ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

দৃশ্যপট এক: ঋত্বিক রোশন এর প্রথম ছবি ‘কহনা প্যায়ার হায়’ সুপারহিট। কয়েকদিন পর আনন্দলোকে পড়লাম তাঁর বাবা রাকেশ রোশন তাঁকে উর্দু ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি করিয়েছেন। উদ্দেশ্য ঋত্বিকের হিন্দি উচ্চারণ যাতে বিশুদ্ধ ও প্রমিত হয়।

দৃশ্যপট দুই: এইচএসসির পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ওআইসিভুক্ত দেশের ছেলেরা পড়তে আসতো। একদিন এক পাকিস্তানি সহপাঠি আমাকে জিজ্ঞেস করলো উর্দু বুঝি কিনা। জবাব দিলাম বুঝি না। সে জিজ্ঞেস করলো হিন্দি ছবি দেখি কিনা। বললাম মাঝে মাঝে দেখি। সে বললো হিন্দি আর উর্দু একই ভাষা।

উপরের দুটো ঘটনার প্রেক্ষাপট খুঁজে বের করতেই এ লেখার অবতারণা।

মানবজাতির বিস্তারের সাথে ভাষার বিস্তরণের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মধ্য এশিয়া থেকে আর্যদের একটি শাখা ইউরোপে প্রবেশ করে। এদের ভাষাকে বলা হয় ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার উপশাখা হলো ইন্দো-ইরানীয় ভাষা। আর্যভাষা হলো ইন্দো-ইরানীয় ভাষার একটি শাখা। ধর্মগ্রন্থ বেদের ভাষা বলে একে বৈদিক আর্যভাষাও বলা হয়। ভারতবর্ষের আর্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় আনার্য ভাষাগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। অনার্য ভাষাগুলোর কিছু শব্দ শুধু টিকে থাকে। কালের পরিক্রমায় আর্য ভাষায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ পাণিনি ও ভাষ্যকার পতঞ্জলি এর সংস্কার করেন। তাই এর নাম হয় সংস্কৃত। সংস্কৃত প্রাচীন পৃথিবীর সেরা ভাষাগুলোর একটি। সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছে রামায়ন ও মহাভারতের মত মহাকাব্য। কবি কালিদাস, বিজ্ঞানী আর্যভট্ট ও বরাহমিহিরের রচনার ভাষা ছিল সংস্কৃত।

সংস্কৃত ভাষার যে রূপটি ছিল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, তা এক সময় শিথিল ও সরল হয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ ধারণ করে। কালক্রমে এগুলোকেই বলা হয় প্রাকৃত ভাষা। এ ভাষাগুলোর প্রকৃতি বা মূল সংস্কৃত, তাই এদের বলা হয় প্রাকৃত ভাষা। অথবা প্রকৃতি অর্থ সাধারণ জনগণ, অর্থাৎ প্রাকৃত অর্থ প্রাকৃতজনের ভাষা। প্রাকৃতভাষার শেষস্তর হচ্ছে অপভ্রংশ। এরকম একটি অপভ্রংশ হচ্ছে শৈৗরসেনী অপভ্রংশ। মুসলিমরা ভারতে আসার সময় দিল্লি ও তার আশেপাশে যে ভাষা প্রচলিত ছিল তার নাম খাড়িবুলি, যেটি ছিল শৌরসেনী অপভ্রংশের স্থানীয় রূপ।

ভারতের প্রধান বন্দরগুলো আরব সাগরের তীরে অবস্থিত। ফলে ধারণা করা যায় আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই প্রথমে ভাষাগত আদান-প্রদান ঘটে। ভারতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে দিল্লি হয় তার রাজধানী। দিল্লি আটশো বছর ভারতে মুসলিম শাসনের কেন্দ্র ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিম শাসকদের ভাষা ছিল তুর্কি। পরবর্তী শাসকরা ছিলেন ফারসিভাষী। এছাড়া ধর্মীয় কারণে আরবির একটা ব্যাপক প্রভাবতো ছিলই।এভাবে দিল্লি ও আশেপাশে স্থানীয় খাড়িবুলির সাথে আরবি, ফারসি, তুর্কি শব্দের ব্যাপক সংমিশ্রণ ঘটে। ভারতের আরেক নাম হিন্দুস্তান। তাই এভাবে যে নতুন ভাষার জন্ম হয় তার নাম হয় হিন্দুস্তানি। মুসলিম প্রশাসক, সৈন্যদল, বাবসায়ী, কারিগর ভারতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে হিন্দুস্তানি ভাষারও বিস্তরণ ঘটে।

