ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

মূলঃ ইউনিস অং (নিউইয়র্ক ভিত্তিক একজন অভিনেতা)
অনুবাদঃ মেহেদী হাসান

বব ডিলানের সঙ্গীত ও জীবনের নানা বৈচিত্র্যময় দিক নিয়ে পরিচালক টড হেয়নেস নির্মান করেছেন তার ছবি “i am not there”। এই সিনেমাতে দেখানো হয়েছে, শিল্পকলা সত্যকে তখনই উন্মোচন করে যখন মানুষের কল্পনা তাকে বাস্তবতার অনুকরন করা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়।

ছয়টি চরিত্র(ক্রিস্টিয়ান বেল, কেট ব্লানচেট, মারক্যুস কার্ল ফ্রাঙ্কলিন, রিচার্ড গিয়ার, হিথ লেজার এবং বেন হোয়াইশ) বব ডিলানের জীবনের এমনসব বৈচিত্রময় দিক চিত্রায়িত করেছেন যা এর পূর্বে কোথাও কখনো দেখানো হয় নি। তার জীবনের নানা দিককে এখানে বিভিন্ন চরিত্র এবং আলাদা আলাদা গল্পে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই আলাদা গল্পগুলো তাদের নিজস্বতা বজায় রেখেই এগিয়ে গিয়েছে যদিও মাঝে মাঝে পারস্পারিক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে তেমনি কখনো কখনো একে অপরের ভেতর প্রবিষ্ট হতেও দেখা গেছে।

আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকান ১৩ বছর বয়স্ক ওডি নামে একজন ভবঘুরে কিশোরের ভুমিকায় অভিনয় করে মারক্যুস কার্ল ফ্রাঙ্কলিন। ওডি তার প্রিয় গিটারটি সাথে নিয়ে ট্রেনের ওয়াগনে(মালবাহী বগী) চড়ে ঘুরে বেড়ায়। তার প্রিয় গিটারের গায়ে লেখা থাকে “এই যন্ত্র স্বৈরাচার নিপাত করে”।

অর্থারের ভূমিকায় বেন হোয়াইশকে(ডিলান যখন কবি রিমবাড) পুরো সিনেমা জুড়ে ক্যামেরার দিকে মুখ রেখে টেবিলের পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। কিছু অদৃশ্য প্রশ্নকারী তাকে অবিরত জিজ্ঞাসাবাদ চালাতে থাকে।
জ্যাক রলিনসের ভূমিকায় ক্রিস্টিয়ান বেল একটি প্রজন্মের “বিবেকের সঙ্গীত” হিসেবে আবির্ভূত হয়। সে একটি একস্টিক গিটার এবং বব ডিলানের বাল্যকালের মাউথ অর্গান গলায় ঝুলিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে বেড়ায়। কিন্তু তার ঝুঁকে পড়া লম্বাটে মুখ দেখে মার্কিন লোকগীতি শিল্পী ওডি গাথ্রির কথাই সকলের মনে পড়ে যায়।

রব্বীর ভূমিকায় সদ্যপ্রয়াত হিথ লেজার একজন আত্মকেন্দ্রিক এবং বহুগামী চিত্র তারকা যে একটি সিনেমাতে জ্যাক রলিন্সের ভূমিকায় অভিনয় করে অনেকের প্রশংসা লাভ করে। রব্বীর বউ ও তার সন্তানের মা ক্লেইরীর চরিত্র ফুটিয়ে তোলে অভিনেত্রী চারলট গিন্সবার্গ । ক্লেইরী তার নিরবিচ্ছিন্ন নীরবতার মধ্য দিয়ে রব্বির সফলতার সিড়ি এবং গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আবেগের কেন্দ্রে পরিণত হয়, যদিও রব্বীর প্রতি তার প্রেম এবং অবিরাম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অহমিকাবোধ ও নিসঙ্গতার মধ্যে দ্বন্দের কারনে তাকে দাম্পত্য জীবনে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি।

কেট ব্লানচেট, তার দুর্দান্ত অভিনয়ের মাধ্যমে রুপান্তরকামী( transcends gender) উজ্জ্বল তারকা জুড কুইন এর চরিত্রে অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দেয়। জুড ছেঁড়াখোঁড়া স্যুট পরে এলোমেলো চুলে, কালো সানগ্লাসের নিচে তার অস্পষ্ট চোখে ষাটের দশকের রহস্যজনক বব ডিলান এর মূর্তিতে আবির্ভূত হয়। ব্লানচেট খুব দক্ষতার সাথে পুরুষচরিত্রাভিনয় থেকে নিজেকে বিরত রাখে। শুধু বিখ্যাত লোকের মর্যাদা দেয় এমন পৃথিবী সমন্ধে সে তার সূক্ষ্ণ হতাশাকে এড়িয়ে চলে। জুড কুইন একজন প্রাজ্ঞ এবং সহানুভূতিশীল শিল্পীর চোখে তার চারপাশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশী দেখতে এবং অনুভব করে করতে পারে।

