ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ


উপরের শিরোনামে এর পূর্বে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, সেখানে আরোপিত বিয়ে নিয়ে কিছু আলোচনা ছিল । প্রবন্ধের উপসংহারে আমি বলেছিলাম, বিয়ে নামক চুক্তিটি কেবল পারে ; মানব-মানবীর সম্পর্ককে আরো বেশী বৈষম্যমুলক করতে এবং সমাজকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে ।

একজন পাঠক মন্তব্য করে , ভালোবাসার বিয়েও কি সমাজকে পিছনের দিকে টেনে নিয়ে যায় কিনা ? এই প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনার জন্যই আমার এই বর্তমান প্রয়াস ।

প্রথমেই ভেবে দেখতে বলি , একজোড়া মানব-মানবীর মধ্যে যদি পরস্পরের প্রতি প্রেম , ভালবাসা , বন্ধুত্ব ,হৃদয়াবেগ ও যৌনপ্রনয় থাকে , তাহলে ; পরিবার , সমাজ ও রাষ্ট্রের নিকটে দাসখত দেয়ার প্রয়জনটা আসলে কোথায় ?

মানুষ সাধারনত এবং স্বাভাবিক ভাবে যৌন সংসর্গের জন্য কোনধরনের দায়বদ্ধতা স্বীকার করতে চায়না , এর পেছনে মূল বিষয় হিসেবে কাজ করে ; প্রেম, ভালবাসা, বন্ধুত্ব এবং যৌনপ্রণয় । এগুলোর কারনেই নর-নারী মিলিত হতে চায় শারীরিক ও মানসিক ভাবে এবং স্বাভাবিক ভাবে মিলিত হয় এবং ,যৌনমিলনের মাধ্যমে ভালবাসার সন্তান উৎপাদন একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় ।

এ বিষয়গুলোতে , নরের তুলনায় একজন নারীকে অনেকবেশী স্পর্শ কাতর হতে দেখা যায় । পৃথিবীতে এমন একজন নারীকেও সম্ভবত খুজে পাওয়া যাবেনা , যে সমাজ , রাষ্ট্র ,প্রথা ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার প্রভাব সম্পুর্ণ রুপে রহিত অবস্থায়; এমন কোন পুরুষের সাথে শারীরিক ভাবে মিলিত হতে চায় বা তার ঔরষে সন্তানের জননী হতে চায়; যাকে সে ভালবাসেনা বা যার প্রতি তার কোন যৌন প্রনয় নেই । এমনকি একজন পুরুষও স্বভাবতই চাইবেনা এমন কোন নারীর সাথে যৌন সংসর্গ করতে বা তার গর্ভে নিজের ঔরসজাত সন্তান উতপাদন করতে যার প্রতি তার প্রেম এবং যৌনপ্রনয় নেই । কিন্তু আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নরের ক্ষমতার দাপট অনেক বেশী হওয়ার ফলে এক্ষেত্রে তার স্পর্শকাতরতা একটু কম ,যৌন মিলনের মাধ্যমে , উত্তরাধিকার তৈরী করাই অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ।

