ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

জাপানের ফুকুশিমায় পারমাণবিক চুল্লি বিস্ফোরণের কারণে বিপুল ক্ষতির শিকার হয় সে দেশের মানুষ এবং তার প্রভাব পড়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও। পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাসহ নানাবিধ জটিলতার কারণে এই প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে নানাদিক থেকে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় এবং পারমাণবিক প্ল্যান্ট বন্ধের দাবি ওঠে বিশ্বের অনেক দেশে। গণবিক্ষোভের মুখে জার্মান সরকার ১৭টি নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিপূর্ণভাবে ২০২২ সালের মধ্যে বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। সুইজারল্যান্ডের জ্বালানির শতকরা ৪০ ভাগ বিদ্যুৎ পারমাণবিক প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদিত হওয়া সত্ত্বেও ২০১৯ এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে তাদের এসব কেন্দ্র বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লাটভিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, পর্তুগাল, ইসরায়েল, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং নরওয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরোধিতা করেছে এবং এই ধরনের প্রকল্প না করার ঘোষণা দিয়েছে। সারা পৃথিবীর শতকরা ১৬ ভাগ বিদ্যুৎ যেখানে পারমাণবিক শক্তি থেকে আসে এবং যার শতকরা ৮৫ ভাগ প্ল্যান্ট স্থাপিত আছে শিল্পোন্নত দেশে; সেখানে এই দেশগুলো কেন এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরে আসতে চায়?

বিপরীতে, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বিষয়ে সরকার চুক্তি করেছে রাশিয়ান ফেডারেশনের দ্য স্টেট অ্যাটোমিক এনার্জি করপোরেশনের (রোসাটোম) সঙ্গে। বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান এই চুক্তি সম্পর্কে বলেছেন, ‘পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ জাতির জন্য সম্মানের বিষয়’।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে নবায়ন এবং অনবায়নযোগ্য সম্পদ নিয়ে দেশের এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাগুলো আমলে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক চুল্লির কাঠামোগত সমস্যা, বিস্ফোরণ ফলাফল এবং এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া হিসাব করা দরকার। এমনকি ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যেও পারমাণবিক স্থাপনা বন্ধে সম্প্রতি আন্দোলন হয় এবং এতে সাধারণ জনগণের বিজয় অর্জিত হয়েছে। ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আমেরিকাজুড়ে লাখ লাখ মানুষের প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরুদ্ধে, কেন, সেসব যুক্তি-তর্ক বিবেচনা করা তাই প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যেসব কারণ রয়েছে, সেগুলো হলো-

১. উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বন্যা, আগুন, ভূমিকম্প ও নিছক অবহেলার মতো প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট উভয় ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলা করার প্রস্ত্ততি যা রয়েছে সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। অন্যভাবে বলা যায়, এখন পর্যন্ত প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সামর্থ্য যা আবিষ্কৃত হয়েছে তা উল্লিখিত বিপর্যয়রোধে কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। ২. পারমাণবিক বিদ্যুতের স্বাভাবিক নিরাপত্তা সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের’ প্রতিটি পর্যায়ে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসা, গতানুগতিক নিঃসরণ ও বর্জ্যসমূহ, দুর্ঘটনাক্রমে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া এবং বিপুল পরিমাণে পারমাণবিক বর্জ্য তৈরি হওয়া যা হাজার হাজার বছর ধরে বিপজ্জনক থেকে যায় ও যা সংরক্ষণ করার নিরাপদ কোনো উপায় বিজ্ঞান এখনো খুঁজে পায়নি। ৩. ১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকলে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে Clean Development provision থেকে বাদ দেওয়ার কারণটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ৪. একটি আধুনিক পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে কয়েক হাজার গুণ ক্ষতিকর সিএফসি অর্থাৎ ক্লোরোফ্লোরোকার্বন নিঃসরিত হয় যাকে ‘মনট্রিল প্রটোকলে’ পরিবেশ দূষণের দায়ে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। প্রতিমন্ত্রী যখন বলেন, ‘পরমাণু কেন্দ্র থেকে কার্বন নিঃসরণ হয় না’; সেক্ষেত্রে ধারণা করা যায় বিষয়গুলো সম্পর্কে এই মন্ত্রী অবগত নন।

৫. পরমাণু রিঅ্যাক্টর প্রতি বছর বায়ুমন্ডলে ও পানিতে প্রায় মিলিয়ন কুরি (তেজস্ক্রিয়তার একক) তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ছড়ায়। এসব আইসোটোপের তালিকায় আছে ক্রিপ্টন, জেনন, আর্গনের মতো নিষ্ক্রিয় গ্যাসসমূহ, যেগুলো চর্বিতে দ্রবণীয় এবং রিঅ্যাক্টরের আশপাশে বসবাসকারী কোনো লোক তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে তা তার ফুসফুসের মাধ্যমে প্রজনন অঙ্গসহ দেহের চর্বিযুক্ত টিস্যুতে স্থানান্তরিত হতে পারে। ৬. তেজস্ক্রিয় মৌলগুলো হতে নিঃসরিত গামা রশ্মি ডিম্বাণু ও শুক্রাণুতে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটিয়ে সূচনা করতে পারে বংশানুসৃত রোগের। ৭. ট্রিটিয়াম নামক হাইড্রোজেনের একটি আইসোটোপও আমরা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পাই, যা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় পানি উৎপন্ন করে। এই পানি ত্বক, ফুসফুস এবং পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে লোকজনের দেহে প্রবেশ করে তার ডিএনএ মলিকিউলে ঢুকে যেতে পারে যার পরিণাম বড় ধরনের বিপর্যয়।

৮. নিউক্লিয়ার ফিশনের একটি মানবসৃষ্ট বর্জ্য হলো প্লুটোনিয়াম, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে অথবা বোমা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাশাকির অভিজ্ঞতা এখনো আমাদের মন থেকে মুছে যায়নি। নাগাশাকিতে যে বোমা ফেলা হয়েছিল সে ধরনের একটি বোমা তৈরি করতে ১৮ পাউন্ডের কম প্লুটোনিয়ামই যথেষ্ট। সেখানে ২০০০ সালে এককভাবেই ৬ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড প্লুটোনিয়াম উৎপাদিত হয়েছিল, যা দিয়ে ৩৪ হাজার পারমাণবিক বোমা উৎপাদন করা যায়। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ধ্বংসাত্মক বর্জ্য উৎপাদনে পৃথিবীর শীর্ষে অবস্থান করছে।

৯. রাশিয়ার চেরোনোবিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার থ্রি-মাইল আইল্যান্ড ও সাম্প্রতিক জাপানের ফুকুশিমাসহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের বিষয়ে জনমনে উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় চেরোনোবিলের উদাহরণটি। ২৬ এপ্রিল, ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কিয়েভ শহরের চেরোনোবিলে একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি রিঅ্যাক্টরের একটি বিস্ফোরিত হয় এবং তেজস্ক্রিয় মৌল ছড়িয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের বেশকিছু অঞ্চলে। আজও চেরোনোবিল শহর পরিত্যক্ত। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চেরোনোবিল দুর্ঘটনায় সবকিছু মিলিয়ে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে বন্ধ করতেই লেগেছিল ৪০০ কোটি ডলার। এমনকি চেরনোবিলেরও (১৯৮৬) আগে থেকে বিশেষ করে অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক কো-অপারেশন ও ডেভেলপমেন্টভুক্ত (ওইসিডি) দেশগুলোতে পারমাণবিক শিল্পের বিস্তার হ্রাস পেতে শুরু করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৩ সালের পর একটিও নতুন চুল্লি কেনার আদেশ দেওয়া হয়নি এবং ২৫ বছরে পশ্চিম ইউরোপে একটি চুল্লিরও স্থাপনা সম্পূর্ণ হয়নি। সচেতনভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হওয়ায় এবং ভয়াবহতার বিবেচনায় এ দেশগুলোর সরকার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হয় বন্ধ নয় স্থগিত করার কথা ভাবছেন কিংবা এর পেছনে খরচ কমিয়ে আনছেন এবং তার নতুন কোনো ব্যবহারের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশকে পারমাণবিক বিদ্যুতায়নের ‘অমিত সম্ভাবনার ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করানোর তৎপরতায় ব্যস্ত সরকার।

