ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

বাংলাদেশের সরকারি চাকরি আজ কোটা সিস্টেম দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত। একটি দেশের মোট সরকারি চাকরির আসনের ৫৫ ভাগ যখন কোটা দ্বারা পূরণ হয় তখন ঐ দেশের মেধাবীদের অবস্থা কি- তা বোঝার জন্য মহাপণ্ডিত হওয়ার দরকার নাই। আমরা একটি বিসিএসে কোটাধারীদের সুবিধা নিয়ে আলোচনা করলেই একটি হতাশাজনক চিত্র চলে আসবে।

ধরে নেওয়া যাক ৪০তম বিসিএসে ৪০০০ পোস্ট আছে। ৪০০০ এর ৫৫ ভাগ হলো ২২০০। বাকি ১৮০০ হলো মেধাবীদের জন্য। যদি ৪০০০ পোস্টের বিপরীতে শেষ পর্যন্তু ১৫০০০ জনকে ভাইভার জন্য ডাকা হয় এবং কোটার আওতায় সুযোগপ্রাপ্ত যদি ১৪.৬ ভাগ হয়, পুরো ২২০০ জনই ভাইভাতে পাশ করলেই চাকরি পাবে। আমার বিশ্বাস এই ভাইভার জন্য ডাক পাওয়া ১৫০০০ জনের মধ্যে ২০০০ থেকে ৩০০০ জনের চেয়ে বেশি কোটার আওতায় থাকবেনা। আমার ধারণা মতে এটা সর্বোচ্চ সংখ্যা। বেশিরভাগ সময়ই কোটার জন্য বরাদ্ধ আসন সংখ্যার কম সংখ্যক ভাইভা পর্যন্তু পাওয়া যায়। তার মানে লিখিত থেকে ভাইভা মিলে তিনি যেমন নাম্বারই পান না কেন, তিনি খুব সহজেই বিসিএস ক্যাডার হচ্ছেন।

অপরদিকে ভাইভায় ডাক পাওয়া মেধাবীদের বাকি ১২৮০০ জনকে প্রতিটি পোস্টের জন্য ৭ জনের সাথে লড়তে হচ্ছে। এই যখন অবস্থা তখন প্রতিটি পোস্টের বিপরীতে বাকি ৬ জন যদি কোটার বিপরীতে আসা প্রার্থীর চেয়ে মেধাবীও হয়, তবুও বাদ পড়তে হবে।

আমার এই পরিসংখ্যান ভিত্তিক পর্যালোচনার উদ্দেশ্য হলো কোটা কিভাবে মেধাবীদেরকে বাংলাদেশের সরকারি চাকরির বাজার থেকে দূরে রাখছে তা বোঝানো। এর মাধ্যমে আমরা কম মেধাবীদের বড় বড় জায়গায় বসিয়ে ধীরে ধীরে একটি মেধাশূন্য আমলাতন্ত্র তৈরি করছি। ইতিমধ্যে এর প্রভাব শুরু হয়েছে বাংলাদেশের সরকার পরিচালনায়।

আমি মনে করি ন্যূনতম একটি ভাগ কোটার আওতায় থাকা যুক্তিযুক্ত। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ ভাগ কোটা ছিল সময়ের ভাল পদক্ষেপ। যাদের জন্য এই বাংলাদেশ পেলাম তাদেরকে সরকারে নিয়ে আসতে এটা ছিল একটি ভালো পরিকল্পনা। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও এই ৩০ ভাগের ব্যবহার কতটা উচিত তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সময় ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এটা সংস্কার করলে যদি রাষ্ট্রের জন্য ভালো হয় তবে আমাদের আবেগের কাছে বশ্যতা স্বীকার করা উচিত কিনা ভাবতে হবে।

মুক্তিযাদ্ধা কোটা ছাড়াও উপজাতি কোটা থেকে শুরু করে নানা ভাবে আরও ২৫ ভাগ কোটা এসেছে। এটা ঠিক, সময়ের দাবীর প্রেক্ষিতে এবং পিছিয়ে পড়া মানুষকে মূল ধারায় নিয়ে আসতে এই কোটা জরুরী ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে এবং এত বড় জনসংখ্যার মেধাবীদের একটি বিরাট অংশকে জাতীয় নীতির মাধ্যমে বঞ্চিত করা ঠিক হচ্ছে কিনা তা নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

আমি মনে করি সঙ্গত কারণেই কোটা সিস্টেম সংস্কার করার সময় এসেছে। প্রথমত একটি দেশে চাকরীর সিংহভাগ সুবিধাভোগীদের জন্য রাখার কোন কারণ নেই। বিশ্বায়নের যুগে যেখানে লড়াই করে সামনে যেতে হয় সেখানে একটি বড় অংশকে আপনি সুবিধা দিতে পারেন না। সংবিধান যখন নারী-পুরুষের জন্য সমান অধিকারের কথা বলে তখন মেয়েদের জন্য আলাদা কোটা রাখা সংবিধানের সাথে যায়না। এখন মেয়েরা কোন অংশেই ছেলেদের চেয়ে কম নয়। কোটার ব্যবহার বোধ করি তাদেরও আত্মসম্মানে লাগার কথা।

আরও একটি ব্যাপার, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটা নামক একটি কোটা আছে। আমার কথা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজনের শিক্ষকের ছেলে-মেয়েদের জন্য কেন ভর্তি কোটা থাকতে হবে? কোটা যদি পিছিয়ে পরা মানুষের জন্যই হয়, তাহলে থাকা উচিত একজন গরীব কৃষকের সন্তানের জন্য। কৃষকরা যখন বাংলাদেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি, তখন তাদের উৎসাহ দিতে আমরা কি করেছি?

সবশেষে বলতে চাই, কোটা এসেছে সময়ের প্রয়োজনে। আবার সময়ের প্রয়োজনে এটা সংস্কার করা জরুরি। এটা নিয়ে কথা বলা মানে কেউ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী হবে, এরকম অন্যায় চিন্তা-ভাবনা আমাদের দেশকে পিছিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। সরকারকে অবশ্যই বাস্তবতা এবং সম্ভাবনাময় তরুণদের কথা চিন্তা করতে হবে। নতুবা মেধাবীরা দেশ থেকে পাচার হবে। আর আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের অবস্থা হবে নড়বড়ে।

পূর্ব প্রকাশিত

লেখক: ড. মো: ফজলুল করিম
শিক্ষক ও গবেষক, কুমামতো বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান;

এবং সহযোগী অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।