ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

আশুলিয়ায় এক পোশাক শ্রমিককে পেটাচ্ছে পুলিশ। ছবি : মেহরাজ

পোশাক শিল্পের আকাশের কালো মেঘ দিন দিন ঘনিভূত হচ্ছে। শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের মাত্রাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে নসাৎ করতে অহেতুক নেয়া হচ্ছে পুলিশি অ্যাকশন। অথচ লাঠির জোরে এ আন্দোলন মোকাবেলা না করে বৈঠকের মাধ্যমে সুশৃঙ্খলভাবে মালিক-শ্রমিক উভয়পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছতে পারতেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের অনড় ভূমিকা সমস্যাকে আরো কঠিন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসব ঘটনা দেখে এ কথা প্রতিয়মান যে, দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় নিয়ে যেতে এ শিল্পকে ধ্বংসের পায়তারা চলছে। এবং যতদ্রুত সম্ভব এ অপচেষ্টা রুখতে হবে। তবে শ্রমিকদের সন্তুষ্টি এ ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে।

মালিক পক্ষ কেন বুঝতে চান না যে, শ্রমিকরাই উৎপাদানের মূল চাবি কাঠি। তাদের ঘামের বিনিময়ে সচল থাকে অর্থনীতির চাকা। তাই এসব খেটে খাওয়া মানবসম্পদের নূন্যতম জীবন মান নিশ্চিতের দায়িত্ব তো মালিক পক্ষেরই। দূরমূল্যের এ বাজারে জীবন যাপনে নিম্নমধ্যবিত্তদের যে কতটাকা হিমশিম খেতে হয় তা অনুমান করতে আশপাশে চোখ রাখলেই হয়। মালিক পক্ষ কবে যে শ্রমিকদের আপন ভেবে নিতে পারবেন কে জানে। কিন্তু পোশাক শিল্প বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়ে শ্রমিকদের আপন হওয়া যাবে না।

পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্রমিকরা দুর্ভোগে পড়বেন। এ কথা ঠিক। কিন্তু তাই বলে মালিকদের অবস্থা কি কোন পরিবর্তন হবে না? আর দেশের অর্থনীতি? কারখানা বন্ধ করে দেয়ার ভয়-ভীতি দেখানোর আগে বাস্তবতা একটু ভেবে দেখবেন কি মালিক পক্ষ?

একবারও কি ভেবে দেখেছেন, শ্রমিকরা আন্দোলনে নামলে যে ধরনের পুলিশি নির্যাতন চালানো হয় তা কতটা নির্মম। সময়ের অতিরিক্ত কাজ করে ক্লান্ত ওই শরীরে মোটা রোলারের তীব্র আঘাত কতটা যন্ত্রণার তা ওই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে অনুমান করা একটু কষ্টই বটে।

এক শ্রমিককে আটক করে পেটাচ্ছে পুলিশ। ছবি : মেহরাজ

খাবারের টেবিলে হরেক রকমের মৌসুমি ফল দেখে মালিক পক্ষ হয়তো ভাবেন দেশের সবাই হয়তো সুখে আছে। একবারও কি ভেবে দেখেছেন, তার প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৮ টাকার শ্রমিকটি তার খাদ্যের চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারছেন কি না? বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু খেতে হয় তাও যে এসব সেলাই দিদি মনি ও ভাইদের কপালে জোটে না তা নিয়ে চিন্তা করার সময় তো শিল্পপতিদের নেই।

সারা রাত পার্টি করে ভোরে শিল্পপতি যখন বিছানায় শরীর এলিয়ে দেন তখন তার কাছে মনে হয় দেশের সবাই মহানন্দে হাবুডুবু খাচ্ছে। কাজ থেকে ফিরে রাতের খাবার তৈরি করে মাঝ রাতে বিছানায় যাওয়া শ্রমিক ভাই/বোনটিকে আবার সূর্য জাগার আগেই যে বিছানা ছাড়তে হয় তা কল্পনা করার সময় শিল্প মালিকদের নেই।

তাদের সময় আছে, থানায় ফোনের ওপর ফোন করে দফায় দফায় দাঙ্গা পুলিশ পাঠিয়ে অধিকার আদায়ের হাক তোলা শ্রমিকদের লাঠিপেটা করার হুকুম দেয়া। যে মানুষগুলোর ঘামে আজ সে শিল্পপতি সে মানুষগুলোকে মানুষ ভাবতে বড় কষ্ট হয় তাদের।

ন্যায অধিকার আদায়ের আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকরা। ছবি : মেহরাজ

শ্রমিকরা মালিকদের চোখে অমানুষ। রক্তে মাংসে গড়া তাদেরও যে একটা দেহ আছে তা মানতে নারাজ মালিক পক্ষ। এসব কারণেই মালিক আর শ্রমিকে দা-কুমড়া সম্পর্ক। এটা নতুন নয়; শিল্প সৃষ্টির গোড়া থেকেই এমনটি হচ্ছে। এ ধরণের শিল্প বিরোধী মনোভাবের খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে মালিক পক্ষ কখনই শ্রমিকদের দু:খ কষ্ট বুঝতে পারবেন না। শ্রমিকরাও বিশ্বাস করবে না মালিকদের কোন আশ্বাস।

মালিক পক্ষের হয়তো কখনও আমার এ লেখা পড়ার সময় হবে না। তা জেনেও বলছি-দয়া করে শ্রমিকদের প্রতি সদয় হোন। শ্রমিকদের মূল্যায়ন করতে শিখুন। শ্রমিকরা নির্যাতন চান না। চান ঘামের মূল্য। তাদের ন্যায্য প্রাপ্য দিন। শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্য দিলে সম্পদ কমবে না। বরং বাড়বে। শ্রমিকরা খুশি থাকলে উৎপাদনের মুখেও হাসি ফুটবে। এগিয়ে যাবে শিল্প, শিল্পপতি ও দেশের অর্খনীতি।