ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

টঙ্গী থেকে প্রতিদিনই ঢাকায় এসে অফিস করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বাই রোডের পরিবর্তে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে রেলপথই আমার বেশ প্রিয়। মাঝে মধ্যে অবশ্য অলসতার বশে সময় মেলাতে পারি না। রেলস্টেশনে গিয়ে অসহায়ের মতো তুরাগ এক্সপ্রেসের চলে যাওয়া দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। একটুর জন্য ট্রেন মিস করার পর নিজেকে মনে মনে অনেক শাসাই। কেন তুই দেরি করে বের হলি? আরেকটু আগে বের হলে কি খুব কষ্ট হত? সময় জ্ঞান তোর কখনো হবে না। কি আছে ভবিষ্যতে…। এমন নানান অভিযোগ অনুযোগ নিজের প্রতি নিজের। তখন ন্যায় বোধের তোপের মুখে চুপসে যাওয়া অন্যায় বোধের মলিন মুখ দেখতে হয়।

যা হোক, আজ (সোমবার) দেরি হয়নি। সময় মতোই উপস্থিত ছিলাম টঙ্গী জংশনে। কিন্তু ট্রেন আসেনি সময় মতো। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। বাংলাদেশে ট্রেনের সময়সূচির ব্যাপারে সবারই কম বেশি ধারণা রয়েছে। সকাল ১০টার ট্রেন স্টেশন থেকে ১২টায় ছাড়লেও এখন আর যাত্রীরা খুব বেশি অবাক হন না। নির্ধারিত সময়ের বেশ আগ থেকেই প্লাটফর্মে উপস্থিত থাকতেও কোন আপত্তি নেই মানুষের। ঘন্টার পর ঘন্টা প্লাটফর্মের বসে কাটানোর মনোভাব নিয়েই রেলপথে গন্তব্যে যাত্রার সিদ্ধান্ত স্থির করেন। তবে সময়ের এ সমস্যাটা শুধু বাংলাদেশেই নয়; পার্শ্ববর্তী বন্ধু দেশ ভারতেও। বছর দুয়েক আগে বাবা-মাসহ ভারতে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল দর্শণীয় কিছু স্থান ঘুরে দেখা। আমার মায়ের খুব সখ ছিল আজমীরে হযরত খাজা মঈনউদ্দিন চিশতী (রহ:) এর সমাধিস্থল জিয়ারত করা। আমারও ইচ্ছে ছিল মমতাজ মহলের প্রেমের স্মৃতিসরূপ সম্রাট শাহজাহান নির্মিত শ্বেতপাথরের মহল দেখার। সব মিলিয়েই ভ্রমণে বের হওয়া।

ঢাকা থেকে বাই রোডে কলকাতা। সেখান থেকে ট্রেনে আজমীর। ট্রেনের নাম লালকেল্লা এক্সপ্রেস। ইন্ডিয়ানরা লালকিলা বলেই ডাকে। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল ভারতীয় সময় দুপুর ২ টা ৩০ মিনিট। কিন্তু সেই ট্রেন ততক্ষণে স্টেশনেই এসে পৌঁছেনি। আসলো ঠিক একঘন্টা পর বিকাল সাড়ে তিনটায়। ফের যাত্রী নিয়ে আজমীরের উদ্দেশ্যে যখন ছুটলো তখন ঘড়ির কাটা ৪টার ঘরে। তার মানে পাক্কা দেড় ঘন্টা লেট। এ জন্য অনেকে মশকরা করে বলে ‘ও দাদা ১২টার ট্রেন ক’টায় বলতে পারেন?’

দীর্ঘ এ ফিরিস্তি পড়ে পাঠক হয়তো এতোক্ষণে বুঝে গেছেন দেশের রেল যোগাযোগের বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি। ঠিক তাই। তবে খুব বেশি কিছু না। বিড়াল কিংবা ইঁদুর প্রসঙ্গ এখানে মোটেও তুলবো না বলে ঠিক করেছি। কারণ ধেড়ে ইঁদুর আর কালো বিড়ালের উৎপাত হাজার বললেও দূর হবে না। এটা জনগণের কাছে স্পষ্ট। ঘুষের টাকার ঝোল মোছে লেগে থাকার পরও বিড়াল ‘আমি মাছ খাইনি’ বলে দিব্যি নিজেকে নির্দোষ দাবি করছে। আর আমরাও ধূর্তো বিড়ালের টোপ গিলছি (!)। বিড়ালটাও কেমন মেও মেও করে গলা দিয়ে পা ঘসতে শুরু করেছে। আর আমরাও শুরশুরি পেয়ে শুটকির দোকানে সেই বিড়াল চকিদারকেই… (!)। তাই সব ভেবে বিড়াল প্রসঙ্গ বাদ দিয়েছি।

ইঁদুর বিড়াল যাই থাক; এ কথা অনস্বিকার্য যে ট্রেনই একমাত্র যান যাতে চড়ে একটু হলেও স্বত্ত্বিতে গন্তব্যে পৌঁছা যায়। যানজটে পড়ে নাকাল হওয়ার হাত থেকে রক্ষা মেলে। এওবা কম কিসে। এসব কারণে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ট্রেনের জনপ্রিয়তা এখনো তুঙ্গে। তাই সরকারের উচিত যানজটের বিস্ফোরণের হাত থেকে ঢাকা ও এর আশ পাশের এলাকার বাসিন্দাদের বাঁচাতে রেলযোগাযোগকে আরো উন্নত করে তোলা। রাজধানী ও এর আশপাশের মানুষের জন্য বিশেষ শাটল ট্রেন চালু ব্যপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যানজট নিরসনে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর আওতায় ঢাকাবাসীর জন্য বিশেষ ট্রেন চালুর কথাও কয়েকবার বলেছে। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে উন্নয়নের ভাষণ আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ততই বাড়ছে।

মহাজোট সরকার যানজট নিরসনে এ যাবৎকালে যত পদক্ষেপ নিয়েছে তার অধিকাংশেরই সুফল পেতে সময় লাগবে। বললেই তো আর রাতারাতি ফ্লাইওভার দিয়ে ঢাকাকে ঢেকে দেয়া যাবে না। এজন্য সময় লাগবে। মেট্রোরেল পথের জন্য স্থান নির্ধারণও সময়ের ব্যাপার। ওদিকে এলিভেটর এক্সপ্রেস নিয়েও ঠেলাঠেলি চলছে। সব দিক বিবেচনায় এ মুহূর্তে যানজটের বেড়াজাল থেকে নগরবাসীকে রেহাই দিতে রেললাইন ছাড়া সরকারের সামনে আর গতি নেই। সমস্যা সমাধানে যতদ্রুত সম্ভব ওই রেললাইনেই ‘মাথা’ দিতে হবে।

যাক বাবা। সরকারকে রেললাইনে ‘মাথা’ দেয়ার কথা শুনে চটে গেলেন? থামুন মশাই; চটবেন না। আগে তো বুঝতে চেষ্টা করুন আমি কী বলতে চাচ্ছি। আমি বলতে চাচ্ছি, যানজট নিরসনে সরকারের উচিত রেলপথ নিয়ে আরো মাথা খাটানো। যাতায়াতের এ মাধ্যমকে আরো কার্যকর করতে যতদ্রুত সম্ভব ফলপ্রসু সিদ্ধান্ত নেয়া। কম সময়ের মধ্যে যানজট নিরসনে এছাড়া বিকল্প আর পথ নেই বললেই চলে। নগরবাসীর তরফে সরকারের কাছে অনুরোধ ঢাকার মধ্যে শাটল ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করুন। এতে জনগণ সরকার উভয়েরই মঙ্গল হবে।

ও, আমি যে লালকিলায় চড়ে আজমীরে ছুঁটলাম তার তো ইতি টানতে হবে। দেড় ঘন্টা দেরিতে রওয়ানা দেওয়া ট্রেনটি ক’দিন পর আজমীরে পৌঁছলো তা শুনবেন না? টানা ৪৮ ঘন্টা পর লালকিলা এক্সপ্রেস পৌঁছলো আজমীর রেলস্টেশনে। প্রায় দেড় দিন দুই রাত নাওয়া খাওয়া ওই ট্রেনে। কলকাতা থেকে আজমিরের দূরত্ব প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার। কিন্তু তাই বলে এতো সময়? কারণ আছে, ওই যে কবি শামসুর রহমানে কবিতা- ‘একটু জিরোয়, ফের ছুটে যায়/মাঠ পেরুলেই বন’। ঠিক তাই। কলকাতা থেকে আজমীরের মাঝে এমন কোন স্টপেজ নেই, যেখানে একটু জিরোয়নি লালকিলা। ভাবছেন মেইল ট্রেনে এমনটি তো হবেই। মোটেও না। কলকাতা থেকে আজমীর যেতে হলে আপনাকে এ ট্রেনেই চড়ে বসতে হবে। উপায় নেই। এ একটিই ট্রেন ওই পথে। তাও সপ্তায় দু দিন। এ রকম রেলভ্রমণের সাক্ষী আমাকে আর কখনও হতে হবে কি না জানি না। তবে ওই ভ্রমণ থেকে এটা বোঝা হয়ে গেছে ইন্ডিয়ানরা জাতি হিসেবে অনেক ধৈর্য্যশীল। তা না হলে ট্রেনে এতো লম্বাজার্নি মেনে নেয়া কষ্টসাধ্যই বটে।