ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, দেশীয় পণ্য ব্যবহার এবং সর্বক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা- এ বিষয়গুলোর পৃথক স্বত্তা ও স্বকিয়তা থাকলেও এরা পরস্পর নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য চাই স্বনির্ভরতা, স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য চাই অর্থনৈতিক মুক্তি আর অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য চাই দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং আমদানী নির্ভর অর্থনীতির বিপরীতে আত্মনির্ভর ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতি। আর সে ধরনের একটি অর্থনীতি গড়ার অন্যতম পন্থা হচ্ছে আমদানীকৃত বিদেশী পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে দেশীয় পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া।

বাঙ্গালীর স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরিপূর্ণ পর্যায় হল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের পরেই আমরা পেলাম স্বাধীনতার স্বাদ। কিন্তু মুক্তির এ যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল সেদিন থেকে যেদিন বাঙ্গালী হারিয়েছিল তার স্বাধীনতা পলাশীর আম্রকাননে। স্বাধীনতা হারিয়ে তারা বুঝেছিল স্বাধীনতার কি মর্ম, পরাধীনতার কি জ্বালা। তারপর থেকেই শুরু হয় মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য বিরামহীন সংগ্রাম। বিভিন্ন সময়ে ভারতবর্ষ বাসী তথা বাঙ্গালী বিদ্রোহ করে উঠেছিল। পলাশীর যুদ্ধের একশ বছরের মধ্যে ব্রিটিশ ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কুশাসন, শোষণ ও নিপীড়নের ফলে অসংখ্যবার দুর্ভিক্ষ এবং অসহনীয় কর ভারে কৃষককুল বিধ্বস্ত হয়। পাশ্চাত্যের শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যেও দেখা দেয় বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক তীব্র অসন্তোষ। বিশেষ করে বাংলা সহ উত্তর ভারতে। ১৮৫৭ সালের মে মাসে ভারতীয় সৈন্য বাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এ বিদ্রোহ দ্রুত রূপ নেয় জনতার বিদ্রোহে। কিন্তু যেহেতু এ বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন কিছু সংখ্যক সামন্ত প্রভু এবং গণবিচ্ছিন্ন নেতা, তাই তা চুড়ান্ত লক্ষ অর্জনে সক্ষম হয়নি। দাবী আদায়ের জন্য চাই সঠিক, সুযোগ্য নেতা। সেরকম একজন নেতার অভাব পুরণ করতে কালক্রমে এই বাংলায় আবির্ভাব ঘটেছিল হাজী শরীয়তুল্লাহ, শহীদ তিতুমীর, সূর্যসেন, নবাব আব্দুল লতিফ, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাষানীর মতো সম্মোহনী নেতার। তারা একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বাঙ্গালীর মুক্তির তথা স্বাধীনতার সংগ্রামকে। আর সে সংগ্রামের পরিপূর্ণ ও কাঙ্খিত সমাপ্তি টেনেছেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারই সুযোগ্য নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙ্গালী পেল স্বাধীনতা।

স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর শুরু হয় এক নতুন যুদ্ধ। সকল ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের যুদ্ধ। স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রধান উপায় অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা অর্জন। যেকোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে তার পুণর্বাসন ও অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসম্মত পর্যায়ে তুলে আনার একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণ এবং বিদেশী পণ্যের বাজার সীমিত করে দেশীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা। দেশীয় শিল্পগুলো যখন একটি মানসম্মত পর্যায়ে উপনিত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার মুখে টিকে থাকতে সমর্থ হয় তখনই খুলে দেয়া হয় আন্তর্জাতিক পণ্যের প্রবেশদ্বার। সে লক্ষে স্বাধীনতার পরে দেশের বিধ্বস্ত রুগ্ন শিল্পগুলোতে প্রাণ সঞ্চার করার জন্য চলে জাতীয় করণ প্রকৃয়া। ১৯৭২ পরবর্তী শিল্পনীতিতে সে প্রক্রিয়ায়ই শুরু হয় বাঙলাদেশের অর্থনীতির যাত্রা। কিন্তু ১৯৭৯ সালের পরবর্তী শিল্পনীতিতে ব্যপক পরিবর্তন আসা শুরু হয়। এ সময় অধিক উৎপাদনের লক্ষ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ এবং অনেক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়। অন্যদিকে মুক্তবাজারের সুযোগে এদেশে ব্যপক হারে ঢুকে পরে বিদেশী পণ্য। যার ফলে শিশু পর্যায়ে থাকা এদেশীয় শিল্প পণ্যগুলো বাজার হারাতে থাকে আন্তর্জাতিক এমনকি দেশীয় বাজারেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারী বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে জেনারেল এগ্রিমেন্ট অব টেরিফ এন্ড ট্রেড (GATT) এর জন্ম হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের ১৫ এপ্রিল মরক্কোয় মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনে (GATT) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যার উত্তরসুরী হিসেবে জন্ম নেয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) যা ১ জানুয়ারী ১৯৯৫ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্র শুরু করে। এই সংগঠনের গৃহিত কর্মসূচী হিসেবে MEF (Most Favoured Nations Principle), MFA (Multi Fiber Agreement), GSP (Generalized System of Preferences) ইত্যাদি উঠে যাবার ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যা দাঁড়ায় তা হলো সারা বিশ্ব একটি বাজারে পরিণত হয় এবং এ বাজার হয় প্রতিযোগিতাপূর্ণ। এর ফলে সারা বিশ্বের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রাণ সঞ্চার হয় সত্য কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহ কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয় এবঙ নিজস্ব শিল্প উন্নয়ন তরান্বিত করতে গিয়ে পণ্য বাজারজাত করতে না পেরে লোকসানের মুখে পরে। অপরদিকে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলো তাদের পণ্যের গুণগত মান বজায় রেখে নতুন আঙ্গিকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। তবে বিশ্বে এক মেরুকেন্দ্রীক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা গড়ো তোলার লক্ষে WTO ব্যবস্থাপনা অনেকটা বিশ্ব বাস্তবতা। এ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এমন একটি সময় হয়তো আসবে যখন আমাদের দেশীয় শিল্প টিকিয়ে রাখার কোন উপায় আমাদের কাছে থকবে না। শুধুমাত্র একটি বিকল্প উপায় ছাড়া। আর তা হলো দেশপ্রেম। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যদি আমরা দেশীয় পণ্য ক্রয় করি তবেই হয়তো বেচে উঠবে আমাদের রুগ্ন শিল্পগুলো। এতে হয়তো আমরা সাময়িকভাবে কিছুটা আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ হব ঠিকই কিন্তু বিদেশী পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে যাবার আগেই দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন ও আন্তর্জাতিক গুণগত মান অর্জন করতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে শিল্প উদ্যোক্তাদেরও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সিন্ডিকেট বাজী না করে শিল্প পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির প্রক্রিয়া অব্যহত রাখতে হবে। তা না হলে ভোক্তার উদার দেশপ্রেমকে কাজে লাগিয়ে শিল্প উদ্যোক্তারা কেবল অধিক লাভবানই হবে বিপরীতে গুণগত মান অর্জন করে আমদানী নির্ভর বাজারের বিপরীতে রপ্তানী বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য ব্যহত হবে। তাই আসুন আমরা সকলে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হই, দেশীয় পণ্য ক্রয় করি, সমুন্নত রাখি আমাদের অর্থনীতি ও স্বাধীনতাকে।