ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

বাসেত সাহেব। ছোটখাটো একটা সরকারি চাকুরি করতেন। জমিজমার পরিমানও কম নয়। কিছুদিন হল অবসর নিয়েছেন। তিন ছেলে আর এক মেয়ের গর্বিত সন্তান। ছেলে তিনজনও মোটামুটি চাকরি বাকরি করছে। মেয়েটার বিয়ের কাজও সাঙ্গ হয়েছে। দেখেশুনে বেশ ভালই মনে হয়। যে কেউ দেখে একজন ভদ্র লোকই বলবে। এলাকাতেও বেশ প্রভাবশালী বলা চলে। এখন টুকটাক মোড়লীপনা করেই অনেকটা সময় কাটে। অবসর সময় কাটানোর জন্য এটা অবশ্য একটা ভাল উপায়ও বটে। স্বাস্থ্যের অবস্থা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বয়স হলে যা হয় আর কি। তারপরও অপেক্ষাকৃত বেশ সুস্থ সবল। এখনও যথেষ্ট পরিশ্রমী এবং শক্তিশালী। কিন্তু অসুস্থতাতো আর বলে কয়ে আসে না। একটু আধটু মাথা ব্যাথা, জ্বর ইত্যাদি থেকে শুরু করে কয়েকদিনের মধ্যে শরীরটা বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে বাসেত সাহেবের। ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছেন উন্নত চিকিৎসার আর এজন্য প্রয়োজন ষাট হাজার টাকা। বৃদ্ধ পিতা অসুস্থ হলে সন্তানেরা বিশেষ করে ছেলে সন্তানেরাই চিকিৎসার দায় ভার বহন করে। বাসেত সাহেবও সেরকমটাই মনে করেছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। তিনটি চাকুরিরত জোয়ান ছেলে পিতার চিকিৎসার জন্য টাকা দিতে বেকে বসল। কি আর করা। বাসেত সাহেব দ্বারস্ত হলেন সমাজের বিশিষ্টজনদের।

মাহমুদ স্যার এলাকার স্কুলের শিক্ষক। একজন সম্মানিত লোক। বাসেত সাহেবের তিন ছেলেই মাহমুদ স্যারের ছাত্র। সেই ভরসায় বাসেত সাহেব গেলেন মাহমুদ স্যারের কাছে চিকিৎসার টাকার জন্য ছেলেদেরকে তদবির করতে। মাহমুদ স্যার জ্ঞানী লোক। ছেলেরা টাকা দিতে রাজি না হওয়ার তিনি বাসেত সাহেবকে জমি বিক্রি করে চিকিৎসা করার পরামর্শ দেন। একথা শুনে বাসেত সাহেব চুপসে যান। মাহমুদ স্যার একটা কিছু শুনতে চাচ্ছিলেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে মাহমুদ স্যার নিজ থেকেই করণীয় জানতে চাইলেন। এবার বাসেত সাহেব ক্রন্দন শুরু করলেন। অবাক হলেন মাহমুদ স্যার। কান্নার কারণ জানতে চাইলে এবার আর বাসেত সাহেব চুপ থাকতে পারলেন না। একে একে বলে গেলেন অনেক কথা। বাসেত সাহেব বলা শুরু করলেন তার সমস্ত সম্পত্তি কয়েক বছর আগেই তিন ছেলের নামে লিখে দিয়েছেন। তার নিজের নামে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তিন ছেলেকে সমস্ত সম্পত্তি লিখে দেওয়ার কথা শুনে মাহমুদ স্যারের মনে পড়ল বাসেত সাহেবের কন্যার কথা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন তার মেয়েকে সম্পদের কোন অংশ দেওয়া হয়েছে কিনা। প্রশ্ন শুনে বাসেত সাহেবের জবান আবার বন্ধ হয়ে গেল। তার চেহারা দেখলে যেকোন মানুষই সন্দেহ করবে তিনি আদৌ কথা বলতে পারেন কিনা। বাসেত সাহেবেরতো চুপ মেরে যাওয়ারই কথা। কথা বলবেন কিভাবে? কথা বলার মুখতো তিনি অনেক আগেই হারিয়েছেন। নিজের ঔরসজাত কন্যাকে নিজ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে ছেলেদের নামে সকল সম্পদ লিখে দিয়েছেন।

মাহমুদ স্যার অবাক হলেন না। সমাজে এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটে চলেছে। বাসেত সাহেবের সাথে আর কথা বলার রুচি পেলেন না। মনে মনে কিছুটা ক্ষোভ নিয়েই স্থান ত্যাগ করলেন মাহমুদ স্যার। আর ভাবতে লাগলেন অনেক কিছু। মানুষ এরকম হয় কি করে? মেয়েকে দ্বায়সারা গোছের একটা বিয়ে দিয়েই কি পিতামাতার সকল দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? বাসেত সাহেবের মেয়ের জামাইয়ের অর্থনৈতিক অবস্থাও তেমন একটা ভাল নয়। টানাটানির সংসার। তারপরও কিভাবে বাসেত সাহেব এমন কাজ করতে পারল? আর বিনিময়েই বা শেষ বয়সে বাসেত সাহেব কি পেল? হাজারো প্রশ্নের অবতারণা হল মাহমুদ স্যারের মনে। চোখে ভেসে উঠল এরকম অসংখ্য ঘটনার প্রতিচ্ছবি। মাহমুদ স্যার ভাবলেন যারা কন্যার প্রাপ্য পুত্রের অর্ধেক সম্পদই দিতে কৃপণতা করে তারা কিভাবে কন্যাকে পুত্রের সমান সম্পদ প্রদান করবে? এরপর থেকে যারাই নারী অধিকারের নামে পিতার সম্পত্তিতে কন্যার জন্য পুত্রের সমান সম্পদ দাবী করেছে তাদেরকে তিনি বলে চলেছেন কন্যার প্রাপ্ত পুত্রের অর্ধেক সম্পদ ঠিকমত দেওয়া হয়তো?

মাহমুদ স্যারের মনে আবারও প্রশ্নের উদয় হল তথাকথিত নারীবাদীদের প্রতি। পিতার সম্পদ ভাগাভাগির বেলায় ইসলাম যে পদ্ধতি বাতলে দিয়েছে, দুইশ বছর শাসন করে বৃটিশরাও সেই পদ্ধতি পরিবর্তন করার সাহস দেখায় নি, বস্তুত পরিবর্তন করার কোন যুক্তি খুঁজে পায়নি। আর আমাদের তথাকথিত হাতেগোনা কয়েকজন নারীবাদী নারী অধিকারের নামে অনধিকার চর্চায় মেতে উঠেছে। আশ্চর্যজনকই বটে! এগুলোর মধ্যে অন্যকিছুর গন্ধ পান মাহমুদ স্যার। মাহমুদ স্যার মনে করেন অধিকারের নামে নারীবাদীদের উদ্দেশ্য মা বোনদের রাস্তায় নামানো, তাদেরকে নগ্ন করা। মাহমুদ স্যারের বিশ্বাস নারীদেরকে বেহায়াপনায় উদ্বুদ্ধ করতো সমাজ ধ্বংস করতেই নারীবাদীদের এ ঘৃণ্য প্রয়াস।