ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ছুটি শেষে মাদ্রাসায় পড়তে এসেছিল ফেরদৌসি। কিন্তু কে জানতো পড়তে এসে মারাত্মক যখম নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে তাকে। জানলে হয়তো কচি শরীরে এমন যখমের যন্ত্রণাও সইতে হতো না তাকে।

দিনটি ছিল ১ মে। ঢাকার যাত্রাবাড়ির শ্যামপুর তালিমুল কোরআন মহিলা মাদ্রাসা। সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে এসেছে কোমলমতী কিছু শিশু। যাদের বয়স ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। নিষ্পাপ শিশুগুলো তখনও জানতো না কিছুক্ষণ পরেই তাদের জন্য পাশবিক নির্যাতন অপেক্ষা করছে।

মাদ্রাসার একমাত্র শিক্ষিকা জেসমিন আক্তার। মাদ্রাসার শিক্ষক মাসুদুর রহমানের স্ত্রী। ছাত্রীরা আপা বলেই সম্বোধন করতো জেসমিনকে। কিন্তু তারা কী জানতো তাদের সেই “ধার্মিক” আপাকেই দেখবে জালিমের ভূমিকায়।

দীর্ঘ ১০ দিন ছুটি ছিল মাদ্রাসা। ছুটির এই সময়টাতে কে কি করেছে খোঁজ নিচ্ছিলেন জেসমিন। এক পর্যায়ে জানতে চান ছুটির মধ্যে সবাই পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করেছে কি না। জেসমিনের প্রশ্নের জবাবে এতোটুকু মিথ্যা বলেনি ৬ বছর বয়সী শিশুরা। প্রশ্নের জবাবে উপস্থিত শিশুদের কয়েকজন সরল ও সহজভাবেই স্বীকার করে নিজের অপারগতাকে। খেলার ছলে কিংবা শারীরিক ক্লান্তিতে কাতর হয়ে কয়েক ওয়াক্ত নামায তারা আদায় করেনি। কিন্তু শিশুদের এই সরল স্বীকারোক্তির কোনই মূল্যই পায়নি ধর্মীয় লেবাসধারী জেসমিনের কাছে।

“নামায কাযা হয়েছে?” কি সাঙ্ঘাতিক। তোরা তো সবই জাহান্নামে যাবি। দাঁড়া আজ তোদের এমন শিক্ষা দেবো, সারাজীবন মনে রাখবি নামায কাযার শাস্তি কত ভয়ঙ্কর।” অত্যাচারী জেসমিনের অভিব্যক্তি ছিল অনেকটা এরকমই। ততক্ষণে কোমলমতি শিশুদের বদনে নেমে এসেছে মলিনতা। শাস্তির কথা শুনতেই কবুতরের ছানার মতো জড়োসড়ো হয়ে গেল নিষ্পাপ মুখগুলো। কারো কারো চোখের কোনে অশ্রুও জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। কী ভয়ঙ্কর শাস্তি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য! সর্বোচ্চ কয়েক ঘা বেতের বাড়ি। কিংবা কান ধরে উঠ-বোস করা। এটাই হয়তো ভয়ঙ্কর শাস্তি। অজানা ভাবনায় বারবার হারিয়ে যাচ্ছিল শিশুরা। কিন্তু তারা হয়তো জানতো না “আপা” রূপী ওই পিচাশিনী ওদের জন্য কি ভয়ঙ্কর শাস্তির আয়োজন করছে।

মিনিট কয়েকবাদে ক্লাসরুমে এসে হাজির হন নির্দয় “আপা”। হাতে তার আগুনে তাতানো খুন্তি (রান্নার কাজে ব্যবহৃত)। অঝরে কান্না শুরু করে শিশুরা। কিন্তু তাদের এ কান্না এতোটুকু মায়া জাগিয়ে তুলতে পারেনি নিষ্ঠুর জেসমিনের হৃদয়ে। মাতৃত্ব বলতে নারীর যে বিশেষ মমতা তাও যেন তার হৃদয় থেকে মুছে গেছে অনেক আগে। ক্রোধের বহি:প্রকাশ ঘটায় ছোট্ট শিশুগুলোর তুলতুলে দেহে গরম খুন্তির ছ্যাঁক দিয়ে। একজন নয়, দু’জন নয়, একে একে ১৪টি শিশুর দেহে মারাত্মক যখম করে দেয় অসভ্য জেসমিন। শিশুদের গগণ বিদারী আর্তনাদে আশপাশ থেকে ছুটে আসে মানুষ। উদ্ধার করে নিষ্ঠুরতার শিকার কোমলমতি শিশুগুলোকে। ততক্ষণে পালিয়ে গেছে মানুষ রূপী জালিম জেসমিন। তার স্বামী মাসুদুর রহমান গা ঢাকা দেয় আইনের চোখ এড়াতে।
শিশুদের দেহে অযাচিত ক্ষত দেখে রীতিমতো ঘাবড়ে যান ছুটে আসা মানুষগুলো। কি যন্ত্রণা হতে পারে ভাবা যায়! জলজ্যান্ত মানুষের দেহকে আগুন দিয়ে দগ্ধ করে দেয়া একি স্বাভাবিক কোন মানুষের কাজ! পাষবিকতার চরমে পৌঁছলেই মূলত এমনটি সম্ভব। শিশুদের কান্না দেখে নিজেদের সামলে রাখতে পারছিলেন না উদ্ধার করতে আশা মানুষগুলো।

এ ঘটনায় ওই মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থীর বাবা জেসমিনের নামে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেন। তারপর কেটে গেছে ৬টি দিন। কিন্তু সন্ধান মেলেনি আত্যাচারিনীর। কিংবা তার স্বামীর। অবশেষে মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নির্দয় জেসমিনকে। সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রীদের ‘দোযখের আগুনে’র ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা দিতে জেসমিন এ ধরণের অমানবিক জঘন্য ঘটনা ঘটায়। যা সম্পূর্ণ ধর্মের নামে অধর্ম চর্চার শামিল। জেসমিনের মতো এ অমানুষগুলো ধর্ম সম্পর্কে ভালো করে না জেনেই, না বুঝেই আমাদের চারপাশে নানা অপকর্ম করছে। যাদেরকে ধার্মিক বলে ধর্মকে অপমান করা হচ্ছে। অথচ তারা ধার্মিক নয়, কপটচারী কট্টর। কেন বলছি কট্টর তার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করছি।

ইসলাম শান্তির ধর্ম। এ ধর্মে শিশুদের ওপর ধর্ম প্রয়োগের নামে এমন জুলুমের কোন অস্তিত্ব নেই। যাত্রাবাড়ি মাদ্রাসার ঘটনা জানাজানির পর ইসলাম ধর্মের কিছু বিধি-বিধান জানার চেষ্টা করি। বিশেষ করে নামাযের বিষয়ে ইসলামের নীতিমালাগুলো পাঠোদ্ধারের চেষ্টা চালাই। তা থেকে যতটুকু জানলাম তা হচ্ছে- মুসলমানদের সন্তানের বয়স ৭ বছর হলে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী তাকে নামায শিক্ষা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এবং দশ বছর বয়স পূর্ণ হলে নামায পড়তে বাধ্য করার জন্য পিতা-মাতার প্রতি নির্দেশনা রয়েছে। নামাযের ব্যাপারে পিতা-মাতার নির্দেশ অমান্য করলে সাময়িক শাসনের বিধানও দেয়া হয়েছে মহান ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআনে। কিন্তু তাই বলে এমন পৈচাশিক শাস্তির বিধান কোথাও নেই। এখানে উল্লেখ্য যে, ইসলামি বিধান মোতাবেক নামায শিক্ষাদানের ব্যাপারে সন্তানের বয়স ৭ বছরের কথা বলা হয়েছে। অথচ যাত্রাবাড়ির ওই মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছে সেখানে ৭ বছরের কম বয়সী শিশুরাও ছিল।

শিশুদের নামাযের ব্যাপারে বাধ্য করতে ইসলামি বিধানে যা বলা আছে তা তুলে ধরা হলো- ” রাসুল (সা.) বলেছেন, বাচ্চা যখন সাত বছরে পদার্পণ করে তখন তাকে নামায পড়তে আদেশ কর। আর দশ বছরে পদার্পণ করলে নামায না পড়ার দরুন (মৃদু) প্রহার কর। (আবু দাউদ)”

অন্য বর্ণনায় আছে: তার বিছানা পৃথক করে দাও। ইমাম আবু সুলায়মান খাত্তাবী (রহ.) বলেন, এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, বাচ্চা নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে নামায না পড়লে, তার জন্য হালকা শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

অন্যদিকে আল-কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামি গবেষকরা যা বলছেন তা হচ্ছে-“পবিত্র কোরআনের ৮২ বার নামাযের কথা বলা হয়েছে। সন্তানদের বয়স যখন ৭ বছর হয় তখন নামায শিক্ষা দেয়া এবং দশ বছর বয়সে নামায পড়তে বাধ্য করার জন্য পিতা-মাতার প্রতি নির্দেশ রয়েছে। নামায ফরয হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তা অবশ্য পালনীয়।”(সূত্র : নামাজের উদ্দেশ্য ও মর্মকথা, লেখক : সদরুল আমীন রাশেদ। দৈনিক ইত্তেফাক, জানুয়ারি ১৪, ২০১১, শুক্রবার)

উপরে উল্লেখিত তথ্যাদি থেকে একথাই প্রতিয়মান হয় যে, ইসলামকে না জেনে না বুঝে আমাদের আশপাশের অনেক মানুষ ধর্মের নামে মিথ্যাচার করে সামাজের অন্যান্যদের কোন ঠাঁসা করে রাখছে। ধর্মকে পুঁজি করে নিজের ফায়দা লুটছে। বর্বরতা চালাচ্ছে সমাজের নিরীহদের ওপর। বাদ পড়ছেনা কোমলমতি শিশুরাও। শুধু যাত্রাবাড়ির ওই মহিলা মাদ্রাসাই নয়, অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেই চলছে অমানবিক পৈচাশিক নির্যাতন। সরকার যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতন বন্ধে তৎপর, তখন জেসমিনদের মতো অমানুষগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে চালিয়ে যাচ্ছে বর্বরতা। সৃষ্টি করছে নিষ্ঠুরতার নতুন নতুন উদাহরণ।

অত্যাচারিনী জেসমিনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। সেই সঙ্গে, জনসম্মুখে তা প্রচারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এ দাবি আমার নয়, একরাশ ফুটন্ত ফুলের। যাদের দেহ আজ ক্ষত-বিক্ষত আগুনের লেলিহান শিখায়।