ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

রাষ্ট্রযন্ত্রের আচরণে দিন দিন অবাক হওয়ার মাত্রা বাড়ছে। সর্বত্রই “ঠেকাও” নীতির প্রয়োগ সীমা ছাড়াচ্ছে। অত্যাচারের খড়গ এখন নেমে এসেছে গণমাধ্যম তথা সমাজের সচেতনদের ওপর। রেহাই নেই জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালানোর কাজে নিয়োজিত শিক্ষকদেরও। কিন্তু এভাবে আর কতদিন বলতে পারেন মহামান্য বিচারপতি? হত্যা, নির্যাতন ও অধিকারহারাদের পদভারে যখন রাজপথ তেঁতে উঠছে ঠিক তখনই তাদের ওপর চালানো হচ্ছে রাষ্ট্রের দমননীতি?

বিচারপতি, এ দেশে হত্যার বিচার চাওয়া কি মানা? বাবা-মাকে নৃশংসভাবে খুন হতে দেখা সন্তান কি কখনই দেখতে পাবে না খুনির বিচার? বিচারের দাবি কি সে কখনই তুলতে পারবে না? প্রাপ্য মর্যাদা ও স্বচ্ছল জীবনের পাবার অধিকার কী নেই হাতেখড়ি দেয়া শিক্ষকদের? এ প্রশ্ন আমার একার নয়। এ প্রশ্ন আজ লাখো জনতার। যারা স্বজন, সহকর্মী, বন্ধু, প্রিয়জন হারানোর শোকে কাতর। হায়নারূপী ঘাতকের নখের আঘাতে ছিন্ন-বিছিন্ন প্রিয়মুখের ক্ষত চিহ্ন মনে করে যাদের হৃদয়ে প্রতিনিয়তই রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যা কেউ দেখতে পায় না। বিচারপতি, আপনিও না। এ প্রশ্ন তাদের যারা সম্মান চাইতে এসে অপদস্ত হন। উত্তপ্ত জলে দগ্ধ হন রাজপথে।

কিন্তু মহামান্য বিচারপতি আপনি কি দেখতে পান না- রাজপথে মানুষকে নির্যাতিত হতে? দেখতে পান না অন্যায়ের শাস্তি চাইলে রক্ষীবাহিনী দিয়ে কিভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয় রাজপথে? লোহার ব্যারিকেট আর অস্ত্রেরমুখে জিম্মি হতে হয় বিচারপ্রার্থীদের?

বিচারপতি, আজ জাতির বিবেককে রাষ্ট্রযন্ত্র রাজপথে নামিয়েছে। রক্ষীবাহিনীর লাঠি আর বুট সমানভাবে চলছে তাদের ওপর। প্রয়োজনে ছোড়া হচ্ছে টিয়ারসেল। কি শিক্ষক, কি ছাত্র। কেউ বাদ পড়ছে না এ থেকে। স্বাধীনভাবে কথা বলার জন্যই যাদের জন্ম সেই গণমাধ্যমকেও প্রতিহত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে রাষ্ট্রের দাঙ্গাবাহিনী! প্রিয় সহকর্মী হারানো ব্যথায় কাতর সাংবাদিকরা যখন বিচারের দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পানে শান্তিপূর্ন যাত্রা শুরু করলেন, ঠিক তখনই ওপর মহলের নির্দেশে তাদের প্রতিহত করার অপচেষ্টা শুরু হলো সুসজ্জ্বিত দাঙ্গাবাহিনী দিয়ে। কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হলো সচিবালয় এলাকার পথে পথে। ক্রোধে ফুঁসে ওঠা সাংবাদিকদের রুখে দিতে পুলিশের হাতে থাকা লাঠি গিয়ে আঘাত করলো বুকের পাজরে। কিন্তু যতই বাঁধা আসুক। আঘাত আঘাতে জর্জরিত হোক দেহ। তবুও মাথা নোয়াবার নয়। শত বাধা উপেক্ষা করে পথ যেখানে শেষ সেখান থেকেই উচ্চারিত হলো আন্দোলনের শ্লোগান। “ঘেরাও ঘেরাও ঘেরাও হবে, সচিবালয় ঘেরাও হবে।” বিচারপতি আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন সেই গগণ বিদারি বিচারের দাবি।

মহামান্য বিচারপতি, সাংবাদিক সমাজ যখন সহকর্মী হারানোর বিচারের দাবিতে সোচ্চার, তখন একটু দূরেই প্রতিরোধ বাহিনীর কবলে পড়ে আর্তনাদ করছে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা। স্বীকৃতির দাবিতে রাজপথের তাতানো পিচে হেঁটে হেঁটে পায়ে ফোসকা ফেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গুরুরা তখন ভিন্ন এক রাষ্ট্রীয় আতিথেয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমের আগুণ লাগা গায়ে ছুঁড়ে মারা হয়েছে ফুটন্ত পানি। ঝলসে দেয়া হয়েছে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা অসহায়, দুর্বল শিক্ষকদের। শিক্ষাগুরুর প্রতি কি প্রতিদানই দিলো রাষ্ট্র! তাই না? বিচারপতি, আপনি অনেক ধৈর্য্যশীল।

মহামান্য বিচারপতি আপনি হয়তো জানেন না, আন্দোলনে অংশ নিতে আসা শিক্ষকরা টানা কয়েকদিন রাজপথে কর্মসূচি পালন করছিলেন। রাত হলে বাড়ি ফিরে যাওয়ার উপায়ও ছিল না তাদের। রাত কেটেছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে। নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই। ভেবে ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তণয়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে আরজি জানালে হয়তো মিলবে স্বচ্ছল জীবনযাপনের কোন পথ। সেই উদ্দেশে কাঠফাটা রদ্দুর মাথায় নিয়ে স্বশরীরে যাত্রা শুরু করেছিলেন গণমানুষের নেত্রীর কাছে। কিন্তু বেশিদূর এগুতে পারেননি তারা। শহীদ বেদি থেকে শাহবাগ পর্যন্ত এসেই পুলিশি বাধার মুখে থমকে যেতে তাদের। উপরন্তু উত্তপ্ত জল অস্ত্রের মুখে দুর্বল দেহগুলো রাস্তায় লুটায়ে পড়ে। ক্রোধের আগুণ জ্বেলে আরেকটু সামনে এগুতেই ফের পুলিশি বাধা। আহত হন প্রায় শতাধিক।

বিচারপতি, কি দোষ ছিল শিক্ষকদের? তারা তো অস্ত্রোসস্ত্রে সজ্জিত ছিল না। তাহলে কেন তাদের প্রতিহত করতে রক্ষীবাহিনী ব্যবহার করা হলো? কোন নাশকতা সৃষ্টি করার মতো হীন মানষিকতার মানুষতো তারা নন। এমনটি না করলেই কি হতো না? বিচারপতি, প্রশ্ন রইল?

বিচারপতি, আমরা কোন অরাজকতা চাই না। কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কোন অসৎ উদ্দেশ আমাদের নেই। আমরা চাই আমাদের প্রাণ প্রিয় সহযোদ্ধা সাংবাদিকদের হত্যার বিচার। নির্যাতনের প্রতিকার। মুক্তকণ্ঠে বলার অধিকার। আর নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। অসহায় শিক্ষকদের পায়ে দেখতে চাই না আবদ্ধের শেকল। মর্যাদাপূর্ণ ও স্বচ্ছল জীবন চাই তাদের।

মহামান্য বিচারপতি আমার এই আরজি আপনার কাছে অর্থহীন মনে হলে আমায় ক্ষমা করবেন। কিন্তু যতদিন আপনার কাছে অসহায়ের এই আর্তনাদ মূল্য পাবে না, ততদিন এই আরজি অব্যাহত থাকবে।

কবি নজরুলের ভাষায় বলতে চাই- মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত,/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,/অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না -/বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/
আমি সেই দিন হব শান্ত!