ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

খালেদা জিয়ার রায় পরবর্তী বিএনপির প্রতিক্রিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন বলা যায়। এটিকে জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন থেকে বের হয়ে একটি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের সুন্দর সূচনা বলতে পারি নিঃসন্দেহে। আদলতের রায় আদালতেই চ্যালেঞ্জ ও মীমাংসা করবার যে অভিপ্রায় লক্ষ্য করা গেছে তা এক কথায় প্রশংসনীয়। এই মনোভাব বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল পোষণ করলে বাংলাদেশের রাজনীতি আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে যাবে।

খালেদা জিয়ার রায় পূর্ববর্তী দুই দলের মধ্যে যে ভাষাগত আক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে তাকে আমি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখছি। পরস্পরকে চাপে রাখার এই কৌশল রাজনীতিতে পৃথিবীর সব জায়গায় দেখা যায়। তাই এটাকে বাড়াবাড়ি বলার কোন কারণ দেখছিনা। বরং রায়কে কেন্দ্র করে কোন ধরনের সহিংসতা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে এ ব্যাপারে দুই দলই সচেতন ছিল। খুব কড়াকড়ির মধ্যেও খালেদা জিয়ার ভক্তরা রাস্তায় নেমে আসলেও আমি বলব পুলিশ খুব সতর্কতার সাথে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। এক্ষেত্রে সরকার ধন্যবাদ পেতে পারে।

এরকম কিছু নতুনত্বের মধ্যেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে দুর্যোগ চলছিল তা কিভাবে প্রশমিত হবে এখনই বোধ হয় বলার সময় হয়নি। এটা বলা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে আদালত সুষ্ঠু বিচার করলেও সবসময় একটি প্রশ্ন থেকে যায় জনগণের মাঝে। এর বড় কারণ বোধহয় বাংলাদেশের আইন-আদালত অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতা ও ব্যক্তির পরিচয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এটা অবশ্য শুধু বাংলাদেশে না, আমাদের মত প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশে এই চিত্র দেখা যায়। তাই এসব দেশের বিচারের রায় জনগণের কাছে খুব বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়না।

তবুও আমরা যদি ধরে নিই খালেদা জিয়া ‘জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলায়’ খুব যুক্তিসংগত কারণেই সাজা পেয়েছেন, তবে আমরা আশা করতে পারি বাংলাদেশে আরও বড় বড় দুর্নীতির সাথে জড়িত ব্যক্তিদেরও একদিন বিচার হবে। যদিও বাংলাদেশে শেয়ার কেলেঙ্কারি, ফার্মার্স ব্যাংক থেকে শুরু করে আরও অনেকগুলো ব্যাংকের হাজার হাজার টাকা লুটপাটের সাথে জড়িতদের কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েক হাজার কোটি টাকা চুরির জন্য দায়ি ব্যক্তিদের বিচার করার মাধ্যমে সরকার খুব সহজেই প্রমাণ করতে পারে আইন সবসময় নিজের গতিতেই চলে। কিন্তু এর কোনটিরই বিচার না হলে খালেদা জিয়ার বিচারকে হয়ত রাজনৈতিক বিচার হিসেবে মানুষ দেখবে। বিচারের গতি প্রকৃতি নিয়ে অবশ্য এখনই সিদ্ধান্তে উপনীত হবার কোন কারণ নাই। কারণ এখনও আরও দুই ধাপে আপিল করবার সুযোগ আছে। পরবর্তী দুই ধাপ অতিক্রম করার পর বোঝা যাবে এ বিচারের পরিণতি।

খালেদা জিয়ার বিচারের সাথে সাথে বাংলাদেশের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা আরও ঘণীভূত হলো এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। যদিও ভাল দিক হলো দুই দলই নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা তা বলা মুশকিল, যদিও বিএনপি যে কোন পরিস্থিতি নির্বাচনে যাবে এরকম শুনা যাচ্ছে। তবে আমার মনে হয় পরিবর্তী সপ্তাহে খালেদা জিয়ার জামিনের উপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তবে সরকারি দলের রাজনৈতিক কৌশলের সাথে যদি এই জামিন সম্পৃক্ত হয়, সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার জেল থেকে ছাড়া পেতে দেরি হতে পারে। বিএনপি দল হিসেবে সুসংহত না হলে অবশ্য রাজনীতির চাকা বদলে যেতে পারে। এমনও হতে পারে খালেদা জিয়াকে পুরো সময়ই জেলে থাকতে হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ অবশ্য এর চেয়েও বড় বিপর্যয় থেকে উঠে এসেছে। ‘৭৫ পরবর্তী কঠিন সময়ে আওয়ামী লীগ যেভাবে নিজেদের ধরে রেখেছে, সেরকম যদি বিএনপি না করতে পারে, তবে বিএনপির সামনে দিনগুলো আরও ভয়াবহ হবে। দীর্ঘদিন খালেদা জিয়া জেলে থাকলে বিএনপি কিভাবে পরিচালিত হয় তার উপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতিতে ভিন্ন রকম কিছু দেখা গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

তবে আমরা আশা করছি সব কিছুর পরেও দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বাংলাদেশকে স্থিতিশীল রাখতে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। সত্যিকারার্থে, নতুন ধারার বাংলাদেশের জন্য এর কোন বিকল্প নেই।

 

লেখক: ড. মো: ফজলুল করিম,

শিক্ষক ও গবেষক, কুমামতো বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান।