ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

নারী অধিকার নিয়ে আলোচনায় সরব দেশের প্রতিটি অঙ্গন। সেটা নিয়ে হাতে গোনা কতিপয় লোকের দৌড়ঝাঁপ বোধবুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই দেখছি। ‘নারী অধিকার’ কথাটি ভারী আবেদনময়ী। এই কথাটি বলে অন্তত কিছু নারীকে যত সহজভাবে বিভ্রান্তিতে জড়ানো যায়, অন্য কোন কথা বলে মনে হয় না ততটা সম্ভব হবে। আর এই সুযোগটি খুব ভাল ভাবেই হজম করতে সক্ষম হয়েছে চতুর সুশীল (?) সমাজ। সমাজের হাজারো বঞ্চনা-প্রবঞ্চনার স্বীকার নারীদেরকে মিথ্যা প্রলোভনে ফেলে পুরুষদের সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর এক দফা অযৌক্তিক দাবীতে জনা পঞ্চাশের লোকের মানববন্ধন প্রায়ই চোখে পড়ে। চেহারা সুরত আর বেশভূষায় স্পষ্টতই বলে দেয় এই মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নারী সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে পয়সা ছাড়া আনাটা মোটামুটি অসম্ভব। দু মুঠো খাবারের জন্য জীবন সংগ্রামে লিপ্ত খেটে খাওয়া এই মানুষগুলোকে দিয়ে অবশ্য সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে যত্রতত্র ব্যবহার করা একেবারেই মামুলি ব্যাপার। তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন তোয়াক্কা নেই। অধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষাগৃহেও সমাজের এই নারীদের কাছে স্বামী-সন্তদি নিয়ে কোনরকম জীবন যাপন করাটা পরম পাওয়া।

টাকার বিনিময়ে নারীদেরকে রাস্তায় নামানো ডাল ভাত হলেও এখন রাজপথের আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত কিছু নারীর উপস্থিতিও লক্ষণীয়। শুধু সুশীলদের অধিকার আন্দোলনেই নয়, বড় বড় রাজনৈতিক দলের মিছিল, মিটিং এমনকি পিকেটিংয়ের ক্ষেত্রেও নারীদের অবস্থান একেবারে সামনের কাতারে। গাঁ শিউরে ওঠে। মানুষের এই অধ:পতন দেখে দুঃখও কম লাগে না। পুরুষের সমকক্ষ বনতে যাওয়া এই সকল নারীদের রাস্তাঘাটে প্রায়ই নাজেহাল হতে দেখা যায়। সরকার বিরোধী আন্দোলনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম অবমাননার স্বীকার হয় নারীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ। বিশেষ করে নারীদের শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দেওয়া, টানা হেচঁড়া করতে গিয়ে বস্ত্রহীন করা ইত্যাকার ঘটনাগুলো পত্রিকার পাতা খুললেই দৃষ্টি গোচর হয়। আবার এই সকল নোংরা ছবি প্রকাশ করার মাধ্যমে ব্যবসায়ীকভাবে লাভবান হয় মিডিয়া। সরকারী বাহিনী কর্তৃক বিরোধীদের নাস্তানুবাদ। এগুলো সবই গত দুই দশকের স্বাভাবিক ঘটনা।

এহেন মানবতা বিবর্জিত কলঙ্কজনক ঘটনা বারবার ঘটার পরেও কেন নারীদেরকে দিয়ে এ ধরনের জঘন্যতা পরিহার করা হয় না সেটার জবাব পাওয়ার আশা করি না। অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মুখ সমরে নারীদেরকে কেন অগ্রগামী করা হয় সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়াটা সাধ্যের অতীত হলেও সময়ের দাবী। অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রের যুদ্ধ হয়। আর আন্দোলনের মাঠে পুলিশের অস্ত্রের বিরুদ্ধে নারীদের স্পর্শকাতর দেহটাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রকৃতিগতভাবেই নারীদের শরীর দাঙ্গা হাঙ্গামা করার অনুপযুক্ত। শান্তিপূর্ণ যে কোন কাজে নারীদের সম্পৃক্ত করাটাই নারীদের যথোপযুক্ত প্রাপ্য। কিন্তু ময়দানের হিসাব নিকাশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে স্বাভাবিকতাকে ছাপিয়ে অস্বাভাবিকতা দোর্দান্ত প্রভাবশলী। বর্তমান বেশিরভাগ আন্দোলনকারীর লক্ষ্য থাকে যে কোন উপায়ে আন্দোলন থেকে ফায়দা হাসিল করা। হোক না সেটা ঘৃণ্য কিংবা বন্য উপায়ে। আর এই ফায়দা চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে স্বেচ্ছায় বস্ত্র বিসর্জন দিয়ে নারী কর্তৃক পুলিশের উপর দোষ চাপানোর ঘটনাও বাস্তব সত্য।

প্রকৃতপক্ষে সুশীল সমাজ, মিডিয়া বা রাজনৈতিক দল সকলেরই মুখ্য উদ্দেশ্য প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে নারীদেরকে ব্যবহার করে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে আর্থিক, আদর্শিক কিংবা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া। তা না হলে এদের সবাই কেন নারীদের ব্যবহার করতে ভিন্ন পদ্ধতিতে একই প্রতিযোগীতায় আসীন। বর্তমান মিডিয়াগুলো ইতিমধ্যেই নারীদেরকে নগ্ন করে পণ্য হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। সুশীলদের আন্দোলনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে নারীদের রাস্তায় নামানো। পুরুষের সমকক্ষ করত নারীদের পশ্চিমা ধাচের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করা। আর বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্যও পরিষ্কার। তারা রাজপথে আন্দোলন করিয়ে ছেড়া পোশাক আর নির্যাতনের চিহ্নসহ নারীদেরকে প্রকাশ করে জন মনুষের অনুকম্পা পাওয়ার নোংরা মানসিকতায় লিপ্ত। মোদ্দাকথা অধিকার, স্বাধীনতা ও আন্দোলনের নামে নারীদের যে উপায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে তা শুধু লজ্জাজনকই নয়, সমাজের জন্য ঘোর অমানিশার সতর্ক পূর্বাভাস।