১০. প্রতিমন্ত্রী হিসাব দিয়েছেন এই বলে যে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুতের তুলনায় এ কেন্দ্রে খরচ হবে এক-তৃতীয়াংশ এবং তেল-গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশ। কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) ২০০১ সালের এক সমীক্ষায় (Nuclear Power in OECD) দেখা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি কিলোওয়াটে যেখানে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ডলারের বেশি সেখানে কয়লাতে পড়ে ১ হাজার ২০০ ডলার এবং কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস প্ল্যান্টে পড়ে ৫০০ ডলার। ২০০৩ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) হিসাব মতে, যদি নতুন জেনারেশনের পরমাণু চুল্লি তৈরি করা যায়, তার খরচ হবে গ্যাস, কয়লা ও বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে দুই থেকে চার গুণ বেশি। শুধু খরচের দিকে হিসাব করলেও এ পরিকল্পনা থেকে সরে আসার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পেট্রোলিয়াম বা কয়লা নয়, এমনকি বায়ু ও জৈব পদার্থের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুতের তুলনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ অনেক চড়া। এছাড়া গ্রিন হাউস উপকরণের নিঃসরণ কমানো বা এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নবায়নযোগ্য শক্তি বা জ্বালানির তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহারের উপযোগিতা কম।

১১.পরমাণু ইঞ্জিনিয়ারিং এজেন্সি ও আইএইএ’র হিসাব অনুযায়ী, ২০০৪ সালে পৃথিবীতে মোট মজুত পরমাণু চুল্লির জ্বালানি ইউরেনিয়ামের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪৪ লাখ টন। প্রতি কেজি ৮০ ডলারের কম দামে আকরিক হিসাবে উদ্ধার করা যাবে ৩৫ লাখ টন। আরো বেশি ইউরেনিয়াম পেতে গেলে খরচ বাড়বে বলে ইউরেনিয়ামের দামও বেড়ে যাবে, আর ইউরেনিয়ামের দাম বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ। জনগণের দৈনন্দিন জীবনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে, লাভের অংক স্ফীত হতে থাকবে উৎপাদনকারী কোম্পানির; যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল উপকরণ, ইউরেনিয়াম। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে কোম্পানির চাপে সেই খরচ তুলতে কিংবা কোম্পানির বাড়তি লাভ তুলে নিতে সরকারকে বাড়াতে হবে বিদ্যুতের দাম।

মানুষের নিরাপত্তাহীনতা, ঘনবসতি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, পরিবেশ, জলবায়ু, আর্থিক বিবেচনায় যখন জাপান, জার্মান, ইতালি, সুইজারল্যান্ডের মতো একের পর এক দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে হয় সীমিত নয় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে তখন বাংলাদেশ সরকার একে নতুনভাবে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাবনার রূপপুরে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অর্থসংস্থান কীভাবে হবে সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, রুশ সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ঋণ দেবে এবং তিনি জানিয়েছেন, ‘অর্থায়ন নিয়ে পরে চুক্তি হবে’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিভিন্ন দেশের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক যে হিসাব দেওয়া হয় শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় কয়েকগুণ বেশি। ব্রাজিল, ফিলিপাইন, ফিনল্যান্ড এর উদাহরণ। এসব দেশে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় শেষমেষ বহুগুণে বেড়ে যায়।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) কয়লা, গ্যাস ও পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয়ের যে হিসাব দিয়েছে, সেখানেও দেখা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচ অনেক বেশি। আইইএ হিসাব মতে, একটি ২৫০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ হয় ১ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ হাজার কোটি টাকায় ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব, যেখান থেকে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। অন্যদিকে আইইএ’র হিসাবে ২৫০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ হয় ১ হাজার ৬৫ কোটি টাকা, যা দিয়ে ৯টি ২৫০ মেগাওয়াটসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সম্ভব। এছাড়া বায়ু ও সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচ আরো কম। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা ব্যয় জ্বালানি তেল, কয়লা, গ্যাস, পানি, বায়ু ও সোলার এনার্জির চেয়ে অনেকগুণে বেশি। এখানে স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্ভাবনাও নেই। তাহলে বাংলাদেশ এই বিপজ্জনক ও বাড়তি খরচের পথে এগুচ্ছে কেন?

