ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

ছোট বেলার বেশ কিছু ঘটনা মাঝে মঝে মনে পড়ে যায়। সেসব ঘটনা মনে করে হাসি আবার কষ্টও পাই। সেরকম একটি ঘটনা। আমার পাড়ার খেলার বন্ধু কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে মাঝে মাঝে বেশ ঝগড়া হতো। ঝগড়া যাকে বলে। তুমুল। তবে এসব ঝগড়ার সূত্রপাত হতো খুবই সামান্য কোন কথা দিয়ে। যেমন- আমার কোন এক খেলারসাথী ক্ষেপে গিয়ে বিলাই বলে আমাকে গাল দিলো। জবাবে আমি বলতাম-ইন্দুর (ইঁদুর)। ও বলতো গরু। আমি- ছাগল। ও-গাথা। আমি-ভেদা। এক কথায় আমাকে কেউ কিছু বলেছে, তো আর ব্যাটা যায় কোথায়। যতক্ষণ ছন্দ মেলানো যায় তো ভাল। তার পরই শুরু…। হাত থাকতে মুখে কী?-এই থিউরির প্রয়োগ। যতক্ষণ গায়ে বল, বীর দর্পে এগিয়ে চল। শের্ষপর্ব-“আম্মু ওমুক আমাকে মেরেছে” বলেই ভ্যা করে গেয়ে ওঠতাম ক্রন্দন সংগীত।

যা হোক আমার এ বর্ণনা এতোক্ষণে হয়তো অনেকেই নিজের ফেলে আসা শৈশবের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছেন। কেউ হয়তো একেবারেই মিল খুঁজে পাননি। তারা হয়তো ভাবছেন, খুব ডানপিটে শৈশব পাড় করে এসেছি আমি। হ্যাঁ, অনেক ডানপিটে শৈশবকে টা টা বায় বায় জানিয়ে সভ্য শান্তদের কাতারে এসে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। তবে ছোটবেলায় পিকলুস পানা আচরণের কারণে কত ধোলাই যে খেয়েছি, তার কোন ইয়াত্তা নেই। স্কুল থেকে ঘর। সবখানেই আমার তাণ্ডব লীলায় অতিষ্ঠ ছিল সবাই। আর আমার লিকলিকে দেহের ওপর অতিষ্ঠদের এক্সপেরিমেন্টাল তাণ্ডব লীলায় আমি ছিলাম অতিষ্ঠ। তাহলে এক্সপেরিমেন্টাল বিষয়ক একটি ঘটনা শেয়ার করা যাক।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় অনেক এক্সপেরিমেন্টাল ক্লাসের সাক্ষী হতে হয়েছে। একদিনের ঘটনা বলি। বায়োলজির ক্লাস স্যার আমাদের জীবের পরিপাকতন্ত্র সম্পর্কে হাতেনাতে কিছু জ্ঞান দেবেন। তো এখন প্রয়োজন জীব। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সুলভ ও ছাত্রপ্রিয় জীব হচ্ছে ব্যাঙ। শুধু বিজ্ঞান নয়, ভুগোলের ছাত্রদেরও এ তথ্য জানা। এবার ব্যাঙ ধরে নিয়ে আসো। দায়িত্ব এসে পড়লো আমার আর সহপাঠী ইব্রাহিমের ওপর। নেমে পড়লাম ব্যাঙ খোঁজার কাজে। কোথায় পাওয়া যায় ব্যাঙ। স্কুলের আশে পাশের পুকুর, ডোবা, নালা, নর্দমা সর্বত্র তন্যতন্য করে খোঁজা হলো। কিন্তু ব্যাঙ পেলুম না। কাঠফাটা রদ্দুরে ব্যাঙ খুঁজতে গিয়ে ততক্ষণে আমরাও ব্যাঙ বনে গেছি।

অবশেষে স্কুল থেকে প্রায় এক মাইল দূরে এক পুকুর পাড়ে আবিস্কার করলাম এক কুনো ব্যাঙ। দেখা মাত্রই কায়দা করে বধ করলাম ব্যাঙটাকে। কী দুর্গন্ধ। উহ! এখনও মনে হলে উলটি আসে। যা হোক ব্যাঙটিকে কাগজে পেঁচিয়ে দিলাম এক ছুট। স্কুলে পৌঁছে দেখি বিজ্ঞান ক্লাস শুরু হতে এখনও অনেক সময় বাকি। এতক্ষণ ব্যাঙটাকে যে কোথায় রাখি বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলাম। উপায় অন্ত না পেয়ে হাতের মুঠোতেই রাখতে হয়েছিল। পালা করে হাতে রাখছি। কিছুক্ষণ আমার সহপাঠী বন্ধু ইব্রাহিম। কিছুক্ষণ আমি। এখন অপেক্ষা বিজ্ঞান ক্লাসের।

এর প্রায় মিনিট দশেক পরের ঘটনা। ব্যাঙটি এখন আমার কিংবা আমার সহপাঠী, কারো হাতেই নেই। তাহলে গেল কোথায়? বেশি খুঁজতে হয়নি। ব্যাঙটি নিজে থেকেই জানান দিলো তার অবস্থান। তবে তার জন্য ব্যাঙ লম্ফের সামান্য প্রদর্শনী দেখাতে হলো আমার আরেক সহপাঠী জিল্লুরকে। সে কী লাফ। খুব মজা পেয়েছিলাম সেদিন ওর ঊর্ধ্বমুখী লম্ফ দেখে। স্বয়ং ব্যাঙ দেবতা সেদিন ভর করেছে ওর ওপর। আর আমার ওপর ভর করেছিল যমদূত।

পাঠক হয়তো বুঝে গেছেন এতক্ষণে দুষ্ট ম্যান এই আমার কোন দুষ্টমি বিদ্যার প্রয়োগ হয়ে গেছে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। ব্যাঙ নিয়ে স্যারের এক্সপেরিমেন্ট করার ফাঁকে ব্যাঙ ও জিল্লুরকে নিয়ে আমি নিজেই করে ফেলালাম নতুন একটি এক্সপেরিমেন্ট। এককথায়-“হোয়েন এ ফ্রগ ইন্টু দ্যা পকেট”।

হাতের মুঠো থেকে সুযোগ বুঝে কৌশলে ব্যাঙটিকে পৌঁছে দিলাম সহপাঠীর প্যান্টের পকেটে। যা হোক, আমার নটি এক্সপেরিমেন্টের অ্যাকশন স্বচক্ষে উপভোগ করলাম। আর রি-অ্যাকশনটাকে অনুভব করলাম দুই নিতম্বে। আই মিন পাছায়। সেদিন স্যার আমার ওপর তার বেত থিউরি প্রয়োগ করে পরীক্ষণের ফল আবিস্কার করতে গিয়ে আর পরিপাকতন্ত্রের জ্ঞান দিতে পারেননি। তবে সেদিন তিনি এটা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাপে কঠিন পদার্থ আয়তনে বাড়ে। আসলেই বাড়ে। আহ্! সেদিনের পর প্রায় দু’সপ্তাহ বাথরুমে যেতে খুব কষ্ট হয়েছিল।

আমার অসহনীয় দুষ্টমি দেখে সেসময় অনেকে এমন মন্তব্যও করতেন যে, বড় হয়ে আমি আস্ত একটা গুণ্ডা হবো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। গুণ্ডা হওয়ার আর্শীবাদকারীদের কাছে আমি এখন…?

আমার ডানপিটে শৈশবের এতো লম্বা ফিরিস্তি দেয়ার কারণ হচ্ছে-ছোটবেলায় আমি কেমন ছিলাম তার একটি খণ্ড চিত্র পাঠকদের সামনে ফুটিয়ে তোলা। আর আমাকে সামাল দিতে আমার পরিবারকে বিশেষ করে আমার প্রিয় মমতাময়ী মাকে কতটা যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে সেটাই কল্পনা করানো। আমি ছোটবেলায় আমার মাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। অনেক কাঁদিয়েছি। আমার আর দুই ভাই বোন মা’কে কখনো কোন কারণে কষ্ট দিয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। কিন্তু আমার জন্য মা কতদিন যে না খেয়ে ছিলেন তার কোন হিসাব নেই। আমার মায়ের অশ্রু আমি এখনো ভুলতে পারি না। তার এই ডানপিটে সন্তানের জন্য তিনি হয়তো কখনো স্বস্তিতে থাকতে পারতেন না। বাড়তি ঝামেলা নিয়েই দিনকাটাতেন। আমি এখন তা অনুধাবন করতে পারি। অতীত ভেবে অনেক কষ্ট পাই। কিন্তু এই ভেবে ভাল লাগে যে, এখন মাকে আর কারো নালিশ শুনতে হয় না। সেই দুষ্ট ফাহাদ শান্তদের কাতারে নাম লেখিয়েছে। এখন আর অকারণে দিনরাত অশ্রুঝরাতে হয় না তাকে।

রোববার বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে মাকে শুভেচ্ছা দিতে গিয়ে বললাম, “মা আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।” জবাবে, মা তার অশ্রুসজল নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি যদি আবার এ পৃথিবীতে জন্ম নেই- তবে সেদিনও আমি তোদের মা হয়ে থাকতে চাই।” মায়ের চোখের কোনে জল দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। মনের অজান্তেই সৃষ্টিকর্তাকে বলেছি, তুমি আমার মাকে শত শত বছর বাঁচিয়ে রাখো।

এ লেখাটি যখন লেখছি তখন বিশ্ব মা দিবস শেষ হতে মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকি। কিন্তু মমতাময়ী, আদরিণী মা’কে ভালবাসার জন্য বাকি আছে পুরোটা জীবন।