ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকেই জনমনে একরকম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়ে আছে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে। সামনের দিনগুলিতে বাংলাদেশের রাজনীতি যে সংঘাতময় হয়ে উঠবে এ ব্যাপারে কারো মনে কোন রকম দ্বিধা আছে বলে মনে হয় না। কারণ, এদেশের জনগণ গত চল্লিশ বছর ধরে আমাদের রাজনীতিবিদদের চরিত্র এবং রাজনীতি করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রত্যক্ষ করে আসছে এবং এদের চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে মোটামুটি সঠিক ধারণাটি পেয়ে গেছে। তাই এরা কখন কি বলবে, কখন কি করবে সেটা এই জাতি আজকাল বিলক্ষণ টের পায়। এজন্য রাজনৈতিক জ্ঞান বা বিচার, বিচক্ষণতারও খুব একটা প্রয়োজন হয় না। কারণ, এদের সবকিছুই চলছে ছকবাঁধা নিয়মে, গৎবাঁধা ধরনের। রাস্তায় গাড়ি চাপায় মানুষ মরলে, ভেজাল খেয়ে অসুস্থ হলে, কোথাও কোনও নিরাপত্তা না পেলে, দুর্নীতির কষাঘাতে জীবন অতিষ্ঠ হলে, শেয়ার বাজারে টাকা খাটিয়ে পথের ফকির হলে এরা এদের নাটকীয় কথায় মনের মধ্যে নরক যন্ত্রণা তৈরি করে। এরা স্বপ্ন দেখায় চাঁদে যাবার, কিন্তু ঈদ-এ বাড়ি যাবার রাস্তাটাও ঠিক করে রাখে না। তন্ত্র, মন্ত্র আর চেতনায় এরা ভীষণ সমৃদ্ধ। উন্নত দেশের মানুষগুলি পুষ্টিকর সব খাবার খেয়ে বেঁচে আছে। আর, আমরা শুধু চেতনা গিলি। উদর ভর্তি করে তন্ত্র, মন্ত্র খাই আর দু’চোখ ভরে জাতির মহান দেব-দেবীর স্বপ্ন নিয়ে ঘুমাই। আর কত বোকা হতে পারে জনতা!! – যেখানে বিশ্বের সব নিয়ম নীতি আজ সহজেই জেনে নেয়া যায়। এত দেব দেবীর সৃষ্টি না হলেও বিশ্বের অনেক দেশের জনগণই আজ রাষ্ট্রের সুবিধা ছাড়া অসুবিধাগুলো মেনে নিতে চায় না। একটু অসুবিধা দিলেই সিংহের আর সিংহাসন থাকে না। মাথা নামিয়ে সোজা বাড়ী ফিরে যেতে হয়। সেখানে মানুষ নানা রকম চেতনায় অচেতন নয়, বরং, প্রকৃতই সচেতন।

দেশের কিছু সচেতন নাগরিক এবার শহীদ মিনারে ঈদ করে আগামী প্রজন্মের জন্য হয়তো কিছু বার্তা রেখে গেলেন। সারা দুনিয়া থেকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ যারা একটি সুখী ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ দেখতে চাচ্ছেন। অথচ, আমাদের বিশেষজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী এই সচেতন নাগরিকদের নিয়ে মশকরা করতে ছাড়লেন না!! পারলে কয়েকদিন পর ‘ভালর পশরা’ দিয়ে হাই ভোল্টেজ একটা রচনাও লিখবেন।

আমারা আমজনতা তো স্বাধীনতার পর থেকেই পোষা বিড়াল হয়ে আছি। হাজার বাড়ি খেলেও ম্যাও ম্যাও করা ছাড়া গর্জন করতে পারিনা আমাদের প্রিয় নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে। মনে হয়, বাংলাদেশের আমজনতা আমরা যেন রাজনীতিবিদদের বলির পাঁঠা হয়ে সবরকম ত্যাগ স্বীকারের জন্য জীবন ধন্য করে বসে আছি। এত কিছু বুঝেও তাই আমরা কোনভাবেই এদের মায়ার বাঁধন খুলে বেরিয়ে আসতে পারছিনা। এরা ঢিল দিলে ঢিল খাই, চড় দিলে চড় খাই, লাথি দিলে লাথি খাই – তারপরও এদের প্রতি মায়ায় আমরা কেঁদে কুটিকুটি হই। আর, দেশের শিক্ষিত এক নষ্ট সমাজ যাদু-টোনা করে পুরো জাতিকে এদের পিছনে লাফাবার জন্য ক্রমাগত ইন্ধন দিয়ে বেড়ায়। এই সম্প্রদায়ের দালালরা তাদের চাটুকারিতার মাধ্যমে নেতা-নেত্রীদের মোসাহেবি করে আর আমজনতাকে বিভ্রান্ত করে নানা ধরণের চেতনার বড়ি গিলায়। তাদের দেব- দেবীরা একটু বিপদে পড়লে এই বড়ি বিক্রি করতে অনেক মতলববাজ সাধুবাবাই জোর কদম শিঙ্গা হাতে নেমে পড়ে। কিছু কিছু আবার শিক্ষিত এবং সমাজের উঁচু শ্রেণীর সাধুবাবা। এদের রেট হয়তো বেশী। পাশাপাশি, রিস্কটাও কম। কি মজার পেশা – সহজে যায় না ছাড়া।