নর-নারীর যৌনপ্রনয়ের মত সুন্দর , সাবলীল , মধুর , চমৎকার , আবেগ গ্রাহিত , হৃদয় মোহিত করা অনুভুতি পৃথিবীতে আর আছে বলে মনে হয় না । নর-নারীর প্রেম নিয়ে কত কবিতা , কত উপন্যাস ,কত গল্প-গাথা , কত সিনেমা- নাটক ,কত গান ,কত চিত্র , কত ভাস্কর্য , সর্বোপরি কত শিল্প যে আছে তার হিসাব –নিকাশ করা সম্ভব নয় – আরো কত যে রচিত হচ্ছে এবং আগামীতে হবে , সেটা আগাম বলার মত ধৃষ্টতা কেঊ দেখাতে পারবে বলে মনে হয় না । আর এই যৌন প্রনয়ের কারনে নর-নারী পরস্পরকে যত তীব্র ভাবে কাছে টানতে পারে ,যত আঙ্গাআঙ্গীভাবে নিজেদের জীবনকে জড়াতে পারে ; অন্য কোন প্রনয় সম্পর্ক এতোটা পারেনা । আর এই যৌন প্রনয় যদি কোনরকম ভাবে ভেঙ্গে পড়ে তাহলে অন্য কোন কিছু আর তাদের হৃদয়কে একসাথে বেধে রাখতে পারেনা । সমাজ ও রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক প্রথা নিয়ম বন্ধন তাদের অপ্রেম শরীর দুটিকেই কেবল লৌহ শিকলে বেধে রাখতে পারে । কিন্তু তাদের মানবিক সম্পর্কের সুত্রগুলো আলঅগা হয়ে পড়ে যায় , সেগুলোকে আর খুজে পাওয়া যায় না ।

কথা হচ্ছে ভালোবাসার বিয়ে নিয়ে , যৌন প্রনয়কে বিয়ে নামক চুক্তির আবরনে ঢেকে দেয়া নিয়ে । প্রেমিক – প্রেমিকার যখন বিয়ে হয়ে যায়, তখন আমাদের সমাজ তাদেরকে আর পূর্বের রূপে দেখতে পারেনা বা চায় না ; পুরোপুরিই ভাবে দেখে বিয়ে করা দম্পত্তি হিসেবে । আরোপিত বিয়ের দম্পত্তিটিকে যেভাবে দেখে ,তার চেয়ে খুব বেশী পার্থক্য এখানে করেনা ।

এখন অনুধাবন করার চেষ্টা করি, দাম্পত্য জীবনে নর-নারীর সম্পর্ককে সমাজ কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে অভ্যস্ত ? এর জবাবে এক কথায় বলা চলে, নারীকে নরের যৌন দাসী এবং সন্তান উতপাদনের উপায় হিসেবে । আর সমাজ শুধু দেখেই শান্ত হয় না , তার চাওয়াটাই এরকম এবং চাওয়া পূরন না হলে সে ক্ষেপে যায় ,ক্ষেপে গিয়ে মারতে উদ্যত হয় এবং মারে ।

আরেকটি বিষয় নর-নারীর প্রনয় সম্পর্ক যতই গভীর হোক না কেন , তারাও কিন্তু আমাদের সমাজেরই মানুষ । পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শোনিত তাদের শিরা –উপশিরা ও ধমনী দিয়ে চালিত হচ্ছে । তাদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তারা এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গহ্বরে প্রবেশ করে । অনেকটা দ্রোহির আত্মসমর্পনের মত ; কারন আমাদের সমাজে বিয়ে বহির্ভূত যৌন প্রনয় পুরোপুরি নিষিদ্ধ । বিয়ে বহির্ভূত প্রনয় সম্পর্ক স্থাপন করেছে ,মানে তারা দ্রোহ করেছে ; এই প্রেম নিষিদ্ধ সমাজের বিরুদ্ধে । মরিচা পড়া এই সমাজের বিরুদ্ধে প্রেমময় বিদ্রোহই পারে প্রচন্ড ঝাকিতে সমাজকে কলুষ মুক্ত করতে । দ্রোহীদের আত্মসমর্পনের কারনেই সমাজ কলুষমুক্ত হতে পারছেনা ,পুরুষতান্ত্রিক আদ্রতায় মরচে ধরছে আরো বেশী করে ।

