারপারসন, ফোরম্যান এর জায়গায় সুপারভাইজার ইত্যাদি। কিন্তু বাংলা ভাষায় এরকম কোন লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছেনা। বাংলা ভাষায় আজো মানুষ বলতে পুরুষকে বোঝানো হয়, মেয়ে বোঝাতে হলে মানুষ শব্দটির পূর্বে মেয়ে শব্দটি জুড়ে দিতে হয়।

রাষ্ট্রীয় আইনে উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমানাধিকার আজো অর্জিত হয়নি । সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্দরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নারী-পুরুষ বৈষম্যের বিকৃত রূপ । পুরুষ, মানুষ হিসেবে যতটুকু অধিকার সমাজের নিকট থেকে পায় তার একাংশও নারী পায় না । তারপরেও নারী বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত । আর এত কিছুর পরেও পুরুষকে দেয়া হল শুধুমাত্র বাহিরের দায়িত্ব এবং নারীকে দেয়া হল ঘর-বাহির দুটোরই দায়িত্ব ।

সমাজ পূর্বে নারীদেরকে শুধুমাত্র ঘরের কাজের দায়িত্ব দিত, বাহিরের কাজে হাত দিতে দিত না । এখন কিন্তু ধীরে ধীরে বাহিরের কাজে অংশগ্রহনের সুযোগ তারাও পাচ্ছে । কিন্তু পুরুষ সেই আদিকাল থেকেই বাহিরের কাজ নিয়েই ব্যাস্ত হয়ে আছে, ঘরের কাজের অধিকার সে আজ অব্দি পেল না বা নিল না । আবার কোন পুরুষ যদি ঘরের কাজের দায়িত্ব নেয় বা নিতে চায়, তাহলে সমাজে তাকে ঘিরে ছি ছি পড়ে যায়। সে পরিনত হয় সমাজের সবচেয়ে ব্যক্তিত্বহীন চরিত্রে ।

যে দম্পত্তির স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরী, ব্যবসা বা বাহিরের অন্য কোন কাজের সাথে জড়িত; সেখানে সাধারনত দেখা যায়, শুধুমাত্র স্ত্রীকেই বাহিরের কাজ থেকে ক্লান্ত শরীরে ফিরে এসে ঘরের সকল কাজ সম্পন্ন করতে হয় । আবার যে দম্পতিকে স্বামী সারাদিন বেকার বসে থাকে সেখানেও ঐ স্ত্রীকেই ঘর -বাহির একাই সামলাতে হয়। তারপরেও ঐ বেকার স্বামীটিই গৃহস্বামীর মর্যাদা লাভ করে । এভাবেই সমাজ তৈরীকৃত অসম শ্রম -বন্টন, নারী-পুরুষের মধ্যে নিদারুণ বৈষম্য তৈরী করছে; ফলে সমাজের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে।

সমাজের এরকম অবস্থায় রাষ্ট্রের কি উচিৎ নয় এই বৈষম্য দূর করতে সমাজকে সচেতন করে তোলা ? সেটা না করে রাষ্ট্র যদি এই অসম শ্রমবন্টনকে স্বীকৃতি দেয়া এবং বাড়িয়ে তোলার জন্য; গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে শুধুমাত্র মেয়েদের প্রবেশাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে; তাহলে সেটা রাষ্ট্রের উচিত কাজ হবে? গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ক জ্ঞান যেমন একজন নারীর দরকার তেমনি দরকার একজন পুরুষেরও। নারীকে ঘরের কাজে আটকে ফেলার ষড়যন্ত্রের কারনে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে প্রবেশাধিকার শুধুমাত্র নারীর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এখন পর্যন্ত।