এই শিক্ষিত সাধুবাবাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে চেতনা ফেরি করা আর দলবাজির ইতিহাস রচনা করা। এরা নিজেরা কোনদিন এদেশের ইতিহাসের পাতায় নিজেদেরকে সম্মানিত নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদ অনুভব করে না। দলবাজির রাজনীতিতে শরিক হয়ে এরা আসলে নষ্ট সমাজ গঠনের কারিগরদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এই শিক্ষিত দালালরা হোক সাংবাদিক, হোক আইনজীবী, হোক অধ্যাপক অথবা কোন কবি সাহিত্যিক – এরা বাস্তবিক অর্থে পাঁচাটা উচ্ছিষ্টভোগী দালাল।

আর, আছে অনেক অনেক সিদ্ধিবাবার অন্ধ মুরিদ। আমাদের বিশেষজ্ঞ প্রধানমন্ত্রীর জন্য জান কোরবান করার জন্য বসে আছে। পারে তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মতিঝিলের কোন সুউচ্চ ভবন থেকেও লাফিয়ে পরতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বেঁচে বেঁচে যারা আজ ফকির থেকে জমিদার হয়ে গেল, যুদ্ধ না করেও বিশাল বিশাল জাতিও নেতাদের জন্য এদের দরদ উথলে পড়ে। আর, যেই জনগণ যুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করলো তাদের স্মৃতির প্রতি তখনই শ্রদ্ধা দেখায় যতক্ষণ এই চেতনা বেঁচা নেতাদের ক্ষমতার জন্য বলির পাঁঠা হতে রাজি আছে তাদের পুরো পরিবার।

শিক্ষিত আরেক সমাজ আছে যেন তারা বোবা হয়ে গেছে। সমাজের ভালমন্দ কোন কিছুতেই রা নেই তাদের। অথচ, তারা বুঝলেন না যে তাদের সেই শিক্ষা আসলে পুরোটাই মূল্যহীন। যে শিক্ষা গ্রহণ করা হয় জীবিকার প্রয়োজনে শুধুমাত্র একটি পরিবারকে লালন পালন করার জন্য সেই শিক্ষা আসলে কোন প্রকৃত শিক্ষা নয়। প্রকৃত শিক্ষা হতে হয় প্রসারণময়, সৃজনশীল এবং সৃষ্টি সুখের পরশ পাথর। একটা সমাজে একজন শিক্ষিত ব্যক্তি অনেক কিছুই বদলে দেবার ক্ষমতা রাখে যদি সেটা প্রকৃত শিক্ষা হয়।

আশার কথা এই যে, বাংলাদেশের সচেতন দেশপ্রেমিক একটা অংশ রাজনীতির এই হালহাকিলত একটু একটু টের পাওয়া শিখছে এবং নানাভাবে এদেশের নষ্ট রাজনীতিবিদদের প্রতি তাদের ঘৃণা প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন সামাজিক সাইটে তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশে ইচ্ছুক হয়ে উঠছে। এই অংশটা মূলত বয়েসে তরুণ, তাই আমাদের আশাবাদী হবার মত কারণ ঠিকই রয়ে গেছে। তবে, এই সুযোগটা নষ্ট করার মত কোন ভুল করা যাবেনা, নচেৎ, এই জাতিটা একদিন হারিয়ে যাবে চিরতরে। এই তরুণ ও যুব সমাজকে অনুপ্রেরণা দিয়ে এদের সাংগঠনিক ক্ষমতাকে প্রকাশ করার পথ সৃষ্টি করে দিতে হবে আমরা যারা বয়োজ্যেষ্ঠ তাদেরকেই। এদের জন্য কিছু কিছু পৃষ্ঠপোষকতার অবশ্যই প্রয়োজন। এই তরুণ সমাজের একটা অংশকে নানাভাবে আলোকিত করার মধ্য দিয়ে আমরা একটা উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারি। এদেরকে সমাজ বিনির্মাণের কাজে নিয়োজিত রেখে দুষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার করা গেলে জাতি কিছুটা সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। যারা সত্যিকার অর্থে হৃদয়ে দেশপ্রেম ধারণ করেন তাদের উচিত হবে নানামুখী পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এরকম অসংখ্য তরুণ গোষ্ঠী তৈরিতে সহযোগিতা প্রদান করা।

স্বাধীনতার পর থেকেই মহা তামাশা দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমরা। জাতির কত পিতা, কত মাতা, কত ভাই, কত বোন যে কি করেছে তা এখন আমারা সবাই জানি। জাতির মাথা বেঁচে এ জাতিকে গাঁজা খাওয়ানোটাই দেখলাম আমাদের নষ্ট রাজনীতিবিদদের সবচেয়ে বড় সফলতা। আর, এই সফলতা তৈরি করতে সহায়তা দিচ্ছে কিছু মোসাহেব আর মাথা মোটা দলকানা অনুসারীগন। মাথা মোটা লোকের তো কোন অভাব নেই এই বঙ্গে। বাঁশ খেলেও যেন ঠিকই যাবে সঙ্গে। কিন্তু, আগামী প্রজন্মও কি বাঁশ খাবার আশায় দিন গুনবে নাকি একটা হ্যাঁচকা টান মেরে সব ছ্যাঁচড়াদের ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল ওষুধ খাওয়াবে সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি।