ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও সমুদ্র কন্যা নারিকেল জিঞ্জিরা ঘুরে এলাম কিছুদিন আগে । অনেক দিন থেকেই স্বপ্ন দেখছিলাম সমুদ্রে যাব ; সমুদ্রে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে ওর অংশ হব – অতি বিরাটাকার জিনিসের খুব ক্ষুদ্রাকৃতি একটি অংশ । হঠাৎ করেই স্বপ্নটি পূরণ হয়ে গেলো , রাত্রি সাড়ে নটার সময় বাসে চড়ে ; সকাল দশটার মধ্যে কক্সবাজার ।

গাড়িতে সমস্ত পথ জুড়েই আমার বুকের মধ্যে অদ্ভুত ধরনের একটি উত্তেজনা খেলা করছিলো । সাগর সৈকতের যে সমস্ত ছবি আমার হৃদয়ের মধ্যে কল্পনার রঙে আঁকা ছিল সেগুলো স্পষ্ট হতে হতে , হঠাৎ করেই আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল ; যেন আমার সামনে একটি জাজ্বল্যমান বস্তু রাখা আছে , স্পর্শ করতে গেলেই হাওয়ায় উবে যাচ্ছে । মনের এই লুকোচুরি খেলায় ক্লান্ত হয়ে , কখন যেন নিজের অজানিতেই ঘুমিয়ে পড়ি । কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম তার সঠিক হিসাব রাখতে পারিনি – হঠাৎ করেই যেন ঘুমের মধ্যে মনে হল , সমুদ্রের তীরে চলে এসেছি । এই ভাবনা মনের মধ্যে উদয় হতেই , আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠি । জানালার দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই , কেবলমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে ।

অস্ফুট ভোরের আলোতে সামনের দিকে তাকিয়ে আমার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটি একটি শুন্যতার খোঁজ করতে থাকে –বদলে দেখতে পায় গাছ-গাছালি ও ছোট ছোট টিলার সমারোহ ; আশাহত হয়ে চোখদুটি পাশে বসা যাত্রীটির দিকে ঘুরে যায় । আমি যে লোকটিকে আশা করতে ছিলাম এ ব্যাক্তি সে নয় , এ অন্য একজন । ঢাকা থেকে যার সাথে পাশা-পাশি বসে রওনা হয়েছিলাম , সে নিশ্চয় মাঝখানে কোথাও নেমে গিয়ে থাকবে ; আর তার বদলে আমার পাশে বসেছে অন্য একজন । পূর্বের লোকটির সাথে হালকা কথাবার্তা বলার কিছুটা আন্তরিকতা জন্মেছিলো দুজনের মধ্যেই কিন্তু এই নতুন লোকটিকে কিছু জিজ্ঞেস করতে মনের মধ্যে একটা সংকোচ বোধ হচ্ছিল –আরেকটি বিষয় হচ্ছে আমি এই নতুন লোকটিকে কোনমতেই এখানে আশা করিনি । লোকটি বসেছিল ম্লান মুখে এবং একটি গাম্ভীর্যের ভাব বর্তমান ছিল , সাগরের কাছে যাওয়ার সময় যে কেউ ম্লান মুখে বসে থাকতে পারে , ভেবে অবাক হলাম । সাহসে ভর করে ফিসফিস করে লোকটিকে জিজ্ঞেস করি, সাগরের তীরে পৌছুতে আর কতদূর ? লোকটি তার মুখের মধ্যে অনেক কষ্টে, হাসির একটি সূক্ষ রেখা ফুটিয়ে তোলে বলল , আর ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে আমরা পৌঁছে যেতে পারব । শুনে আমি দারুনভাবে আশাহত হলাম , মনের উত্তেজনার টনটনে ভাবটি স্তিমিত হয়ে এলো ।

লোকটিকে দেখার পরপরই একটি প্রশ্ন আমার মনের মধ্যে ধীরে ধীরে খাড়া হচ্ছিল , সমুদ্রপাড়ে যাওয়ার সময় লোকটির মুখে বিষাদের ছায়া কেন ?এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রেরণাতেই , আমি লোকটির সাথে আলাপ জমিয়ে তুলি । কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি , তার জন্ম সাগর পাড়ে- শৈশব ,কৈশর ,বাল্য কেটেছে সমুদ্র পাড়ে খেলে-বেড়িয়ে ,যৌবনের কিছুটা উদ্দামতা গিয়েছে সাগরে উচ্ছলতার সাথে – সমুদ্রের করালতা , ভীষণতা , ভয়ংকরতা ,ঢেউয়ের গর্জন , উজ্জ্বলতা , উচ্ছলতা ,শান্ত সমাহিত রূপের সাথে তার প্রত্যক্ষ পরিচয় । বহুল ব্যবহৃত জামার সাথে আমরা যেমনি অভ্যস্ত , সমুদ্রের সাথে লোকটিও তেমনি । সমুদ্র নামটি শুনলেই আমার প্রাণে যেমন দোলা দেয় , লোকটির প্রাণে তেমন দেয়না ।
লোকটি চট্রগ্রামে ছোটখাটো একটা কোম্পানীতে চাকুরী করে , বাড়িতে- সমুদ্র পাড়ে যাচ্ছে তার অসুস্থ মাকে দেখতে ; তাই তার মুখে বিষাদের ছায়া । আর আমি সাগর পাড়ে যাচ্ছি –আমার কল্পনার ,স্বপ্নের গাঢ় রঙে রঞ্জিত বিরাট , বিশাল ,উজ্জ্বল, উচ্ছল সমুদ্র দেখতে ,তার অহংকারের গর্জন শুনতে , তার কাছে আমার সমস্ত হীনতা ,দীনতা , করুনাকে সম্পূর্ন রুপে বিসর্জন দিতে । তার বিশাল সত্ত্বার মাঝখানে নিজের ক্ষুদ্র সত্ত্বাকে হাড়িয়ে ফেলতে , সকল ধূসর সংকীর্ণতাকে সাগরের নীল জলে বিসর্জন দিয়ে মুক্ত হতে ,স্বাধীনতার আস্বাদ পেতে । তাই আমার মুখে , মনে হৃদয়ে ,শরীরে , রক্তে উদ্দামতার বান বইছে ।

লোকটির সাথে কথাবার্তা থামিয়ে ,আবার গাছপালা হীন শূন্যতা দেখার আশায় উদগ্রীব হলাম । কিন্তু বার বার শূন্যতা দেখতে না পেয়ে হতাশ হতে লাগলাম । স্বভাবতই আমরা শূন্যতা দেখতে পেয়ে হতাশ হই আর এ পরস্থিতিতে আমি শূন্যতা দেখতে না পেয়ে হতাশ হচ্ছি । বাঘ যেমন হরিণ শিকারের সময় লোলুপ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে চলতে থাকে আমিও তেমনি বিশাল শূন্যতার খোঁজে বুভুক্ষু দৃষ্টি মেলে রয়েছি-বুকের শুন্যতা , সাগরের বিশাল শুন্যতা দিয়ে ভরিয়ে তুলবো বলে । আর বাসটি আমাদের সকল যাত্রিকে তার পেটের মধ্যে পুরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চলছে ।

আমার ধৈর্য যখনতার জন্য নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে চলেছে তখন হঠাৎ করেই সামান্য একটু শূন্যতার আভাস পেলাম – মরুভুমির মধ্যে তৃষ্ণার্ত পাখি যেন একটু জল পেল । সেই সামান্য শূন্যতা দেখতে দেখতে বিশালাকার রূপ নিল – হ্যাঁ আমরা সমুদ্র পাড়ে এসে পৌঁছেছি । ব্যাগটা ঝটপট কাঁধে ফেলে বাস থেকে নেমে এলাম । রাস্তায় নামার সাথে সাথেই টের পেলাম , ছুঁচোরা যেন সব একসাথে পেটের ভেতরে বুক ডন মারতে লেগেছে । আমি সমুদ্র পাড়ে নেমেই সমুদ্রের কথা ভুলে গেলাম –চোখের সামনে ভাসতে লাগলো পরোটা আর ডিম ভাজি । সমুদ্রের দিকে একবারের জন্যেও ফিরে না তাকিয়ে রিক্সায় উঠে সোজা হোটেলে ।

ফ্রেশ হয়ে , নাস্তা করে , একটি সিগারেট ধরিয়ে , ভ্রমনে ক্লান্ত দেহ-মনকে ; নরম তুলতুলে বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিলাম । দেহ-মনে একটু শক্তি পাওয়ার সাথে সাথেই কল্পনার সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে আমার হৃদপিন্ডটাকে যেন নাড়িয়ে দিয়ে গেল । রাস্তায় বের হলাম ,কয়েকটি রিক্সা আমার সামনে এসে ভিড়ল । সমুদ্রের কাছে কেউ আমাকে টেনে নিয়ে যাবে – এটা ভাবতে ভালো লাগলো না । কিন্তু কি যেন আমার সামনের পা দুটোকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল, আর কে যেন আমাকে পিছন দিক থেকে ধাক্কাতে শুরু করে ।

একা ,ক্ষুদ্র , নিঃসঙ্গ আমি , বিশাল সমুদ্রের সামনে এসে দাড়ালাম । আমি মর্মাহত হলাম ,আসল সমুদ্র আমার প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যার্থ হল । আমার কল্পনার সমুদ্রের গায়ের রঙ গাঢ় নীল আর এর গায়ে ঘোলা জলের খেলা । কল্পনার সমুদ্র আমার কাছে পূর্ণ যৌবনবতী , সজল চোখ ,ভরা গাল , পুষ্ট ঠোঁটের তীব্র আবেদনময়ী কোন এক নারী । আর এ যেন খানিকটা বুড়িয়ে গেছে মেকী সভ্যতার তীব্র দহনে । চুল গুলো পেকে সাদা শনের মত , চোখ দুটি অস্পষ্ট ও ঘোলা , গাল বসে গেছে , কপালে বলি রেখা , ঠোঁট দুটো শুকনো বিবর্ণ – নিচেরটা একটু ঝুলে পড়েছে ; সমস্ত শরীর মেদবহুল থলথলে – বালুকা বেলায় শুয়ে রয়েছে , মাঝে মাঝে আড়মোড়া ভাঙ্গছে শুধু । ওর দ্বারা আমি আকর্ষিত হচ্ছিনা , হতে পারছিনা । নিতান্ত অনিচ্ছায় ওর শরীরের একটু শীতলতা পেতে সামনের দিকে এগুতে থাকি । অনেক নারী- পুরুষ ওর থলথলে শরীরে খেলা করছে – সকলের মুখেই নতুন প্রাণের জোয়ার । বয়স্ক লোকরাও তাদের কৈশরে যেমন বাড়ীর পাশের নদীর জলে খেলা করত তেমনি খেলায় মেতে উঠেছে । তরুণীরা হাঁটু জলে নেমে , ঢেউ এলে বসে পড়ে ; তাদের শরীর ও মনকে একটুখানি আলিঙ্গন করতে দিচ্ছে । আলিঙ্গনের পুলক তাদের বুকের মধ্যেই এমন মৃদু স্বরে গর্জন করছে যে , তা বাইরে বের হতে পারছেনা ; পাল তোলা নৌকার মত ভাসতে পারছেনা । আর সমুদ্রের কাছে এসেও এরা নিজেদেরকে অবারিত করে দিতে পারছেনা কারন এখানে এরা একা আসেনি ,সমাজটাকেও বয়ে নিয়ে এসেছে সাথে বা সমাজ এদের পিছু ছাড়েনি , এখানে এসেও ফেউ এর মত লেগে রয়েছে । সমুদ্রের কাছে এসেও তারা কি আচ্ছন্নই থেকে যাবে পারবেনা খোলস ভাঙ্গতে ? আর বয়স্ক নারীরা শুধু পায়ের পাতা ডোবে এমন জায়গায় মৃদু সঞ্চরণশীল, এরা সমুদ্রের দিকে এমন উদাসীনতায় তাকিয়ে , যেন তাদের বিগত যৌবনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে । তাদের যৌবনকে যেমন আর ফিরে পাবেনা , সুদূর নীলিমায় হারিয়ে গেছে , সমুদ্রও তাদের কাছে তেমনি । এখানে প্রানের সমস্ত স্ফূর্তি সামগ্রিকতায় ফিরে পেয়েছে ,শুধু তরুণেরা । ওরা চরম উদ্দামতার পরম পুলকে বিচরণ করছে , প্রায় গলা সমান পানিতে – চিৎকারে ,শীৎকারে আকাশ–বাতাস কে ভরিয়ে দিচ্ছে । সমুদ্রের গর্জন কে ছাপিয়ে , তাদের সম্মিলিত আনন্দধ্বনি শোনা যাচ্ছে । সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পরছে তাদের উপরে , আর তারা আছড়ে পরছে ঢেউ এর উপরে । ঢেউ গুলো কখনো সামনে কখনো কিছুটা পিছনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে । ছেলে গুলো পুনরায় বিশাল বিশাল ঢেউ আসার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে , ঝাপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ।

সমুদ্র যেন ছেলে –মেয়ে , তরুন –বয়স্কদের জন্য তাদের আপন সীমানা চিহ্নিত করে দিয়েছে , এবং শুধুমাত্র ছেলেদের জন্যই , মাঝে মাঝে এই সীমা অতিক্রম করার অনুমতি দিচ্ছে । কিন্তু মেয়েদের জন্য রক্ষিত সীমাটা এমন ভাবে আটকে রেখেছে যে , এক পা সামনে বাড়াবার উপায় নেই ।

আমি ধীরে সুস্থে , এই প্রথমবারের মত সমুদ্রের নোনা পানিতে পা ডোবালাম । আলাদা কোন অনুভূতি টের পেলাম না , মনে হল আমাদের বাড়ীর পাশের ছোট নদীর জলে পা ডুবিয়েছি ; আমি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি । স্বল্প সময়ের মধ্যে মেয়েদের জন্য রক্ষিত সীমানা অতিক্রম করে ফেলি । সবিস্ময়ে খেয়াল করি একটি মেয়ে তার জন্য রক্ষিত সীমানাটা অতিক্রম করে ফেলেছে ! যদিও ছেলেদের থেকে একটু পিছনের দিকেই রয়েছে । মেয়েটির পরনে কালো টি- শার্ট ও হালকা নীল রঙের জিন্সের প্যান্ট । খোলা চুল তার ধবধবে সাদা গাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে । পানিতে ভেজা বলে সমুদ্রের বাতাস তার ঘনকালো চুলগুলোকে উড়াতে ব্যার্থ হচ্ছে । পানির ফোটা টপ টপ করে পড়ে তার পিঠ বেয়ে নেমে যাচ্ছে । পানি লাগার ফলে তার কালো টি-শার্টটি তার শুভ্র , লাবন্যময় দেহগাত্রের সাথে জাপটে লেগে আছে । এতে করে তার যৌবনের ভাঁজ গুলো যারপরনাই ফুটে উঠেছে । মেয়েটি যেন তার অঙ্গের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাজগুলোকে বিশাল সমুদ্রের কাছে অবারিত করে দিয়েছে ।

মেয়েটি ধীরে ধীরে আরো সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে ,আর মেয়েটির চুল থেকে টপ টপ করে ফোটা ফোটা জল ঝরে পড়ছে যেন জীর্ণ সমাজের ভাঙ্গাচোড়া সংস্কারগুলো খসে খসে পড়ছে । কিন্তু কোন এক ইলাস্টিকের সুতা যেন তাকে পেছন থেকে টেনে ধরে রেখেছে , সামনের দিকে এগোতে গেলেই একটা টান অনুভব করছে পিছন দিক থেকে , টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছে , পিছনের দিকে সরে আসছে । আমি তার পিছনে দাঁড়িয়ে তাকে ও তার টানাটানি খেলা দেখতে থাকি । আমার ভালো লাগে , তারপরেও আমি ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি এবং খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে মেয়েটিকে অতিক্রম করে ফেলি ।মেয়েটি শত চেষ্টা করেও আর সামনে এগুতে পারলনা ।আপ্রাণ চেষ্টায় একটি ব্যার্থতা দেখলাম । অক্টোপাস যেন তার পা দুটিকে জড়িয়ে ধরেছে , তীক্ষ্ণ দাঁতের হাঙ্গর বিশাল হা-করা মুখ নিয়ে তার সামনে ভেসে রয়েছে । সমুদ্রের চেয়ে এই মেয়েটিকে আমার অনেক বেশী মোহনীয় মনে হতে লাগলো । কেউ যদি আমাকে ঐ মুহূর্তে প্রশ্ন করতো , তুমি কার কাছে নিজেকে সমর্পন করতে চাও ; সমুদ্রের নিকট না ঐ মেয়েটির নিকট ? আমি নির্দ্বিধায় উত্তর দিতাম , ঐ মেয়েটির নিকট ।

ঐ মুহুর্তে মেয়েটির কাছে নিজেকে সমর্পণ করার কোন উপায় নেই , অগত্যা আমি সমুদ্রের নিকটে নিজেকে মিশিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম , আর সকলের মত আমিও বিশাল বিশাল ঢেউয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলাম । ঢেউ গুলো আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো , শুধু আমার শরীরটাকেই ভাসাতে পারল মনকে নয় ।

সমুদ্রের কাছে নিজেকে দিতে পারলাম না পরিণত হতে পারলাম না তার অংশে । একটি তীব্র আক্ষেপ আমার মাথার মধ্যে বেয়ারিং এর মত ভন ভন করে ঘুরতে লাগলো । সমুদ্রের কাছ থেকে আমি আনন্দ পেলাম না , আমি ঊঠে এলাম বেলাভূমিতে । কয়েকটি ছোট ছোট ছেলে মেয়ে আমাকে ঘিরে ধরল – কেউ খালি হাতে পয়সা চায় , কেউ আবার ফ্লাস্ক হাতে চা-কফি বিক্রি করতে চায় , দুই-তিনজন দল বেধে এসেছে ;তাদের বেসুরে গলায় গান শুনিয়ে ও বুক-পাছা দুলিয় নাচ দেখিয়ে টাকা আদায় করতে । এদের সকলের মুখের মধ্যে দীনতা-হীনতা ও ভিক্ষাবৃত্তির ছাপ সুস্পষ্ট । নিজের দীনতাকে সমুদ্রের কাছে বিসর্জন দিতে এসে , হীনতার খপ্পরে পড়ে গেলাম ! শিশুরা থাকবে উজ্জ্বল ,উচ্ছ্বল, ঝলমলে ,সুন্দর , স্বর্গীয় আভা থাকবে তাদের মুখের মধ্যে কিন্তু এমন কুশ্রীতায় তাদের মুখমন্ডল কেন ভরে উঠবে , তাদের দেখলে কেন কোলে তুলে নিতে ইচ্ছে হবেনা , আদর করার সাধ জাগবেনা , তুলতুলে গালে চুমু দিতে বাসনা হবেনা ? এদের দেখামাত্র কেন দুর-দুর করে তাড়িয়ে দিতে হয় ? তাদের শরীর থেকে কেন দুর্গন্ধ আসে , শরীরের হাড়-চামড়া পরস্পরকে লাটাইয়ে প্যাঁচানো সুতার মত জড়িয়ে থাকে থ , চুলগুলো কেন থাকবে জট পাকানো , কেন হবেনা মোলায়েম ? এটা বিধাতার কোন ধরনের পরিহাস !

পরের দিন সকাল ছয়টার সময় ঘুম থেকে উঠে , বাসে চড়ে টেকনাফের পথে । যাওয়ার পথে বাসটি ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আমার সকল সৌন্দর্য রস বের করে ,কালো পিচের রাস্তায় ঢেলে দিতে থাকে । রাস্তার একপাশে ছোট ছোট টিলা পাহাড় –সবুজ সুন্দর বনানী , অপর পাশে লবন চাষ ; কিছুই উপভোগ করতে পারলাম না । মাথার ভেতরে মস্তিষ্কের কোষগুলোকে উলু পোকায় কুর কুর খাচ্ছিল । পাশে বসা ভদ্রলোকটি আমাকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতেই , খেকিয়ে উঠলাম । বাসটি অবশেষে নাফ নদীর তীরে এসে থামল- আমরা বাসের যাত্রীরা সদলবলে বাস থেকে নেমে জাহাজে উঠলাম ।

জাহাজটি পানি কেটে কেটে সামনের দিকে এগুচ্ছে , চলছে সেন্টমার্টিনের দিকে । জাহাজটা কিছু দূর এগোতেই দেখা গেল , দুই পাশে শত শত গাংচিল উড়ে উড়ে আসছে । জাহাজের যাত্রীদের থেকে নিরাপদ দুরত্বে ওদের অবস্থান । গাঙ্গচিল গুলো হরেক রকম শব্দ তুলছে আর বিভিন্ন ভঙ্গিমায় উড়ে উড়ে চলছে ।এমন অপরূপ সুন্দর দৃশ্য এর পূর্বে দেখেছি বলে মনে হয় না । ওদেরকে যদি ছুঁয়ে দেখতে পেতাম , সুন্দর মসৃন পালকের উপর হাত বুলাতে পারতাম! কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম – ওরা আসছে খাবারের লোভে । জাহাজের যাত্রীরা ওদের দিকে চিপস , বিস্কিট , চানাচুর ছুড়ে দিচ্ছে , আর ওরা অসাধারণ দক্ষতায় মুখ দিয়ে ক্যাচ লুফে নিচ্ছে , কোন একটি পাখি ক্যাচ মিস করলেই অপর একটি সাথে সাথে পানির উপর থেকে তা তুলে নিচ্ছে । সভ্যতার ছোঁয়া যেন , এদের মনে এসেও লেগেছে । এরা সম্ভবত আর আগের মত কাঁচা মাছে তৃপ্তি পায় না , ফাস্ট ফুডে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে ;পুরোপুরি শহুরে বিলাসী মানুষের মত ।

হঠাৎ করেই যেন কিছুটা দূরে নীল জলের আভাস পেলাম । ওখানে সমুদ্র যেন কিছুটা আমার কল্পনার সমুদ্রের মত – আমি প্রস্তুত হতে লাগলামনিজেকে দেওয়ার জন্যে । কিন্তু আমি তো এখন জাহাজে , এখান থেকে ওকে ধরা যাবেনা , ছোয়া যাবেনা , হারানো যাবেনা নিজেকে । এমন সময় তাকে নিজের মত করে পেলাম যখন সে আমার ধরআ- ছোঁয়ার বাইরে । জাহাজটি ধীরে ধীরে , নীল জলের ভিতরে ঢুকে গেল । আমি আমার দৃষ্টির সীমানাকে প্রসারিত করে , সামনের দিকে অবারিত করে দিলাম । একটু একটু ভালো লাগতে শুরু করল , কিছুটা যেন আপন করে পেলাম ।

জাহাজটি অবশেষে সেন্ট-মার্টিনে নোঙ্গর করল –চারদিকে ঘন নীল জল শান্ত সমাহিত , মৃত প্রবালগুলো সাগরকন্যার পায়ের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে । জাহাজ থেকে দ্বীপে নেমে একটি হোটেলে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে , নীল জলের কাছেই ফিরে আসি ; হাটু পানিতে পানি ঠেলে হাটা-চলা করতে থাকি । এখানকার জল বড়ই নিস্তরঙ্গ ,খুব শান্ত সমাহিত । আমি যেন বিশাল বিশাল ঘন নীল জলের ঢেউ চেয়েছিলাম । নিজেকে পারলাম দিতে , ব্যার্থ হলাম । সমুদ্র যেমন দ্বীপটিকে ঘিরে রয়েছে , একটি খারাপ লাগা বোধ তেমনি আমাকে ঘিরে রইল । কিছুক্ষণ নীরবে কাটিয়ে দ্বীপের বেলাভূমিতে ফিরে এলাম । বিকেলে আবার জাহাজে চেপে তারপর বাসের তীব্র ঝাঁকুনি হজম করতে করতে হোটেলে ।

বড়ই ক্লান্ত ছিলাম তাই সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ খানিকটা দেরী হয়ে গেল । ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে রাস্তায় বেরোলাম , উদ্দেশ্য হিমছড়ি দেখতে যাব । একটি অটোরিক্সা ভাড়া করে , ড্রাইভারের পাশে বসে চলতে থাকি । কিছুক্ষণ সময়ের মধ্যে অটোরিক্সাটি হোটেলগুলোকে পিছনে ফেলে সামনের দিকে চলে এলো । পিচ ঢালা কালো রাস্তাটি সাগরের পাড় ঘেঁষে বয়ে চলেছে । আমি অলক্ষিতে সমুদ্রের দিকে তাকালাম – এখানে সমুদ্র যেন আমার কল্পনার রঙে সেজে , নিজকে পুরোপুরি ভাবে অবারিত , মুক্ত করে দিয়েছে । তার বিশাল বিশাল ঢেউ গুলো গর্জন করতে করতে আমাকে ডেকে ডেকে বলছে , আলিঙ্গন কর আমাকে , জড়িয়ে ধর , আমাকে তোমার প্রাণে , শরীরে গ্রহণ কর । সমুদ্রের ডাক আমার হৃদয় বীনার তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে আবেশিত সুর ঘনিয়ে তুললো । আমি স্থির থাকতে পারলাম না , সমুদ্র আমাকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না । ইচ্ছে হল দৌড়ে গিয়ে চুমোয় চুমোয় ওর সমস্ত দেহটা ভরিয়ে দেই । ঐ মুহূর্তে তা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না কিন্তু আমি চুপচাপ বসে থাকতেও পারছিলাম না । আমার মনে হল এই মুহূর্তে আমাকে কিছু একটা করতে হবে , না করতে পারলে আমি শান্তি পাবনা । ড্রাইভারকে অনুরোধ করতেই , পাশে সরে গেলো , হ্যান্ডেলটি চলে এলো আমার হাতে । আমার নিয়ন্ত্রনে সমুদ্রের ধার দিয়ে চলতে লাগলো অটোরিক্সাটি । প্রিয়ার সামনে কিছু একটা করে দেখাতে পেরে আমি শান্তি পেলাম । অদ্ভুত পুলকানন্দে আমার শরীর মন ভরে উঠলো ।

কখন যে হিমছড়ি পাহাড়ের কাছে চলে এসেছি টেরই পেলাম না – অটো রিক্সা থেকে নেমে পড়লাম আস্তে করে । সিড়ি বেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠতে লাগলাম উপরে । প্রচন্ড গরমে , ঘামে শার্ট ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে ,যেন এই মাত্র সমুদ্রের জলে ডুব মেরে এসেছি । উপরে উঠেই দেখি একজন মধ্য বয়স্ক লোক ডাব বিক্রি করছে , একটি ডাব কাটতে বলে , পাশের মাচালের উপর বসে পড়ি । ডাবের জল খেয়ে গরম শরীরে একটু ঠান্ডা আমেজ অনুভব করি , একটু একটু করে হারানো শক্তি ফিরে পেতে শুরু করি । আস্তে আস্তে মাচাল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে , সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি মেলে দেই । তাকিয়ে দেখি দিগন্ত প্রসারিত নীল জল , দৃষ্টি সীমানার কাছাকাছি কুয়াশার মত বোধ হচ্ছিল । পৃথিবীর তিন ভাগ জল যেন আমি দৃষ্টির সম্মুখে দেখতে পাচ্ছিলাম । আমার হৃদয়টা আস্তে আস্তে প্রসারিত হয়ে , নীল সমুদ্রের সাথে মিলে যেতে চাইল ।

হোটেলে ফিরে খাওয়া দাওয়া সেরে , কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম ; নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলাম আজ বিকেলে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পন করবো সমুদ্রের কাছে । বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম সমুদ্রের কাছে , ও আমাকে তীব্র বেগে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে লাগলো । বেলা ভূমি থেকে একদৌড়ে নোনা জলে নেমে পড়লাম , আর কোনদিকে খেয়াল রইলো না ; বিশাল বিশাল ঢেউ আমার উপর আছড়ে পড়তে লাগলো , আমিও গর্জনশীল ঢেউয়ের উপর হুমরি খেয়ে পড়লাম । আমার প্রিয়াকে আমার বুকে পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হলাম , নিজের ক্ষুদ্র সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে দিলাম বৃহতের কাছে – আত্মা যেন মিলিত হল চিদাত্মার সাথে । নিজের নীচতা , ক্ষুদ্রতা , সংকীর্ণতা সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দিতে চাইলাম কিন্তু তারা ডুবতে চায়না , বারবার ভেসে উঠে । আর অনেক ঘষে ঘষেও উঠানো যায় না , মনের সাথেই লেপ্টে থাকতে চায় ।

কিন্তু সমুদ্র , ওর সবকিছু আমাকে দিয়ে দিল , যেমনি করে দেয় আরো অনেককে ,যারা নিতে পারে বা চায় । আমাদের পক্ষ থেকে সমুদ্রকে কিছু দেওয়া অনেক কঠিন । না দিতে পারার বেদনাকে ভুলে , পাওয়ার আনন্দে আমি আত্মহারা হলাম ,আমার শরীর , মন রোমাঞ্চিত হল । আমার বুকের মধ্যে এই যে ভালো লাগা , এ যে মোহ নয় ; এ হল প্রেম – একে অপরের প্রতি দুর্নিবার ভালোবাসা । আমি আস্তে আস্তে বুকের ভেতর থেকে দয়া আর করুনাকে টেনে হিচড়ে বের করে ছুড়ে দিতে লাগলাম , সমুদ্রের বুকে ; ওরা ধীরে ধীরে সমুদ্রের বুকে তলিয়ে যেতে লাগলো । বুকের শুন্য জায়গাটুকু ভরিয়ে তুলতে লাগলাম সমুদ্র থেকে ধার করা নৈর্ব্যত্তিক ভালোবাসা দিয়ে ।