ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ব্যক্তিত্ব

সদা হাস্যোজ্জ্বল ছিলো তার চেহারা। ছিলেন সদালাপীও। অনুজদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধের প্রমান পায়নি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া ভার। শুধু ব্যক্তি জীবনেই নয়; জাতীয় পর্যায়ে অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী তিনি। এতসব গুণ আর কৃত্বিত্বের অধিকারী জ্যোতিময় এ মানুষটি হচ্ছেন-দেশের ক্রীড়াঙ্গনের কিংবদন্তি আবদুল হামিদ। ক্রীড়াঙ্গন ও সাংবাদিক সমাজে তিনি ছিলেন সকলের প্রিয় হামিদ ভাই। সৃষ্টিকর্তার অমোঘ বিধানে ৪ আগস্ট শনিবার ভোরে পৃথিবীকে চিরবিদায় জানিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন সর্বজনপ্রিয় এ মানুষটি।

সুসজ্জিত স্টেডিয়াম কিংবা খেলার মাঠে নয়, ঘরে বসে রেডিওতে কান পেতে কিংবা টিভি পর্দায় চোখ রেখে যে খেলার সমান উত্তেজনা উপভোগ করা যায় এদেশের শ্রোতা ও দর্শকদের তা বুঝাতে পেরেছেন হামিদ ভাই। এজন্য তাকে ক্রীড়া ধারাভাষ্যের পুরোধা পুরুষ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অসম্ভব মেধাবী ও সদাচরণের অধিকারী এ মানুষটি এটুকুতেই থেমে থাকেন নি। ক্রীড়ার বিনোদনবোধকে লেখনীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াসেও হয়েছেন সফল। সুদীর্ঘ ৫৩ বছর ক্রীড়া সাংবাদিকতায় তাঁর অসামান্য অবদান তারই সাক্ষ্যবহন করে।

আমাদের সময় পত্রিকার অঙ্গ প্রতিষ্ঠান অনলাইন নিউজ পেপার ঢাকা টাইমসটোযেন্টিফোর ডটকমে প্রিয় হামিদ ভাইয়ের সঙ্গে অল্পদিন কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কাছ থেকে গুণী এ মানুষটি কিভাবে নিশর্ত ভালোবাসা সকলের মাঝে বিলিয়ে দিতেন তা দেখেছি। বয়সে তাঁর তিনভাগের একভাগ হলেও কখন দূরে ঠেলে দেননি সদা বিনয়ী হামিদ ভাই। সব সহকর্মীদের সঙ্গে মিশতেন আপন বড় ভাইয়ের মতো। আবেগ ও মমতা মাখা কণ্ঠে ভাই বলে সম্বোদন করতে সবাইকে। নারীসহকর্মীদের ডাকতেন বুবু বলে। অসাধারণ জাদু ছিলো তাঁর ডাকে। শুনে মনে হতো কতটা আপন করে নিতে পারলে মানুষ এমন করে ডাকতে পারে? কত মহান হৃদয়ের অধিকারী হলে সকলের তরে উজাড় করে দিতে পারেন অকৃত্রিম ভালোবাসা?

শনিবার দুপুরে চ্যানেল আইতে প্রচারিত সরাসরি এক অনুষ্ঠানে দেশের অন্যতম আরেক ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার চৌধুরী জাফরুল্লাহ শারাফাত শ্রদ্ধেয় হামিদ ভাইয়ের সম্পর্কে বলেন-‘চন্দ্র, সূর্যের এই পৃথিবীতে বাংলাদেশে আরেকজন আব্দুল হামিদ কখনও আসবেন না।’ হ্যাঁ, সত্যিই তাই। বাংলাদেশের ক্রীড়া জগতে আরেকজন আবদুল হামিদ কখনও আসবেন না। কিন্তু তার অসামান্য কৃতিত্ব তাকে অমর রাখবে দেশের ক্রীড়া ও সাংবাদিক অঙ্গনে।

পরিশেষে অচীনপুরবাসী প্রিয় হামিদভাইয়ের আত্মার শান্তি কামনা করছি। ভাল থাকুন প্রিয় হামিদ ভাই।

সংক্ষিপ্ত জীবনীতে আবদুল হামিদ (১৯৩৭-২০১২):

১৯৩৭ : পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপের নদীয়ায় জন্ম নেন দেশের ক্রীড়া আকাশের নক্ষত্র আবদুল হামিদ। শিক্ষা জীবনের শুরুতে তিনি ঢাকার গেণ্ডারিয়া স্কুলে লেখাপড়া করেন।
১৯৫১ : জগন্নাথ কলেজ থেকে গ্রেডুয়েশন শেষ করেন।
১৫৫৯ : তদানীন্তন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে যা বাংলাদেশ ব্যাংক হিসেবে পরিচিত।
জগন্নাথে পাড়ার সময় থেকেই ইস্ট এন্ড ক্লাবে খেলতেন আবদুল হামিদ।
১৯৫২ : ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের গোলকিপার হন তিনি। সুনাম অর্জন করেন বেশকিছু খেলায়।
১৯৫৫ : ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পক্ষে কলকাতার আই. এফ. এ শীল্ডে অংশ নেন।
১৯৫৫-৫৭ : তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভলিবল দলের জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৫৭ : পূর্ব পাকিস্তানের ফুটবল দলের প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৫৯ : দৈনিক আজাদে স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু। পরবর্তী সময়ে একই দৈনিকের ক্রীড়া সম্পাদক হন।
১৯৬৩ : সর্বপ্রথম রেডিওতে বাংলায় ধারাভাষ্য দেয়া এবং রেডিও ও টেলিভিশনের নিয়মিত ধারাভাষ্যকার হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৭০ : এশিয়ান গেমন হকি পাক-ইন্ডিয়ার প্রথম আন্তর্জাতিক ধারাভাষ্যকার হিসেবে যোগদান। এছাড়া বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ ৮ বছর।
১৯৬০ : মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন।
১৯৭৯ : ক্রীড়া ক্ষেত্রে অবদানের জন্য রাষ্টীয় পুরস্কার পান।
১৯৮৫ : কাজী মাহবুবুল্লাহ ও বেগম জেবুন্নেসা স্বর্ণপদক পান।
১৯৮৭ : উপ-পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অবসর নেন।
১৯৯০ : মোহামেডান ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের সম্মানসহ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ পান।
২০০১ : আল বারাকা ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবসর নেন।
২০০৩ : ক্রীড়া সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক পান।
গ্রন্থরচনা : ‘‌বাংলায় ধারাবিবরণী ও ধারাবিবরণীতে বাংলা’- নামে একটি বই লিখেছেন তিনি।

এছাড়াও আবদুল হামিদ এশিয়ান ভলিবল কনফেডারেশনের দুই দফা ডিরেক্টর ছিলেন। বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘ আট বছর। সেই সঙ্গে, তার হাত ধরেই যাত্রা হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির। তিনি দীর্ঘদিন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ফুটবল রেফারি এসোসিয়েশনের সদস্যও ছিলেন আবদুল হামিদ। ছিলেন অলিম্পিক সমিতিরও সদস্য। সাংবাদিকদের জাতীয় সংগঠন জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতির সদস্যও ছিলেন তিনি। দৈনিক আমাদের সময় ও ঢাকা টাইমসটোয়েন্টিফোর ডটকমের সূচনা লগ্ন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি পত্রিকা দুটির ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

২০১২ : বেশ কিছুদিন অসুস্থতায় ভোগার পর ৪ আগস্ট শনিবার ভোরে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী সাহেরা খাতুন, ছেলে আব্দুল কাইয়ুম রনক ও মেয়ে নাসিমা শায়রিন রুম্পাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

(জীবনী পারিবারিক সূত্রে পাওয়া)