ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের সাথে দেশের সুনাম বৃদ্ধি পায়। হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডের নাম শুনলেই আমেরিকা বা ব্রিটেনের নাম সগৌরবে উচ্চারিত হয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে। সম্প্রতি আমরা দেখেছি ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান উন্নয়নে অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এরকম উদাহরণ সব উন্নত দেশে ভুরি ভুরি আছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই এ দেশগুলো তাদের কর্মকৌশল ঠিক করে।

উন্নত দেশগুলেতে সরকারের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর হস্তক্ষেপ বলতে যা বোঝায় তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জনগণের টাকার জবাবদিহি করতে হয়। আর এ জবাবদিহিতা গবেষণার দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটুকু এগিয়েছে তা দ্বারা নির্ধারিত হয়। ভাল গবেষণা না করতে পারলে পূর্বে যত নামই থাকুক ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ক্রমিক অবনমন হবে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, গবেষক/শিক্ষকদেরও মূলযায়ণ হয় ভাল গবেষণা দ্বারা। সরকার এর বাইরে আর কোন হস্তক্ষেপ করেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদে কারা আসবেন এ ব্যাপারে সরকারের কোন মাথা ব্যথা নেই। সরকার বিশ্বাস করে এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার।

আমি জাপানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর ডীন/প্রেসিডন্ট নির্বাচন দেখেছি। জাপানে ভাইস-চ্যান্সেলর পদের নাম প্রেসিডন্ট। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় ভোটের মাধ্যমে। সরাসরি সাধারণ শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত হয় প্রেসিডেন্ট। সরকার কোন ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য বসিয়ে দেয় না। এখানে কোন শিক্ষক সমিতি নেই। সাদা নীল গোলাপী বলে কিছু নেই। একজন শিক্ষকের মতামত হলো তার ভোট। কোন দলীয় গ্রুপের মাধ্যমে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়না। তবে সাধারণত চাকরীর শেষদিকের অধ্যাপকদের সবাই ভোট দেয়। মজার ব্যাপার হলো এখানে সবাই সবাইকে ভোট দিতে পারেন।

আরও মজার ব্যাপার হলো এখানে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদ পেতে খুব বেশী আগ্রহী না। পদের বাড়তি চাপ নিয়ে গবেষণার ক্ষতি হওয়ার আশংকায় বেশীরভাগ শিক্ষক এরকম পদে যেতে চান না। শেষ বয়সের শিক্ষকদের ডীন/প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করার এটাও একটি কারণ।

জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র এরকম যে অধ্যাপকই সব। এখানে অধ্যাপকদের মিটিং হলো সবকিছুর উর্ধ্বে। তাদের বিশাল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অধ্যাপকদের ঢিঙিয়ে কেউ কিছু করতে পারেনা। বিভাগীয় কোন সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসিডন্ট/ডীন কখনই অধ্যাপকের সিদ্ধান্তের বাইরে যান না। যার কারণে এখানে কঠোরভাবে চেইন অব কমান্ড বজায় থাকে। সহকারী/সহযোগী অধ্যাপক থেকে শুরু করে কারও অধ্যাপকের হুকুমের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। এর একটি বড় কারণ হলো এখানে কোন দলবাজি করা যায়না। দলের শক্তি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচয় হবার কোন সুযোগ নেই। নামিদামি হতে হলে অবশ্যই গবেষণায় বিখ্যাত হতে হবে।

অথচ বাংলাদেশে পুরো বিপরীত চিত্র দেখা যায়। এখানে ব্যাপারটা এমন যে সবাই যেন তাদের অনুগত দলের জন্য কাজ করতে আসছেন। সরকার ভাইস-চ্যান্সেলর নিয়োগ দেওয়ায় সরকারী দলের লোকজন সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। যার দল ক্ষমতায় থাকে তার যেন ঈদের দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সমস্ত বাড়তি সুযোগ সুবিধা যেন তাদের অধিকার। মেধার মূল্যায়নের চেয়ে দলবাজি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। যার কারনে গবেষণার চেয়ে দলের বড় কর্মী হওয়া নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকেন। সুবিধা নেওয়ার প্রতিযোগিতায় দ্বন্দ্ব ও মলোমালিন্য শুরু হয়, যার প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক একটি খবর তার বড় উদাহরণ।

যেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বড় জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশ নিয়ে প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা, সেখানে দলবাজি, দলের পদের জন্য দ্বন্দ্ব এবং এরকম আরও নানা স্বার্থজনিত কাজ নিয়ে বাংলাদেশের বেশীর ভাগ শিক্ষকরাই ব্যস্ত। রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের প্রবণতা থেকে গবেষণা/পড়াশুনার বাইরে এরকম কাজ পেতে সবাই উদগ্রীব থাকেন। সরকার যদি শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করে দিয়ে গবেষণার উপর জোর দিত এবং শুধুমাত্র মেধাবী গবেষক/শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতো তাহলে এই অসৎ প্রতিযোগিতা করার কারও সময় হতো না।

বাংলাদেশে সরকার/রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ভাইস চ্যান্সেলর নির্বাচন করার কৌশল হতে বের না হতে পারলে দলীয় প্রভাবমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস তৈরী সম্ভব নয়। ছাত্র রাজনীতির সাথে লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষক রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকি। এমন পরিস্থিতিতে যেমন শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার মান বাড়ানো অসম্ভব, তেমনি গবেষণার মান উন্নয়ন করাও কঠিন। সরকার যদি সত্যি সত্যি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাল চায়, তবে দ্রুত শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত করতে হবে ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রশাসনিক পদ। নতুবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনভিপ্রেত ঘটনা দিয়ে যে নতুন ধারার সৃষ্টি হয়েছে তা বাড়তেই থাকবে এবং তা হবে একটি দেশের জন্য বড় লজ্জা।

লেখক:

ড. মো: ফজলুল করিম

শিক্ষক ও গবেষক

কুমামতো বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান