ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

বুকভরা স্বপ্ন আর প্রানভরা আশা নিয়ে নতুন বর্ষে পদার্পণ। আনন্দ-উল্লাস, হৈ-হুল্লোড় আর নাচ-গানে নতুন বছরের উদ্বোধন। চাঞ্চল্য ও ব্যস্তময় সারাটা দিন। কোন কিছুতেই ক্লান্তির ছোয়া নেই। শহরের আদ্যপ্রান্তে ছোটাছুটি করা ছোট বড় হাজারও মানুষের হাসিমাখামুখগুলো ক্ষনিকের। সন্ধ্যার বাতি নেভার সাথে সাথে হয়তো হাসিমুখগুলোও অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। তবুও নিরাশার পানে খড়ম চালিয়ে আশার সাগরে ভেসে চলা। উদ্দেশ্যহীন একটি দিন। সেই সুর্য্যদয় থেকে শুরু। ভিনদেশী, ঢংবেশী, আউলা ঝাউলা গানে বাংলা বর্ষ উদযাপন। সাথে উদ্ভট কিছু মূর্তি বানিয়ে রাজপথ প্রদক্ষিন। আর রমনার আনাচে কানাচে বসে কোনো রুপসী ললনার রংমাখা হাতে এক থালা পান্থা ইলিশ খাওয়ার বাসনা। কোন তপস্যা নেই, কোন অধ্যাবসায় নেই। সব কিছুই আগের মত। তবুও নতুন কিছু পাওয়ার আকাঙ্খা।

অনেক দিন আগের কথা। এলাচি তার নানার সাথে কোথাও বেড়াতে যায়। এলাচি সম্পর্কে সেখানকার কেউ একজন জানতে চাইলে নানা তাকে পরিচয় করিয়ে দেন। নাতির মেধা প্রকাশ করে নানা নিজে একটু সম্মানিত হতে গিয়ে কিঞ্চিত বানিয়ে বানিয়ে বেশ খানিকটা বাড়িয়ে বাড়িয়েই বললেন। নাম কিংবা বাবার নাম অথবা কোন শ্রেনীতে পড়ালেখা করে এগুলো ছিল যথাযথ। বিপত্তি বাধল পরিচয় পর্বের পরবর্তী ধাপে। বলতে বলতে নানা এমনই বলা শুরু করলেন শেষ পর্যন্ত এলাচি নিজেকে আর চিনতে পারল না। সে নানার কথার মধ্যে নিজেকে খুজতে শুরু করল। এলাচির মনে হল নানা যাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন সে আমি নই, অন্য কেউ। লজ্জায় এলাচির মরি মরি অবস্থা। তাতে কি?

বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের এজেন্ডা দেখে অবশ্য ঠাহর করার উপায় নেই সেটা বাংলা নববর্ষ না অন্য কিছু। এলাচির মত বড্ড অসহায় দেশপ্রেমিক জনতা। সত্য বুকে চেপে ধরে প্রকাশ করতে না পারার তীব্র বেদনা। নববর্ষ উদযাপন হয় বাংলাদেশে। অথচ বাংলাদেশের সংস্কৃতির কোন অংশটুকু, বাংলাদেশী উৎসবের কতটুকু পালন করা হয়; সেটা খুজে ফিরতে হয় পথে প্রান্তরে। নিজের মধ্যে নিজ সংস্কৃতির খোঁজ। তাও যদি একটু দেখা মিলত। মন খারাপ করেতো আর থাকতে হতো না। মূর্তি বানিয়ে ঢং সাজা, অঙ্গ দুলিয়ে পশ্চিমা ধাচেঁর গীত উপভোগ আর ছাত্রী-শিক্ষক হিন্দী নৃত্য। ওদিকে আবার ইভটিজিংবিরোধী আইন পাস। বাংলা বর্ষ উদযাপনে টেলিভিশনে হিন্দী সিনেমা আর তিশমা তন্নির অর্ধনগ্ন হয়ে লাফালাফি। অন্য বছরের অন্য দিনের মতই পহেলা বৈশাখে প্রকাশ্যে দিবালোকে মেয়েদের ওড়না নিয়ে টানাটানি, বস্ত্রহীন করার অপচেষ্টা। আবার ইভটজিং এর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি।

নতুন বছরে সকলের তরে সকলকে সপে দেওয়ার সপথ। দুঃখ, গ্লানি, হতাশা, ভুল-ভ্রান্তি পদদলিত করে হাতে হাত, কাধে কাধ রাখার গর্বিত আস্ফালন। আবার পুরনো বছরে ন্যায় আর দশবারের মতই খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার দাবী প্রত্যাখান। সত্য-সত্য বলে চিৎকার চেচামেচি। নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে ব্যাপক আয়োজন। আবার গেল বছরের মতই জিয়াউর রহমানের অবদান নিয়ে টানাটানি। ন্যায়, স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন বাজি রাখার পণ। আবার ফেলে আসা বছরে হারিয়ে যাওয়া হাজারটা লাশের মত সীমান্তে নতুন বছরে নতুন লাশ উপহার। অতঃপর মুখে কুলুপ আটা। বড়ই আজব এই জনপদ! চারিত্রিক কোন পরিবর্তন নেই, নেই কোন সুস্থ চিন্তা চেতনা। নেই গঠনমুলক কোন সাধনা। মূর্তি বানিয়ে নতুনত্বের আশা। কেউ মূর্খ্য আর কেউ জ্ঞানপাপী! গিলছে সেই একই পুরনো মদ, নতুন গ্লাসে।