ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

‘কাকের মাংস নাকি খায় না কাকে, উল্লুক খায় নাকো ভল্লুক; মানুষের মাংস মজা করে খায় মানুষ নামের কিছু উল্লুক।’ রম্য সংগীতে জনপ্রিয় শিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাসের গানের এ লাইনটি শুনতে বেমানান হলেও আদতে এটাই সত্য। পশু-পাখির মধ্যেও স্বজাতির জন্য মায়া-মমতা থাকলেও সৃষ্টির সেরা মানুষের মধ্যে তা নেই। মানুষের মায়া-মমতা, ভালবাসা সবকিছুর পেছনেই কোন না কোন স্বার্থ লুকিয়ে থাকে। হতে পারে তা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ।

হামলায় অংশ নেন মাহমুদুর রহমান, কেরামত উল্লাহ বিপ্লব, জ ই মামুন ও শওকত মিল্টন/ ছবি: একেএম মহসীন, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ঘটনাটি কারো অজানা নয়। সাংবাদিকরা তো বটেই; এর বাইরেও অনেকে গণামধ্যমের কল্যাণে এ সম্পর্কে জানেন। তবুও মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছি- গত ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহরুন রুনি। এ ঘট্নার পর থেকে আজ অবধি হত্যার বিচার চেয়ে রাজপথে সরব গোটা সাংবাদিক সমাজ। শুধু সাংবাদিকরাই নয় ব্লগ, ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়রাও সাগর-রুনি হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে। সেই সুবাদে, পত্রিকার পাতা, ব্লগ, ফেসবুকের ওয়ালের পাশাপাশি রাজপথেও চলছে সক্রিয় আন্দোলন কর্মসূচি। তাদের সবারই দাবি হত্যার বিচার। সেই সঙ্গে, সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসা অশনি সংকেতের বিদায় ঘন্টা বাজানো। দলমত নির্বিশেষে অভিন্ন দাবিতে এক হয়েছে গোটা সাংবাদিক সমাজ। কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা কোন নীল নকশা বাস্তবায়ন-এ আন্দোলনের এজেন্ডা নয়।

নিয়মিত আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হিসেবে রোববার ছিল সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সমাবেশ। বেলা ১২টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে পূর্বঘোষিত এ সমাবেশ শুরু হয়। এতে অংশ নেয় সমাবেশে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাংবাদিক নেতারা।

সমাবেশের শুরুতেই ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা জাহাঙ্গীর আলম প্রধান বলেন, “সাংবাদিক সাগর-রুনির মৃত্যুর জন্য এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান দায়ী। তার কার্যালয় ঘেরাও করার কর্মসূচি ঘোষণা করার দাবি জানাচ্ছি।”

তার বক্তব্য শেষ করার পর এটিএন বাংলার বিশেষ প্রতিনিধি শওকত মিল্টন তেড়ে গিয়ে বলেন, “কর্মসূচি ঘোষণা করার আপনি কে?” এ সময় মিল্টন ও এটিএন বাংলার অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের হাতাহাতি হয়। জাহাঙ্গীর আলমকে প্রেসক্লাবের সামনে থেকে শার্টের কলার ধরে মারতে মারতে ভেতরে নিয়ে এটিএন বাংলার বিশেষ প্রতিনিধি শওকত মিল্টন। এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীর দৌঁড়ে প্রেসক্লাবের ভেতরে চলে যেতে চাইলে ধাওয়া করে তার ওপর চড়াও হন এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ জ ই মামুন, প্রধান বার্তা সম্পাদক ভানু রঞ্জন চক্রবর্তী, বিশেষ প্রতিনিধি মাহমুদুর রহমান, কেরামত উল্লাহ বিপ্লব ও মানস ঘোষ এবং আরেক রিপোর্টার রাহাত মিনহাজ। (দেশের বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে আসা সংবাদটির অংশ বিশেষ তুলে ধরা হলো।)

কখনও ভাবতেও পারিনি সাংবাদিকরা এমন (অমানুষ) হতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার (?) এমন আদর্শের সৈনিকরা কখনো অপর সৈনিক ভাইয়ের বুকে বন্দুক ধরতে পারে তা কল্পনাতেও আসেনি। কিন্তু সাংবাদিক (?) সমাজে জায়গা করে নেয়া মিল্টন, মামুন, ভানু রঞ্জন মাহমুদুর রহমান, বিপ্লব, মানস ঘোষ মিনহাজরা তা করে দেখালেন। নিজের স্বার্থ হাচিলের জন্য সাংবাদিক (?) হয়ে অপর সাংবাদিক ভাইয়ের ওপর হাত তুললেন। তাও আবার অন্যায়ভাবে। সংবাদটি পড়ার পর নকুল কুমার বিশ্বাসের সেই গানের কথাগুলোকে সত্যি বলে মনে হলো। পশু-পাখিরা স্বজাতিয় পশুর মৃতদেহ ভক্ষণ না করলেও সাংবাদিক হয়ে সাংবাদিকের (সাগর-রুনির) রক্ত-মাংসের ওপর দাঁড়িয়ে বিরুদ্ধাচারণ করলেন। স্বীকৃতি (!) দিলেন নিহত সাংবাদিক দম্পতির মৃত্যুকে। জেনে শুনে মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করলেন। ইচ্ছে করছিল, এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজের লেলিয়ে দেয়া ক্যাডারগুলোকে…। কিন্তু সাধ্যের বাইরে হওয়ায় ক্রোধ কিছুটা নিবারণের জন্যই কি-বোর্ডটাতে ঠকাস-ঠকাস ছন্দ তুলতে বাধ্য হলাম।

জ ই মামুন আর শওকত মিল্টনদের সাহসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া আচরণ (!) দেখে মনে হচ্ছে তারা সাংবাদিকতার খোলস পড়ে মাহফুজুর রহমানের গোলাম হয়ে গেছেন। অন্যায়কারীর বিরুদ্ধাচারণ নয় (অভিযুক্ত) মাহফুজের দাসত্বকে ব্রত হিসেবে নিয়েছেন তারা। নিজেদের অজান্তেই বনে গেছেন-মাহফুজ কা গোলাম।

এসব সাংবাদিকরূপী পা চাটা গোলামগুলোর উদ্দেশে-মেহরুন রুনি তো আপনাদেরই সহকর্মী ছিলেন তাই না? আপনাদের সঙ্গেই কেটেছে তার কর্মজীবনের একটি বড় অংশ। এক সঙ্গে পথ চলেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। মানবতার কল্যাণে। কিন্তু আজ কিভাবে সাগর-রুনি হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার কণ্ঠগুলোর গলা চেপে ধরলেন? একবারও কি বিবেকে বাধলো না? সাংবাদিকতা পেশায় এসে একনিষ্ঠ চাকরের মতো আচরণ করলেন?

কদিন আগেও হত্যাকারীর বিচারের দাবি তোলা বলিষ্ঠ কণ্ঠ জ ই মামুন চাকরি (চাকরগিরি) হারানোর ভয়ে পরাজিত হলেন কুলাঙ্গার মাহফুজের কাছে (!)? গত ৫ জুন সাংবাদিকদের এক সমাবেশে আপনিই তো বলেছিলেন- ‘সাংবাদিক রুনি হত্যার বিষয়ে মাহফুজুর রহমানের বক্তব্য অরুচিকর। এই (মাহফুজের) বক্তব্যের সঙ্গে এটিএন বাংলার সাংবাদিকদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ দিন কুড়ির ব্যবধানে বোল পাল্টে ফেলেছেন মামুন সাহেব? বাহ্! কি অপূর্ব প্রভু ভক্ত (কুত্তার) আচরণ। হুজুরের সুমর্জি পেতে অতীত মন্তব্যের জন্য পা ধরে ক্ষমা চেয়েছেন নিশ্চয়ই? চাকরিটা বড়ই দরকার যে আপনার, তাই না? আপনি তো আপনার চাকরগিরি বহাল তবিয়তে রাখতে ঠিকই দু’মুখো সাপ হয়ে গেলেন। কিন্তু যারা বলেছিলেন, মাহফুজুর রহমানের বক্তব্য সম্পর্কে মন্তব্য করায় জ ই মামুনের চাকরি গেলে এটিএন বাংলা বন্ধ করে দেয়া হবে- তাদের জন্য আপনি কি করলেন? আপনার পক্ষ নেয়ায় এবার যদি তাদের চাকরি যায় তবে এর দায়িত্ব নেবে কে মিস্টার মামুন?

মাত্র একদিন আগে (২৩ জুলাই) চলে গেলো পলাশী দিবস। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আমবাগানের যুদ্ধে স্বাধীন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়। সাজানো এ লড়াইয়ে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পেছনে ছিল রবার্ট ক্লাইভ, মীর জাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফচক্র। নবাবের আস্থাভাজন মীর জাফরের নিমক হারামির কারণে ২০০ বছর আগে বাংলার নবাবকে সিংহাসনচ্যুত হতে হয়েছি। পরবর্তীতে মীর জাফরের শেষটা কী নির্মম হয়েছিল তা আমাদের অজানা নয়। নবাবী আমলের মীর জাফর পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ে গেলেও এখনো তার উত্তরসূরিরা রয়ে গেছে। আর এসব মীর জাফরদের জন্যই হয়তো সুবিচারের পথ চেয়ে থাকা বাবা-মা হারা মেঘের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘায়িত হবে। মীর জাফররা আসে আবার চলে যায়। কিন্তু তাই বলে আন্দোলন কখনো থেকে থাকে না। একইভাবে সাগর-রুনি হত্যার বিচারের পথও কোনভাবেই রুদ্ধ করা যাবে না।

বরং মাহফুজীয় বাহিনী নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা করে এটাই পাকা-পোক্ত করেছেন যে, ডালমে কুচ কালাহে। মাহফুজুর রহমান যদি সাগর-রুনি হত্যার সঙ্গে জড়িত নাই থাকবেন তবে, বাহিনী পাঠিয়ে সাংবাদিক দমনের পায়তারা করবেন কেন? আর শওকত মিল্টন, জ ই মামুনরাই কেন মুহূর্তের মধ্যে খোলস পাল্টে ফেলবেন?

পাঠকদের জ্ঞাতার্থে : সম্প্রতি এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলে বসেন-“সাগর সরওয়ার ও মেহরুন রুনি পরকীয়ার বলি।’ শুধু তাই নয়-মাহফুজ দাবি করেন, তার কাছে হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত যথেষ্ঠ প্রমাণ রয়েছে। মাহফুজের এ বক্তব্যের জের ধরে সাংবাদিকরা খুঁজে পান হত্যাকারীর পায়ের ছাপ। দাবি তোলা হয়-মাহফুজুর রহমানকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের। কলম সৈনিকদের তীব্রদাবির মুখে দুদিন আগে র‌্যাবের তদন্তকারী একটি দল এটিএন বাংলা কার্যালয়ে গিয়ে একটি সিডি এবং কিছু ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে। এসময় তারা সমালোচিত মাহফুজকে ও এটিএন বাংলার সংবাদকর্মীদের সামান্য জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে জানা যায়। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীরা কোন নতুন তথ্য পেলেন কি না তা এখনও খোলাসা করা হয়নি।