প্রেমময় বিদ্রোহীরা যখন আত্মসমর্পন করে এবং প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে , তখন তাদের শিরা উপশিরার ভেতর দিয়ে সমাজের নষ্ট রক্তের চলাচল বেগবান হয় । এবং সমাজের চাহিদার কারনে এবং সমর্পিত দ্রোহীদের , নিজেদের ভেতরে সেই চাহিদার আবির্ভাবের ফলে , প্রনয়ীদের পরস্পরের প্রতি চাহিদাগুলোও পরিবর্তিত হতে থাকে ধীরে ধীরে । নরটির নিকটে ,নারীটির প্রেমিকা রূপ আস্তে আস্তে অস্পষ্ট হতে হতে একসময় ভেসে উঠে বিয়ে করা বউ এর মুখ । যে বউ যখন তখন তার যৌন লালসা পূরন করবে , সামাজিক শ্রম করুক না করুক ,করবে সংসারের সমস্ত কাজ , এবং উত্তরাধিকার তৈরীর জন্য করবে সন্তান উতপাদন । এবং নারীটিও সমাজের আদেশ , নির্দেশ এবং রঙ্গচঙ্গা উপদেশে পুরুষটিকে আর দেখতে পায়না প্রেমিক হিসেবে ,দেখতে অভ্যস্ত হয় শরীর ও মনের মালিক হিসেবে ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ,কেন আমাদের সমাজ ; নারীকে ,পুরুষের যৌনদাসী ,ঘরের বিভিন্ন কাজ কর্মের দাসী ,এবং শুধুমাত্র সন্তান উতপাদনের ঊপায় হিসেবে দেখতে চায় ? এই প্রশ্নের জবাবে অনেকেই সমস্বরে বলে উঠবেন , সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতার কারনে নিশ্চয় । তাহলে আবারও প্রশ্ন জাগে ,সমাজে এই পুরুষতান্ত্রিকতার অবস্থানটি কেন ?

এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার পূর্বে , ইতিহাসের একটি ঘটনা বলে নেয়া ভাল । ইউরোপে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় , প্রায় সমস্ত যুবা পুরুষ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ শক্তির সাথে মরনযুদ্ধে লিপ্ত । যুদ্ধ করতে হলে ,শুধু মাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের উপস্থিতি থাকলেই চলেনা , দেশ থেকে অস্ত্রশস্ত্র ,ইউনিফরম , খাবার , চিকিতসা উপকরন প্রভৃতি জিনিসপত্র যোগান দেয়া একান্ত জরুরী । আর এগুলোর যোগান দিতে হলে কলকারখানা সচল রাখা আবশ্যিক । কিন্তু শ্রমিক ছাড়া তো আর কলকারখানা সচল রাখা সম্ভব নয় । তখন যুদ্ধে লিপ্ত ধনঅতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্র নায়করা বাধ্য হয় , মহলের ভেতরে আটকে থাকা মেয়েদের ঘরের বাহিরে নিয়ে এসে ; সামাজিক শ্রমে অংশগ্রহন করাতে । সামাজিক শ্রমে অংশগ্রহন নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে অর্থনীতির সাথে তাদের সরাসরি অংশগ্রহন নিশ্চিত হয় । নারী লাভ করে অর্থনৈতিক মুক্তি এবং অনেকাংশে স্বাধীন হয় সমাজের পুরুষতান্ত্রিক নাগপাশ থেকে । আর সেই যে ইউরোপে, নারী ঘরের বাহিরে আসলো , অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাদ পেল তারপরে তাকে আর মহলের ভেতরে ঢোকানো সম্ভব হয়নি ।