বিলি নামক একজন পৌঢ় রাখালের চরিত্রে অভিনয় করে রিচার্ড গিয়ার। বিলি সীমান্তবর্তী গোলক ধাঁধার শহরের এক কোনে বসবাস করে। যেখানে সে অন্য অনেকের কাছে যেমন তেমনি তার নিজের কাছেও অদৃশ্যই থেকে যায়। তথাকথিত উন্নতির নামে ছয় লেনের হাইওয়ে তৈরীর পরিকল্পনায় গোলক ধাঁধার অনেকটা ধ্বংশের মুখোমুখি হয়ে পড়ে।

সিনেমাটিতে আবহের উঠানামা- টড হেয়নেস এর নিয়ত পরিবর্তনশীল শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রকাশ করে। ঘোলাটে সাদা-কালো দৃশ্যগুলো- খোলা ওয়াগনের বাইরে কৃত্রিমভাবে তৈরী হলুদ-সবুজ মাঠ, শহুরে সন্ধ্যার ঘন নীল-সবুজ, হাসপাতালের হালকা হলুদ আলোঃ এরকম বিভিন্ন দৃশ্যের সাথে মিশে যায়। ষাটের দশকের গনঅভূত্থান, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, জন এফ কেনেডি এবং মার্টিন লুথার কিং এর বিভিন্ন ভিডিও দৃশ্য সিনেমাটির ভিতরে বিভিন্ন জায়গায় খুব সুন্দর ভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছে।

একজন বব ডিলানের বিভিন্ন রূপ এবং বিভিন্ন সময় প্রবাহের একটা আরেকটার সাথে মিশ খেয়ে যাওয়া- এমনকি কখনো কখনো কয়েক সেকেন্ডমাত্র সময়ের ব্যাবধানে, আমাদের স্মরন করিয়ে দেয় সেগুলোর সমন্তরাল বয়ে চলার কথা। পশ্চিমে জঙ্গলে থাকাকালীন সময়ে বিলি একদিন জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়-পর্বতের দিকে তাকিয়ে একটি অদৃশ্য ভয়ংকর দৃশ্যের কল্পনা করে। হঠাৎ করে ভিয়েতনামের ভয়ঙ্কর বিস্ফোরনের ভেতরে দৃশ্যটির ঢুকে যাওয়া- অমানবিক হত্যাকান্ডে আমাদের অন্তর্গত পর্যবেক্ষনের গুরুত্বই বহন করে। ক্যামেরা খুব দ্রুত বিলির পাহাড়-পর্বতের দিকে ঘুরে যাওয়ার পূর্বেই এই বিস্ফোরন আমরা দেখতে পাই টেলিভিশনের পর্দায়। বিবাহ ভেঙ্গে যাওয়ার একটি নির্বাক চিত্র দেখানোর মধ্য দিয়ে আমাদের টেনে নিয়ে যাওয়া হয় রব্বি এবং ক্লেইরীর জগতে যেখানে ক্লেইরী টেলিভিশনের পর্দায় ভিয়েতনামে বিস্ফোরনের ঐ দৃশ্যগুলো দেখছিলো।

ধারালো দাঁতের বিশাল মাথাওয়ালা তিমির গতিবিধি, কালো পর্দার উপর দিয়ে বিশালকার বিষাক্ত মাকড়সার চলাফেরা, ক্ষুদ্রাকৃতির মৃত ঘোড়ার সাথে নোংরা শিশু, নিজেই নিজের মাথার মধ্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়া মেয়েটির ভূতুরে ভঙ্গীতে জনতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকাঃ এধরনের পরাবাস্তব দৃশ্যের বিপরীতে জ্যাক রুলিন্স অথবা রব্বী এবং ক্লেইরীর বাস্তব চিত্র নিদারুন ভাবে ফুটে উঠে। জুড কুইন, চারজন কালো স্যুট পরা যুবকের সাথে ধোঁয়ার উদগীরনের মধ্যে দিয়ে আবির্ভূত হয় “কঠিন দিন রাত্রি” গানটি গাইতে গাইতে- ধীরে ধীরে উচ্চগ্রামে উঠে যাওয়া তাদের উল্লাস মুখর কন্ঠ পরস্পরকে ছাপিয়ে যায় যেন। জুড তার ওস্তাদের দ্বারা খুব দ্রুত সরে যাওয়ার সাথে সাথেই কিছুটা দূরে একদল উল্লাসমুখর মেয়ে যুবক চারজনকে পিছু ধাওয়া করে। পরিচালক টড হেয়নেস, ডিলানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে, ১৯৬৫ সালের নিউ পোর্টের লোক উৎসবে জুড এবং তার দল কর্তৃক মোহিত দর্শকের দিকে মেশিন গান ফায়ার ছুড়ে দেওয়ার চমৎকার দৃশ্যটির মাধ্যমে অসাধারন দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।