মুসলিম আমলে ফারসি দাপ্তরিক বা আদালতের ভাষা হলে ও সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা (Lingua Franca) ছিল হিন্দুস্তানি (ব্রিটানিকা)। আমির খসরু, কবির, দাদু, রহিম কাব্যচর্চা করতেন হিন্দুস্তানি ভাষায়। মুগল সম্রাট শাহজাহানের সেনানিবাসের নাম ছিল উর্দু-এ-মুআল্লা। এখানে ভারতের বিভিন্ন এলাকার সৈন্যরা খাড়িবুলি বা হিন্দুস্তানিতে কথা বলতো। শাহজাহান তাঁর সেনানিবাসের নামে এ ভাষার নামকরণ করেন উর্দু (বাংলাপিডিয়া)।

উর্দু ভাষার হরফ নেয়া হয় ফারসি প্রভাবিত আরবি ভাষা থেকে। আরবি ভাষায় ‘প’ বর্ণটি নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আরব ছাত্রদের দেখতাম তারা ‘পেপসি’ কে বলতো ‘বেবসি’। উর্দুতে ‘প’ হরফ যোগ করা হয়। উর্দু ভাষার ব্যাকরণ মূলত ফারসি ব্যাকরণের অনুরূপ।

ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশরা তাদের তরুণ অফিসারদের হিন্দুস্তানি ভাষা শিক্ষার উপর জোর দিত। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে হিন্দুস্তানি ভাষার উপর আলাদা বিভাগ ছিল। ১৮৫০ সালে ইংরেজি ও উর্দুকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত দেয়া হয়। স্কুল, দপ্তর, আদালত, সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সবার যোগাযোগের মাধ্যমে ছিল উর্দু। ১৮৬৪ সালে উর্দু ইন্ডিয়ান আর্মির ভাষা হিসেবে নির্ধারিত হয় (Robert D. King) ।

ব্রিটিশরা চেয়েছিল হিন্দুস্তানি বা উর্দু ভাষাকে উত্তর ভারতের সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে।

প্রাচীন ভারতে দুটি লিপির ইতিহাস পাওয়া যায়। একটি ব্রাহ্মী লিপি, অন্যাটি খরোষ্ঠী লিপি। ব্রাহ্মী লেখা হতো বাম থেকে ডানদিকে, আর খরোষ্ঠী ডান থেকে বামে। ব্রাহ্মী লিপি থেকেই ভারতের অধিকাংশ লিপি বিকাশিত হয়। এরকম একটি লিপি দেবনাগরি লিপি (উৎপত্তি আনুমানিক একাদশ শতক)। হিন্দি ভাষা লেখা হয় দেবনাগরি লিপিতে। তবে হিন্দি ঠিক কবে থেকে দেবনিাগরি লিপিতে লেখা শুরু হয় তা গবেষণার দাবি রাখে।

হিন্দি কবি মালিক মুহম্মাদ জয়সী তাঁর ‘পদুমাবৎ’ কাব্য (যার উপর ভিত্তি করে আলোচিত হিন্দি ছবি পদ্মাবতী নির্মিত হয়েছে) লিখেছিলেন ফারসি হরফে (ব্রিটানিকা)। তবে ফারসি প্রভাবিত আরবি হরফে লিখিত হিন্দুস্তানি সরকারি ভাষা হলেও সাধারণ মাসুষের মধ্যে দেবনাগরি লিপিতে লিখিত হিন্দি অধিক জনপ্রিয় ছিল বলে ধারণা করা হয় (Kerrin Dittmer)।

১৮৩৭ সালে বিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিভিন্ন প্রদেশে ফারসির বদলে স্থানীয় ভাষার ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু উত্তর ভারতে দেবনাগরি লিপিতে হিন্দি গ্রহণ না করে ফারসির বদলে উর্দুকে সরকারি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ১৮৬৭ সালে উত্তর প্রদেশ ও আওধ এর হিন্দু প্রতিনিধিরা উর্দুর পরিবর্তে হিন্দিকে সরকারি ভাষা করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি জানায়। বেনারসের বাবু শিবপ্রসাদ ছিলেন দেবনাগরি লিপিতে হিন্দি লেখার অন্যতম প্রস্তাবক (উইকিপিডিয়া)। ১৮৬৮ সালে লিখিত ‘Memorandum on court characters’ এ তিনি ফারসি শিখতে বাধ্য করার জন্য প্রথম দিককার মুসলিম শাসকদের অভিযুক্ত করেন।

উনিশ ও বিশ শতকে বেশ কিছু হিন্দি আন্দোলন সংঘটিত হয়। যেমন ১৮৯৩ সালের বেনারসের নাগরি প্রচারণী সভা, ১৯১০ সালে এলাহাবাদের হিন্দি সাহিত্য সম্মোলন ও ১৯১৮ সালের দক্ষিণা ভারত হিন্দি প্রচার সভা। ১৮৮০ সালকে হিন্দি ভাষার জন্মসাল হিসেবে ধরা হয়। ১৮৮১ সালে ফারসি হরফে উর্দুর পরিবর্তে দেবনাগরি লিপিতে হিন্দিকে বিহারের সরকারি ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করা হয় (উইকিপিডিয়া)।

মুসলিমরা দেবনাগরি লিপিতে হিন্দুস্তানি ভাষার সরকারি ব্যবহারের বিরোধিতা করতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার হিন্দি-উর্দু বিতর্ককে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভাজন হিসেবে দেখতে থাকতে। যদিও ব্যাপারটি এত সরলীকরণ করা যায়না। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর পিতা মতিলাল নেহেরুর মাতৃভাষা ছিল উর্দু এবং তিনি ছিলেন উর্দু ভাষার একজন সাহিত্যিক (Robert D. King) । উত্তর ভারতের অনেক এলাকায় হিন্দু মুসলিম নির্বেশেষে সবাই উর্দুতে কথা বলে এবং উত্তর প্রদেশের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হচ্ছে উর্দু।

মহাত্মা গান্ধী চেয়েছিলেন হিন্দুস্তানিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করতে, যার দুটি লিখিত রূপ থাকবে: একটি ফারসি হরফে আরেকটি দেবনাগরী লিপিতে যেটি অপ্রচিলিত আরবি-ফারসি বা সংস্কৃত শব্দ বর্জিত হবে। (Robert D. King) ।

১৮৫০ এর পরবর্তীতেই ভারতীয় হিন্দুরা তাদের নিজেদের জন্য একটি সাধারণ ভাষার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে এবং দেবনাগরি লিপিতে লিখিত হিন্দুস্তানি ভাষার নামকরণ করা হয় হিন্দি।
পরিশেষে বলা যায় উর্দু-হিন্দি দুটি ভাষাই ইন্দো-ইরোনীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তভুক্ত। দুটি ভাষাই সংস্কৃতির অপভ্রংশ খাড়িবুলি থেকে উৎপন্ন হিন্দুস্তানি ভাষার দুটি ভিন্ন লিখিত রূপ। হিন্দুস্তানি ভাষা ফারসি প্রভাবিত আরবি হরফে লিখলে তা উর্দু। আর হিন্দুস্তানি ভাষা দেবনাগরি লিপিতে লিখলে তা হিন্দি। উর্দু ভাষা আরবি-ফারসি শব্দবহুল আর হিন্দি ভাষা সংস্কৃত শব্দ বহুল। ভাষাগোষ্ঠী হিসেবে হিন্দি-উর্দু কে একই ভাষা হিসেবে গণ্য করা হয় এবং হিন্দি-উর্দুর ভাষাগত বিভাজনটি কৃত্রিম।

References:
1. Banglapedia
2. Dittmer, Kerrin (1972), Die indischen muslims and die Hindi-Urdu kontroverse in den United Provinces, Cited in King, 2001.
3. King D. Robert (2001), The poisonous potency of script: Hindi and Urdu.
4. www.brittanica.com
5. en.wikipedia.org