কিন্তু ইউরোপের ধনতান্ত্রিক সমাজের হর্তাকর্তারা নারীকে পন্যে পরিনত করে , ঢুকাচ্ছে সুদৃশ্য প্যাকেটের ভেতরে ,এবং যে সমাজে নারীরা ঘরের বাহিরে আসেনি ,সেখানে নারীদেরকে জোর করে ঘর থেকে টেনে বের করা হচ্ছে ,প্যাকেটের ভেতরে ঢোকানোর মানসে । মেয়েদের কাচা মাংশ ছেনে ,আধুনিকতার কলে ঢুকিয়ে তৈরী করছে সুস্বাদু লোভনীয় পন্য । কারন তারা সবকিছুকে পন্যে রুপান্তরিত করে ,সেখান থেকে লুটতে চায় শুধুই মুনাফা । এবং আরেকটি গুরুত্বপুর্ন বিষয় হচ্ছে নারীকে পন্যে রূপান্তরিত করতে না পারলে , অন্যান্য পন্য বাজারজাত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় । তাই তারা নারীকে করতে চায় পন্যের শিরোমনি । তারা আরো চায় অন্য সকল ধরনের পন্যের গায়ে নারী নামক পন্যের ট্যাগ লাগাতে । এই কাজে তারা ইতিমধ্যেই অনেক বেশী সফলতা লাভ করেছে মহলের নারীকে পুরে ফেলেছে প্যাকেটে । সকল নারীরা এখন দল বেধে বিবর্ণ , চুনকাম খসা ঘর থেকে বেরিয়ে রঙ্গিলা প্যাকেটে বন্দী হচ্ছে । বন্দীত্বের ধরনটাই শুধু পাল্টাচ্ছে ,বন্দীত্ব ঘোচেনি বরঞ্চ আরো সংকীর্ণ হয়েছে ।

ইউরোপের মত আমাদের মত আধা সামন্তীয় সমাজেও ধনতান্ত্রিকতাবাদের দোসররা ,পন্যের বাজারজাতকরনের উদ্দেশ্যে মেয়েদেরকে ঘর থেকে বের করে এনে প্যাকেটে পুরছে । এতে করে আমাদের সমাজের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা মনে করছে তারা বুঝি মুক্তি পেল , স্বাধীন হল , নারী – পুরুষ সমানাধিকার পেল । কিন্তু পন্য হয়ে প্যাকেটে বন্দী হওয়ার মানে কি মুক্তি হতে পারে ?

ইউরোপের ক্ষেত্রে ঘটনাটির মোড় এমনভাবে ঘুরে যেতে পারল কিভাবে ? কারন নারী মুক্তির জন্য সচেতন প্রয়াস ছিল না এবং নারীদের মধ্যে ছিল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সচেতনতার অভাব, বা ধনতান্ত্রিকতাবাদের ধূর্ততার কাছে তাদের ঘটেছে নির্মম পরাজয় ।

প্রথম ও দ্ধিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের মত , আমাদের দেশেও ঐ রকম একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে । ধন্তান্ত্রিকতাবাদের দোসররা আরো অধিকহারে শ্রম শোষন করার জন্য ,নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মেয়েদের ঘরের বাহিরে টেনে আনছে । বিষয়টা খুব ভালো ভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে গার্মেন্টস নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে । এক্ষেত্রে নারীরা বিভিন্ন রকমের অত্যাচার , নির্যাতন, নিগ্রহ ও অধিকহারে শ্রম শোষনের শিকার হলেও তারা সামাজিক শ্রমে অংশগ্রহনের সুযোগ পাচ্ছে ,এবং কিছুটা পরিমানে হলেও নারী এখানে অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি পাচ্ছে । স্বাধীনতার হাওয়া তাদের গায়ে লাগতে শুরু করেছে । তাদেরকে হয়ত আর কোনদিন মহলের ভেতর বন্দী করা সম্ভব হবেনা এবং তাদের অনুসরনে দেশব্যাপী নারী মুক্তির জোয়ার উঠা অসম্ভব কিছু নয় ; যদি নারীকে প্যাকেটে পোরার যে ষড়যন্ত্র চলছে সেটাকে নস্যাৎ করে দেয়া যায় ।