কার্নিভালে অংশগ্রহনকারী অদ্ভুত এবং সমাজ বিচ্ছিন্ন লোক দ্বারা সিনেমার ভেতর- বাহির ভর্তি। ছদ্মবেশী পরিবেশনা এবং দৃশ্যমানতা পরস্পর প্রবিষ্ট হয়ে আছে এই সিনেমাটিতে। কিশোর উডি বলে, জনসাধারন থেকে বিচ্ছিন্ন করে একজনকে উপরে উঠানো একটা উদ্ভট ব্যাপার। একটি কার্নিভালে সে দু জন বেকার যুবককে উদ্বুদ্ধ করে তার সার্ট গায়ে দেওয়ার জন্য।

জুড কুইন “জমি থেকে অনেকদূরে কিছু অদ্ভুত মানুষ” লেখা একটা ব্যানারের নিচে, “ব্যালাড অফ এ থিন ম্যান” গানটি গাইতে থাকার সময়ে হঠাৎ করেই বিশাল এক খাঁচায় নিজেকে পুরে একজন গীক(কার্নিভালে অংশগ্রহনকারী ভাড়) এসে পড়লে জুড কুইন অদৃশ্য হয়ে যায় কিন্তু গানটি চলতে থাকে। খাঁচার ভেতরে থাকা লম্বা চুলের সেই গীক, দাঁত দিয়ে একটি মুরগীর মাথা ছিড়ে ফেললে সমাজের উঁচু তলার শ্রোতারা অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে এবং মুরগীর পালকগুলো উড়ে এসে শ্রোতাদের উপর পড়তে থাকে। শ্রোতাদের মধ্যে একজন দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গেলেই সে খাঁচার মধ্যে ঢুকে যায় এবং জুড কুইন তার দিকে মাউথ পিস এগিয়ে দেয়।
গোলক ধাঁধার শহরে হেলোইন(খ্রীস্টানদের একটি ধর্মীয় উৎসব) শপগুলো সারা বছর খোলা থাকে। এই শহরের লোকজন ভাইকিংস(এক ধরনের ইউরোপীয়ান দস্যু), জলদস্যু, ভাড় এবং দানবের ছদ্মবেশ ধরে রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বিলি বলে, গোলক ধাঁধার শহরের চেয়ে অন্যকোন শহরের লোকজন হেলোইনকে এত বেশী ভালোবাসেনা। কর্তৃপক্ষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য যখন বিলি একটি চলন্ত ট্রেনের ওয়াগনের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে পড়ে তখনই সে তার হারিয়ে যাওয়া হলুদ কুকুর হেনরীকে দেখতে পায়- সবুজ মাঠের মধ্যে দিয়ে ট্র্যাক বরাবর দৌড়ে আসছে। বিলি তার কুকুরটিকে ডাকতে থাকে কিন্তু কুকুরটি পিছনে পড়ে গিয়ে একসময় তার দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। যা কিছু আমরা হারিয়ে ফেলি এবং খুঁজতে থাকি তা শুধু মাত্র তখনই আমাদের কাছে ফিরে আসে যখন আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি এবং সেখান থেকে আর ফিরতে পারবো না।

১৯৬৬ সালে বব ডিলান ন্যাট হেনটফের সাথে সাক্ষাতকারে যা বলেছে সেখান থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে জুড বলে, ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত সমন্ধে বলতে গিয়ে আমি বলেছি মানুষের মাথার ভেতরে যে গোলাপ বেড়ে ওঠে এবং প্রেমিক- প্রেমিকা যারা হাঁস থেকে দেবদূত এ পরিনত হয় তারা কখনো মারা যায় না। তুমি কল্পনা করতে পারো এই সমস্ত ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত জনসাধারণ যা সংগ্রহ করেছে তাদের রহস্যময়তা কিংবদন্তীর আকার লাভ করেছে। এসব জিনিস রহস্য, দন্দ্ব, এবং কোলাহলে ভরা। সাধারন মানুষ মনে করে আমার এক ধরনের অসাধারন কল্পনা শক্তি আছে। ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত বাস্তবের সাথে এতই সম্পর্ক রহিত যে এগুলো সহজে শেষ হয়ে যাবেনা। এবং কেবল এই ধরনের গানেই একমাত্র সাচ্চা মরন তুমি অনুভব করতে পারবে রেকর্ড প্লেয়ারের সাহায্যে। সাধারন মানুষ তাদের মহৎ উদ্দেশ্য থেকেই অন্যান্য সব কিছুর মত এগুলোকেও নিজের করে পেতে চায়। আমি মনে করি এটাকে ঐশ্বরিক(holy) ভাববার কোন অবকাশ নেই।

পুরোপুরি রহস্যাবৃত, সহজে বোঝা যায় না,এমনকি দর্শক স্রোতার কোন প্রশ্নেরই উত্তর দেয় না এমন একটি সিনেমা “আই এম নট দেয়ার”। এটি একটি আবেগ ঘন সঙ্গীতের মূর্ছনা যা আমাদের মনের উপর আছড়ে পড়ে এবং অবচেতনের গভীরতম স্তর থেকে এটাকে আবার খুঁজে পাই। এই সিনেমাটি রহস্য, অনিশ্চয়তা, এবং আমাদের অন্তর্গত হয়ে উঠার প্রক্রিয়াকে সম্বর্ধনা জানায়।