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এছাড়া রোসাটোম’র ব্যাপারে অনেক অভিযোগ রয়েছে। এ সংস্থাটি এ যাবত ২৯টি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিজাইন করেছে যেগুলো ৩১ ধরনের ‘মারাত্মক ত্রুটিসম্পন্ন’। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল কয়েকটি হচ্ছে এমন কোনো রীতিনীতি নেই যা থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বড় আকারের প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা অন্য নানা শক্তিশালী বিপদ কিভাবে মোকাবিলা করতে হবে তা জানতে পারবে; কোনো দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের জন্য যথেষ্টসংখ্যক সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল নেই; পুরনো দুর্ঘটনাগুলোর কোনো রেকর্ড নেই, এবং বৈদ্যুতিক ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য ব্যবস্থাসমূহের প্রতি অমনোযোগিতার কারণে বিপর্যয় সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

বিদ্যুতের বিকল্প সরবরাহ কার্যকর করার কোনো ব্যবস্থা অতি আধুনিক চুল্লিগুলোর ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করা যায়নি। যদি শীতলীকরণ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে তবে চুল্লিগুলোর কি লম্বা সময়ের জন্য নিরাপদ থাকার ক্ষমতা আছে? জাপানের ওপর যখন ভূমিকম্প ও সুনামি আঘাত হানে তখন এটি হয়ে উঠেছিল ফুকুশিমা দাঈচির তীব্রতম সমস্যা। তাছাড়া শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত মুখ্য যন্ত্রপাতিগুলো ধাতব শক্তি হ্রাস ও ওয়েল্ডিংয়ের ত্রুটিতে ভোগে, ফুকুশিমায় যাকে অবহেলা করা হয়। যে ধরনের হাইড্রোজেন বিস্ফোরণ ফুকুশিমার তিনটি চুল্লির বিল্ডিং খন্ড-বিখন্ড করে ফেলে।

বাংলাদেশে বিদেশী কোম্পানিগুলোর কর্মকান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকির কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। বরং অবহেলার কারণে দুর্ঘটনাজনিত দায় থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়ার নানা ধরনের কূটকৌশলের আশ্রয় নেয় সরকার। অতীত এই অভিজ্ঞতার কারণে বলা যায়, এধরনের কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে তা থেকে সংশ্লিষ্ট বিদেশী কোম্পানি পার পাবে, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ আর্থিক-সামাজিক এবং পরিবেশগত ক্ষতির শিকার হবে এদেশের মানুষ।

বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উপজাত হিসেবে উৎপাদিত বর্জ্যের বিষয়টি প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়। চুল্লি থেকে তৈরি হওয়া তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের তেজস্ক্রিয়তা কমে সহনীয় পর্যায়ে আসতে কমপক্ষে ১০ হাজার বছর লাগবে। তার অর্থ হলো, সেগুলোকে এমন কোথাও রাখতে সরিয়ে রাখতে হবে যা ঝুঁকিহীন থাকবে টানা ১০ হাজার বছর। বাংলাদেশে তার ব্যবস্থাপনা কী ধরনের হবে? চুক্তি করার সময় এসব কিছু কি বিবেচনা করা হয়েছে? অর্থাৎ আমরা যারা বেঁচে আছি তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কেবল আমাদের ঘাড়ের ওপরই থাকছে না; সে ঝুঁকি বহন করতে হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম পরম্পরাকেও।

এছাড়া জনসংখ্যার ঘনত্বকে সরকার হিসাবের মধ্যে নেয়নি তা বলাইবাহুল্য। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে চুল্লি স্থাপনা ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট বিপর্যয় রোধে যথেষ্ট পরিমাণ সরকারি সচেতন উদ্যোগ এক্ষেত্রে আছে কিংবা থাকবে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। যদিও বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকলেও রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র রিখটার স্কেলে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করার মতো করে তৈরি করা হবে’। এ সম্পর্কে কোনো ধরনের গবেষণা হয়েছে কিনা বা কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এ তথ্য দিয়েছেন সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি। ফলে ফুকুশিমার মতো ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা একটি বাড়তি চাপ হিসেবে থাকবে। জননিরাপত্তা বিবেচনা করা হলে মানুষের অস্তিত্ব যেখানে হুমকির সম্মুখীন; এধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশদ গবেষণা ছাড়া এধরনের প্রকল্প গ্রহণ সঠিক নয়। তাছাড়া বিশ্বের দেশে দেশে যখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হচ্ছে, সেখানে এ নিয়ে সরকারের অতি আগ্রহের কারণই বা কি?