ক্যাটেগরিঃ ব্লগ সংকলন: সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, রাজনীতি

এক.
খ্রিষ্টীয় পয়লা শতাব্দীতে পশ্চিমা সভ্যতায় রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কেন্দ্রস্থল হওয়ায় রোম ছিল রাজধানী শহর। শিল্প-স্থাপত্যের জন্যও বিখ্যাত ছিল প্রাচীন এ নগরটি। কিন্তু শিল্প ঐতিহ্যে ভরপুর এ শহরটি যখন আগুনে পুড়ে ছারখার হচ্ছিল তখন রোমান সম্রাট নিরো মনের খুশিতে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। এটা ৬৪ খ্রিস্টাব্দের কথা। রোম ও সম্রাট নিরোর এ গল্পটি পাঠকদের কাছে নতুন করে বর্ণনা দেয়ার কিছু নেই। শুধু মনে করিয়ে দেয়ার জন্য কিছুটা সূত্রপাত করছি। সম্রাট নিরো তার নিজের সৈন্য-সামন্ত দিয়েই রোম নগরীতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই তিনি এমনটি করেছিলেন। একটি হচ্ছে সম্রাটের রাজপ্রাসাদ তৈরির জন্য বিস্তৃত জায়গা খালি করা। অন্যটি হচ্ছে রোমের প্রতিবাদী নাগরিকদের মূলোৎপাটন।

এতো গেল প্রায় দু’হাজার বছর আগের ঘটনা। এবার ফেরা যাক একবিংশ শতকে। খুব দূরে নয় চলুন সম্প্রতি একটি ঘটনার দিকে ফিরে তাকাই। সিরিয়ার বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। দেশটির হাজারো মানুষের কাছে যিনি “স্বৈরাচারী” শাসক হিসেবে পরিচিত। স্বৈরাচার শাসকের হাত থেকে রক্ষা পেতে সিরিয়ার মানুষ বিক্ষোভ করেছে। রাজপথে নেমেছে। প্রাণ দিয়েছে। শাসক গোষ্ঠীর সৈনিকদের বুলেট-বোমায় ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে বিক্ষোভকারীদের বুক। গোটা সিরিয়া যখন অগ্নিগর্ভ, শত শত নিরীহ মানুষ প্রাণ দিচ্ছে তখন, প্রেসিডেন্ট বাশার মজেছে অবৈধ প্রণয়ে! বাসারের ইমেল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে মিলেছিল অদ্ভূত ওই ভালবাসার কথা। এক মহিলা প্রথমে তাঁর অর্ধ নগ্ন ছবি পাঠান বাশারকে। ৪৬ বছরের বাশার সেই ছবি পাওয়ার পর লেখেন ‘থ্যাংক ইউ’। জবাবে সেই মহিলা লেখেন ‘আই লাভ ইউ’। এইভাবেই বিবাহিত বাশারকে একের পর এক ই-মেইল পাঠাতে থাকেন সেই মহিলা। বাশারও জবাব দিতে থাকেন সেগুলোর।
ঘটনা দু’টির মধ্যে দু’ হাজার বছরের ফারাক থাকলেও খ্রিস্টাব্দ ৬৪ সালের অত্যাচারী সম্রাট নিরো এখনও আছেন এই পৃথিবীতে। তবে বদলেছে তাদের অত্যাচারের কৌশল। মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের অট্টহাসির আওয়াজ আজও কানে ভেসে আসে।

দুই.
৯ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিট পরিদর্শনে গিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। সেখানে তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন গণমাধ্যমকর্মীদের। ব্যাস, মাননীয় মন্ত্রী হয়ে গেলেন ইতিহাসের সাক্ষী। অকপটে নিজেই বাজালেন নিজের ঢোল। গাইলেন গুণকীর্তন। অবাক করার মতো ঘটনা। মিডিয়ার সামনে নিজেই নিজেকে দাবি করে বসলেন “আমি সফল”। মন্ত্রীর এ কথা শোনার পর উপস্থিত সাংবাদিকরা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন তার প্রতি- “সাগর-রুনির হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে না পারা, ইলিয়াস আলীর সন্ধান না পাওয়া- এসব বিষয়ের পরও কি আপনি নিজেকে সফল বলে দাবি করবেন? জবাবে সাহারা খাতুন নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দৃঢতার সঙ্গে দাবি করলেন, “আমি অবশ্যই সফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো। আমরা রাতদিন কাজ করে যাচ্ছি। আমি ব্যর্থ হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন হতো না। দেশে এতো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চললেও আমরা কী করে টিকে আছি? শুধু আমি না, আমাদের সরকার সফল।”

মন্ত্রীর উত্তরে হতবাক গণমাধ্যমকর্মীরা। নির্বাক জাতি। খবরের পাতায় “ব্যর্থ” মন্ত্রীর এমন দম্ভোক্তির পর ভাষা হারিয়ে ফেলা ছাড়া কী আর করার আছে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের বেঁচে থাকার নিরাপত্তা যখন আইসিইউতে মৃত্যুশয্যায় কাতরাচ্ছে। গুম, গুপ্তহত্যা, খুন, অঙ্গহানি ইত্যাদি আতঙ্ক বিরাজ করছে সর্বত্র। যখন বিচারের বাণী নিরবে কাঁদছে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তার ধারক-বাহকরা নিজেদের “সফল” বলে দাবি করছেন লোকসম্মুখে! জেনে বুঝেও পায়ে ঠেলছেন সব ব্যর্থতাকে। জনগণের চোখে ধুলো দিয়ে পার পেতে চাইছেন?

নিজ ঘরে ঘাতকের হাতে খুন হওয়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির অবুঝ সন্তান মেঘের কান্নার আওয়াজ কী পৌঁছায় না তাদের কানে? তারা শুনতে পান না সহকর্মী হারানোদের আর্তনাদ? শুনতে পান না গণমাধ্যমের ওপর অশনি সংকেত? গত ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে ঢাকায় পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন সাগর ও রুনি দম্পতি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হত্যাকারীদের ধরতে ৪৮ ঘন্টা সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পর কেটে গেছে ৩ মাস। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৪৮ ঘন্টা এখনও শেষ হয়নি! এর মাঝে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলা তদন্তে ডিবিকে “ব্যর্থ” বলে আখ্যায়িত করেছে দেশের উচ্চ আদালত। মামলার ভার এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর আরেকটি দল র‌্যাবের হাতে। পুনরায় কবর থেকে তোলা হলো লাশ। ফের ময়নাতদন্ত। কিন্তু এখনও কোন কূল করা যায়নি মামলার। অন্ধাকারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা। তিন তিনটি মাস কেটে গেলেও হত্যাকারী সন্দেহে গ্রেফতার করা যায়নি কাউকে। হায়! কী নিদারুণ “সফলতা”! এতো কিছুর পরও মাননীয় মন্ত্রীর দাবি তিনি “সফল”! তিনি সফল বৈকি। মিথ্যা বলা এদেশের রাজনীতিবিদদের স্বভাব। তাই বলে সাগর-রুনির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সাহারা খাতুন এমন জঘন্য মিথ্যাচার করবেন জাতি এমনটা কল্পনাও করেনি। সাহারা খাতুন তা করে দেখালেন।

এতো গেল মাত্র একটি ঘটনা। র‌্যাবের হামলার শিকার পঙ্গু লিমনের কথা কি সবাই ভুলে গেছে? ভুলে গেছে সন্ত্রাসী সন্দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র কাদেরের ওপর পুলিশি নির্যাতনের কথা? র‌্যাবের গুলিতে পঙ্গু লিমন মিথ্যা মামলায় এখনও হয়রানির শিকার হচ্ছেন পদে পদে। কাদেরের দেহে পুলিশের নির্মম নির্যাতনের দাগ এখনও মুছেনি। নিখোঁজ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এম ইলিয়াস আলীর সন্ধান মেলেনি আজও। গত ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতে চালকসহ নিখোঁজ হন ইলিয়াস। অন্যদিকে ইলিয়াস ইস্যুতে দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বিরোধীদল বিএনপি। এ সুযোগ কি সরকারই বিরোধীদলকে করে দিচ্ছে না?

হ্যাঁ, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আপনি সফল। আপনি সফল মন্ত্রিত্ব ধরে রাখায়। এতো ব্যর্থতার পরও আপনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই কি আপনার সফলতা? দেশ যাক রসাতলে, বাবা-মা হারা মেঘের কান্নায় ভারী হয়ে উঠুক আকাশ-বাতাস; তবুও আপনি থাকুন গদি আকড়ে। আপনাকে তো সরকারের বাকিটা সময়েও নিজেকে “সফল” করতে হবে! কিন্তু আপনার এ সফলতা যে আর কত নিষ্পাপ মেঘকে বাবা-মা হারা করবে, কত লিমনের অঙ্গহানি হবে, কত নিরাপরাধ কাদেরকে নির্মম নির্যাতনের শিকার করবে, কে জানে।

পাঠকের হয়তো মনে আছে শুরু করেছিলাম রোমের সম্রাট নিরোকে দিয়ে। রোম যখন আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ছে তখন নিরো বাজাচ্ছিলেন বাঁশি। সিরিয়া যখন অগ্নিগর্ভে রূপ নিয়েছে তখন বাশার আল আসাদ মেতে ছিলেন অবৈধ প্রণয়ে। আজ যখন বাবা-মায়ের ভালোবাসা বঞ্চিত অবুঝ মেঘ অপলক আকাশ পানে তাকিয়ে থাকছে বাবা-মা’র ফিরে আসার প্রতিক্ষায়, গোটা সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে দেশের মানুষ যখন খুনের বিচার দাবি করছে তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেকে সফল দাবি করে নিরো, বাশারদের তালিকায় নিজের নামটিও তুলে নিলেন। অপমান করলেন সাংবাদিক দম্পত্তির বিদেহী আত্মাকে। লিমনের পঙ্গুত্বকে। মেধাবী শিক্ষার্থী কাদেরের জখমে জর্জরিত দেহকে। বাহ্! সাহারা খাতুন, সফল আপনি।

শেষটাও নিরোর গল্পের শেষাংশ দিয়ে। এ অংশটুকু মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুধুই আপনাকে উৎসর্গ করে। ইতিহাস সাক্ষী দেয় সম্রাট নিরো মানুষ হত্যা করতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি নাকি নিজের মাকেও হত্যা করেছিলেন। পাষাণ হৃদয়ের এ সম্রাটের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রোমের সাধারণ জনগণ একসময় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। আন্দোলন সংগ্রামে কাঁপিয়ে দেয় গোটা রোম শহর। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় নিরোর। অবশেষে অপশাসনে অতিষ্ঠ রোমানদের গণঅভ্যুত্থানের মুখে নিরো ৬৮ খ্রিস্টাব্দে আত্মহত্যা করে জনরোষ থেকে রক্ষা পান।

লেখক : সাংবাদিক, অনলাইন সংবাদপত্র ঢাকা টাইমসটোয়েন্টিফোর ডটকম।