প্রশ্নটি ছিল সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতার অবস্থান কেন ? এই প্রশ্নের জবাবে ইতিহাসের একটি ঘটনার কথা বলতে গিয়েই এতো আলোচনা । এখন এই প্রশ্নের নির্মোহ , তাত্ত্বিক ও পুরো ইতিহাস ভিত্তিক আলোচনা করতে গিয়ে দেখতে পাওয়া যায় , আদিম সমাজে যখন অজাচার নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে , দলগত যৌনাচার ও দলগত বিয়ে বন্ধ হয়ে ; জুড়ি বিয়ের ( যে বিয়ে, নর-নারীর পারস্পরিক সম্মতিতে অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু তাদেরকে সমাজের নিকট কোন ধরনের দাসখত দিতে হয় না ) প্রবর্তন হয়েছে, মানুষের হাতিয়ারগুলো আরো উন্নত হয়েছে ,মানুষের দুটি হাত পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রনে চলে এসেছে , মানুষ প্রকৃতিকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রন করা শুরু করেছে ,পশুপালন আরম্ভ হয়েছে ,কৃষিকাজ শুরু হয়েছে ; খাবার, প্রয়োজন মিটে যাবার পরও উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে , সম্পদ পরিনত হচ্ছে সম্পত্তিতে এবং প্রয়োজন পড়ছে সম্পত্তির উত্তরাধিকার তৈরীর । গর্ভনিয়ন্ত্রনের কোন ব্যাবস্থা না থাকার ফলে নারীরা বাধ্য হচ্ছে বছরের পর বছর সন্তান জন্ম দিতে ; এর ফলে অধিকাংশ সময় তাকে কাটাতে হচ্ছে ঘরের বিভিন্ন ধরনের কাজ করে,আর এভাবে বাহিরের কাজের জন্য শারীরিক – মানসিকভাবে বাহিরের কাজের জন্য অক্ষম হয়ে পড়ছে । জুড়ি বিয়ের প্রবর্তন হয়ে যাওয়ার ফলে সহজেই সন্তানের পিতা চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে যার ফলে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ যে ভিত্তিটির উপর টিকে ছিল তা আর থাকছেনা ।

এমন অবস্থায় পুরুষ হয়ে যাচ্ছে সমস্ত উতপাদনের উপায়ের মালিক , পুরো অর্থনীতির মূল চাবি কাঠি চলে আসছে তার হাতের মুঠোয় । এবং মেয়েরা সামাজিক শ্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে , অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের গন্ডীর বাইরে চলে আসছে । পুরুষের মধ্যে চলে আসছে ক্ষমতার দাপট এবং সে তার উত্তারিধাকারকে পুরোপুরি পরিশুদ্ধ করার জন্য ; জুড়ি বিয়েকে ঠেলে দিতে লাগল একবিবাহ প্রথার দিকে । এবং নারীর সতীত্ব রক্ষার জন্য তৈরি হতে লাগল নিয়মের বেড়াজাল । নারী পরিনত হতে শুরু করল পুরুষের যৌনদাসী এবং তার বিশুদ্ধ উত্তারাধিকার তৈরীর যন্ত্র মাত্রে ।

এই মূল ঘটনাকে কেন্দ্র করে , কালপ্রিক্রমায় ,বিভিন্ন কার্যকারন সূত্রে এবং শিল্প , সাহিত্য ,বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতকে নারীর ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে ব্যাবহার করে সমাজে ভয়ঙ্কর রুপে আবির্ভূত হল – পুরুষতন্ত্র । সুতরাং নারীর , সামাজিক শ্রম থেকে বেরিয়ে আসাকেই পুরুষতন্ত্রের আবির্ভাবের মূল কারন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় । এটি মূল কারন হলেও বহুদিনের বহুরকম চর্চার ফলে , এবং আমাদের সমাজে বড় ধরনের কোন পরিবর্তন না ঘটার কারনে সমাজ , পুরুষতান্ত্রিক সংস্কারের বাহুপাশে এমন ভাবে বদ্ধ হয়ে গিয়েছে যে , কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছু নারীদের ; সামাজিক শ্রমে অংশগ্রহন নিশ্চিত এবং এর ফলে অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কবল থেকে সে পুরোপুরি বের হতে পারছেনা । কিন্তু পুরোপুরি বের হতে না পারলেও , শুধুমাত্র ঘর –সংসারের কাজে ব্যাস্ত থাকা মেয়েদের তুলনায় অনেক বেশী স্বাধীন তারা । আরেকটা শ্রেনী আছে যাদের ,সামাজিক শ্রমে অংশগ্রহনতো দূরের কথা ঘর-সংসার এবং সন্তান পালনের কাজও পরিচারিকার উপর চাপিয়ে দিয়ে পৌত্তলিকের মত বসে থাকে, এরপরও কিছু কিছু আছে যারা স্তনজোড়া সুডৌল , উন্নত ও টান-টান রাখার উত্তেজনায় সন্তানকে স্তন্য পান করানো থেকেও বিরত থাকে্‌এবং এরাই নিজেদেরকে , পুরুষের চেয়েও স্বাধীন মনে করে । ওথচ এরা পুরুষের যৌন কাজে ব্যাবহৃত সুদৃশ্য ,তুলতুলে যৌন পুতুল ছাড়া আর কিছুই নয় ।

সমাজে পুরুষতান্ত্রিক অবস্থানের ,তিনটি কারন চিহ্নিত করা যায়; প্রথমতঃ সামাজিক শ্রমে মেয়েদের বিরত থাকা, দ্বিতীয়তঃ বহু পুরাতন জীর্ণ সংস্কার, তৃতীয়তঃ আধুনিক ধনতান্ত্রিকতাবাদের , মেয়েদেরকে পন্যে পরিনত করার তীব্র প্রয়াস ।

একটি বিষয় বলে রাখা ভাল ,যৌন প্রনয়-প্রনয়ীরা যদি , পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ,বিয়ে ব্যাতীত একসাথে বসবাস করা শুরু করে এবং মেয়েটির যদি সামাজিক শ্রমে অংশগ্রহন না থাকে এবং এর ফলে যদি মেয়েটিকে অর্থনৈতিকভাবে পুরুষটির উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয় তাহলেও মেয়েটি পরিনত হবে পুরুষের যৌনদাসী ,ঘরের বিভিন্ন কাজের দাসী এবং সন্তান উতপাদনের যন্ত্র মাত্রে ।

আরেকটি বিষয় বর্তমানে যেটি সচরাচর দেখা যাচ্ছে , প্রেমিক-প্রেমিকা ,যারা দুজনেই সামাজিক শ্রমের সাথে যুক্ত এবং অর্থনৈতিক ভাবে মুক্ত ,তারা যদি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই বিয়ে প্রথার নিকট আত্মসমর্পন করে ,তাহলেও সমাজের সংস্কার এসে তাদের উপর এসে ঝাপিয়ে পরবে । এক্ষেত্রে যেটি দেখা যায় ,সামাজিক শ্রম থেকে ঘরে ফেরার পর মেয়েটিকেই সংসারের সমস্ত কাজ সামলাতে হয় , স্বামীর পদসেবাও করতে হয় এবং প্রেমিক এবং স্বামী পুরুষটি দ্বারা মাঝে মাঝে ধর্ষিতও হতে হয় ;যখন যৌন সংসর্গে মেয়েটির একান্ত অনিচ্ছা থাকে ।
প্রেমিক-প্রেমিকা দুজনেরই সামাজিক শ্রমে অংশগ্রহন,এর ফলে অর্থনৈতিক মুক্তি ; বিয়ে বহির্ভূত একত্রে বসবাস এবং এর পরেও যদি নারী , ধন্তান্ত্রিকতাবাদের প্রচার-প্রচারনার ফলে নিজেকে পন্য ভাবে এবং নিজেকে সুদৃশ্য মোড়কে ঢেকে রাখতে চায় তাহলেও সমস্যা থেকেই যাবে । যদিও এরকম হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কম ।

সুতরাং শুভ কাজের অশুভ পরিনতি রুখতে হলে ,সামাজিক শ্রমে নারীর অংশগ্রহন নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রেমিক-প্রেমিকাকে সমাজের একবিবাহ প্রথার বাইরে গিয়ে যৌন প্রনয় ,ভালবাসা ও বন্ধুত্বের উপর ভিত্তি করে একত্র বসবাস শুরু করতে হবে ;নারীর, নিজেকে ভাবতে হবে একজন পরিপূর্ন মানুষ ।

এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই এসে যায় ,যদি নারী-পুরুষ দুজনেই সামাজিক শ্রমে নিযুক্ত থাকে তাহলে ,তাহলে সংসারের সমস্ত কাজ এবং সন্তানের প্রতিপালন করবে কে ?
নাকি এখন যেমন হচ্ছে নারী সামলাবে ঘর বাহির দুটোই ? নিশ্চিত ভাবেই নয় । ঘরের শ্রমকে পরিনত করতে হবে সামাজিক শ্রমে , এবং যতক্ষন পর্যন্ত না ঘরের শ্রমকে সামাজিক শ্রমে রুপান্তরিত না করা যাচ্ছে ততক্ষন নারী- পুরুষ দুজনকেই ভাগা-ভাগি করে সামলাবে সংসারের সমস্ত কাজ । এর বাইরেও আরো কিছু কাজ আছে ,যেগুলো একান্ত ভাবেই পুরুষের পক্ষে সম্ভব নয় , যেগুলো প্রকৃতিই নারীর জন্য নির্ধারন করে দিয়েছে ,যেমন গর্ভধারন করা, সন্তানকে স্তন্য পান করানো ,এগুলোর জন্য নারী পাবে বৃত্তিমুলক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ।

এরফলেই নারী মুক্তি পাবে, পুরুষঅতান্ত্রিক সমাজের সকল অত্যাচার থেকে এবং যৌনপ্রনয়ের বিষয়টা হবে নর-নারীর একান্ত ব্যাক্তিগত বিষয়ে ।এবং আসলেই যৌন প্রনয় মানুষের একান্ত ব্যাক্তিগত বিষয় । সভ্যসমাজে নারী-পুরুষের একান্ত ব্যাক্তিগত বিষয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ভাল দেখায় কি? । যৌনপ্রনয় যতদিন থাকবে ততদিনই নর-নারী একত্রে বসবাস করবে ,কোন কারনে যদি এদের প্রনয় সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় ,তখন তারা সমস্ত ধরনের সামাজিক , অর্থনৈতিক প্রভাবের আওতা মুক্ত হয়ে আলাদা বসবাস শুরু করতে পারবে ।

নারীকে পুরোপুরি মুক্ত করতে হলে ,অর্থনৈতিক মুক্তি যেমন দরকার তেমনি দরকার যৌন মুক্তি । অবশ্য অর্থনৈতিক মুক্তির পথ ধরেই আসবে যৌন মুক্তি । নর-নারীর মাঝে যৌনসংসর্গ হবে একমাত্র যৌন প্রনয় কে কেন্দ্র করে । কোন ধরনের সামাজিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাকে কেন্দ্র করে নয় । যৌন সংসর্গে সামাজিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারনে হয় নারীর প্রতি নীরব ধর্ষন এবং পুরুষের লাম্পট্য ।

তারমানে এই না যে ,তাতে করে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মাঝখানে একে অপরের উপর সামাজিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক সংসর্গ থাকবেনা । বিষয়টা হবে এখন যেমন হয় ঠিক তার উল্টো ।যৌন প্রনয়কে কেন্দ্র করে তৈরী হবে সামাজিক প্রভাব , অর্থনৈতিক সংসর্গ ও অন্যান্য পারস্পারিক নির্ভরশীলতা ও দায়িত্ববোধ । এজন্য নারী এবং পুরুষ , উভয়কে হতে হবে অর্থনৈতিক ,সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীন ।