ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

স্কুলে হাজী মহসিনের একটি কাহিনী পড়েছিলাম। একদিন তার কক্ষে গভীর রাতে একজন চোর ঢুকলে হাজী মহসিন তাকে হাতে নাতে ধরে ফেলেন। যথারীতি উত্তম মধ্যম না দিয়ে উল্টো দরিদ্রতার কারণে চুরি করায় চোরকে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস আর উপদেশ দিয়ে বিদায় করেছিলেন। সম্ভবত ঘটনার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষার কারণে স্কুলের গাইড বইয়ে এই ঘটনা সংযোজন করা হয়েছিল। অন্য কেউ এই ঘটনা থেকে তখন কোন শিক্ষা নিতে পেরেছিল কিনা জানি না, তবে আমি নিতে পারি নি। হয়তো ঘটনার তাৎপর্য কেউ ব্যাখ্যা না করায় আমার মত আরও অনেক অবুঝ স্কুল ছাত্র ঘটনাটি শুধুই মুখস্ত করেছিল। ঘটনাটি সত্য না মিথ্যা সেটা যাচাই করার সুযোগ অবশ্য আমার হয়নি। তবে ঘটনার শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে যে আমরা উপকৃত হতে পারি এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। হাজী মহসিনের এই মহতী কাজ মানবতার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ কোন সন্দেহ নেই।

বর্তমান মানবতার ব্যাপারটাকে খুব জোরেশোরেই উচ্চারণ করা হয়। যত্রতত্র আমরা মানবতা অন্বেষণ করি। মানবতার দোয়াই দিয়ে আমরা সকলের সমান অধিকারের কথা বলি, মানবতার কথা বলে আমরা ন্যায় অন্যায়ের প্রসঙ্গ টানি, আরও অনেক কিছু। মানবতা নিয়ে গলাবাজি করা প্রচুর লোকও সমাজে বিরাজমান। এই পর্যন্ত সবই তাত্ত্বিক। সকলের চাওয়াই এক। কিন্তু মানবতার তাত্ত্বিক আর ব্যবহারিক প্রয়োগের মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাত্ত্বিকতার দিক দিয়ে পৃথিবীর সকল মানবতা এক হলেও প্রয়োগের বেলায় মানবতা নিজেই মানবতাহীন। এই মানবতা ধারকদের অবস্থা বর্তমান এমনই বেগতিক যে পশু জবাই করা তাদের চোখে মানবতাবিরোধী কাজ, কিন্তু নিরপরাধ মানুষদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা তাদের মানবতার অধীন।

ধর্ম, ধার্মিকতা, ইসলাম, মুসলমান ইত্যাদি প্রসঙ্গে আজকের তথাকথিত মানবতা উহ্য। মানবতা আর ধর্ম এক সঙ্গে আসলে, ইসলামের ক্ষেত্রে তারা মানবতার কথা বেমালুম চেপে যান অথবা মানবতার নিত্য নতুন সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করেন। যদি মানবতা আর মুসলমানদের ব্যাপারটা এক সাথে আসে, তাহলে মুসলমানদেরকে একটা কিছু হিসেবে সাব্যস্ত করে এমন একটা ভাবের উদয় করা হয় যেন মুসলমানদের বেলায় কোন মানবতা প্রযোজ্য নয়। আবার যদি ধার্মিকতা আর মানবতা এক সঙ্গে আসে, তাহলে হাসি ঠাট্টা কিংবা এড়িয়ে চলা অথবা নির্যাতনের পথ বেছে নেওয়া হয়। মানবতা সেখানে জেলখানায় বন্দী থাকে। মানবতা নিয়ে সবচেয়ে উপহাস করা হয় গরীবের বেলায়। গরীবের বেলায় মানবতার স্থান ফাঁসির মঞ্চে। গরীবের কোন মানবতা নেই। তাদের হয়ে মানবতার কথা বলার জন্য কোন মানবধিকার কর্মীও নেই। তাদের জন্য আছে শুধুই লাঞ্ছনা গঞ্জনা। এখনকার মানবতা সবার জন্য নয়, শুধু কর্পোরেট লোকদের জন্য, কর্পোরেট মানবতা!

আমাদের দেশের বিত্তশালীদের অধিকাংশই চুরি বাটপারি করেই টাকার পাহাড় গড়েছে। থানার ওসির মত লোকের ছেলের পেছনেও মাসে বিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা ব্যয় করা হয় শুধু মাত্র লেখাপড়ার জন্য। একজন ওসি কিভাবে এত টাকা খরচ করতে পারে সেই বিতর্কে যাওয়াটা এখন অর্থহীন। পুলিশ, প্রশাসন, আয়কর, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রতিটি পেশায় এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। এরা সবাই মানবতার লোক। মানব সেবা করাই তাদের মুখ্য কাজ। তারা সকলে ক্ষমতাধর, উচ্চ শিক্ষিত। দেশ ও দশের চিন্তা তাদের কাছে গৌণ। বিলাসী জীবনযাপনই তাদের একমাত্র চাওয়া। বিলাসিতার জন্য তারা চুরি করার মত জঘন্য অপরাধ ও মানবতাবিরোধী কাজও হালাল করে নিয়েছে। এখন অবশ্য কোনটা চুরি আর কোনটা চুরি না সেটারও নতুন নতুন সংজ্ঞা দেওয়া হয়। দেশের বারোটা বাজিয়ে কোট টাই পরা কর্পোরেট মানবতার ধারকদের পুকুর চুরি আর এখন আমাদের চোখে পড়ে না। অথচ ক্ষুধার যন্ত্রনায় কাতর হয়ে সামান্য একটু খাদ্য দ্রব্য চুরি (?) করার কারনেও মানুষ কত হিংস্র হয়ে উঠতে পারে তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।

কয়েকদিন আগে পত্রিকায় একটি ছবিতে দেখা যায় ক্ষিধে সহ্য করতে না পেরে সামান্য কিছু খাবার চুরি করার অপরাধে বিশাল একদল জনতা সাত আট বছরের দুইটি শিশুর উপর নির্দয়ভাবে হামলে পড়ার দৃশ্য। কেউ চুল ধরে টানছে, কেউ কিল-ঘুষি মারছে, যে যেভাবে পারছে সেভাবেই মারছে। ছবিটা দেখার পর নিজেকে অবশ্য ঐ অপরাধ থেকে মুক্ত বলে মনে করতে পারি নি। বরং মানুষের জন্য কিছু না করতে পারার বেদনাটা অনুভূত হয়েছে ভীষণভাবে। একজন সাত আট বছরের শিশুর কাছে অপরাধ, মানবতা সবকিছুই অর্থহীন। সে জানে না মানবতা খায় না মাথায় দেয়। অপরাধীর শাস্তি কি কিংবা অপরাধটাই বা কি সেটাও তার ধারনার বাইরে। সে জানে না বিলাসিতা কি। পেটপুরে আহার করতে পারাটাই অনেক শিশুর কাছে চরম পাওয়া আমাদের দেশে। অথচ এই অবুঝ শিশুরাই আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজে অসভ্যতা, বর্বরতার শিকার। পরণে পোশাক নেই, পেটে খাবার নেই, নেই তাদের জন্য কোন মানবতার বালাই। দুর্ভাগ্য এই শিশুদের এখন আর হাজী মহসিনদের দেখা মেলে না। মাথায় হাত বুলিয়ে মুখে দুমুঠো অন্ন আর কিছু সদুপদেশ দেওয়ার মত লোকও অনুপস্থিত এই সমাজে। মানবতার বিচরন এখন গুলশান বারিধারায়। শত ধিক্কার এই কর্পোরেট মানবতাকে!