ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাস্তব জীবনে লেখকদের চাল চলন, কথা বার্তা আর লেখার ভাষার মধ্যে বেশিরভাগ সময়েই বিস্তর ফারাক দেখা যায়। অনেক লেখক বা কবি খুবই সাদাসিধে জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত। হাসি ঠাট্টা কিংবা রঙ্গ তামাশাও কম করেন না। ব্যবহারেও অত্যন্ত অমায়িক। অথচ এদের লেখার মধ্যে অন্য রকম একটা গাম্ভীর্যতা ফুটে ওঠে। লেখা পড়ে অনেকের কাছে তাদেরকে একটু গম্ভীর অথবা একগুঁয়ে প্রকৃতির লোক মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। একজন লেখক হিসেবে এরা কঠোর, একগুঁয়ে; ব্যক্তি হিসেবে ঠিক তার উল্টো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই মানুষগুলোকে লেখক হিসেবে আর ব্যক্তি হিসেবে মেলানোটা বেশ কষ্টকর হয়। গত মাসের শেষের দিকে প্রকাশিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি লেখা “ভালোর পসরা” পড়ে অবশ্য আমাকে এই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি। লেখাটি পড়ে ব্যক্তি শেখ হাসিনা আর লেখিকা শেখ হাসিনার মধ্যে দারুণ মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম। বক্তৃতার ভাষা আর লেখার ভাষার মধ্যে অসম্ভব মিল। সেই চেনা সুর যা শোনা যায় মাঠে, ময়দানে কিংবা সংসদে। আজকের লেখার বিষয় অবশ্য আমার এটা নয়। তবে লেখায় তিনি যে ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন সেখান থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নূন্যতম শিক্ষা নিতে পারলে সেটা জাতির জন্য অত্যন্ত মঙ্গলজনক হত বলেই বিশ্বাস করি।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিভিন্ন সময় বিশেষ করে গণভবন নিয়ে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে বলে ওনার দাবী। এক কথায় ওনার সাথে ন্যাক্কারজনক, অন্য কথায় গলা ধাক্কা দিয়ে বের করা হয়েছিল। টেলিফোন লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল ইত্যাদি। কথাগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই বলতে হবে একজন সম্মানিত লোকের সাথে এধরনের আচরণ অগ্রহণযোগ্য, অনাকাঙ্খিত। বরং সম্মানের সাথে তাকে বিদায় দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করি। বাংলা প্রবাদগুলো নিজেদের বিরুদ্ধে গেলে সাধারণত স্রেফ প্রবাদবাক্য বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর লেখা পড়ে এমনই একটা প্রবাদবাক্যের কথা মনে পড়ল। “তুমি অধম তাই বলে আমি উত্তম হইব না কেন”। যারা হাই স্কুলের গন্ডি পার করেছেন, আমার ধারণা তারা সকলেই এই প্রবাদটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। সঙ্গত কারণেই ডজন খানেক ডক্টরেট ডিগ্রীধারী প্রধানমন্ত্রীর প্রবাদটি জানা না থাকার কোন যুক্তি দেখি না। প্রবাদ বাক্যেগুলোর অন্তর্নিহিত ভাব থেকে শিক্ষা নিয়ে সেটা বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর তাগিদ থেকেই মূলত এ রকমের প্রবাদ বাক্য পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলেই আমার মূল্যায়ন। সে দিক থেকে একজন শিক্ষিত প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এহেন শিক্ষা বাস্তব জীবনে আশা করাটা মোটেও অমূলক নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে প্রক্রিয়ায় গণভবন থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলেন বলে দাবী করেন, সেই তিনিই খালেদা জিয়াকে তার চেয়েও জঘন্য উপায়ে বলা যায় অনেকটা টেনে হিঁচড়ে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। আজকের মিডিয়ার বদৌলতে সে তথ্য সকলেরই জানা। শেখ হাসিনার ন্যায় হাই প্রোফাইল ব্যক্তিত্বের এমন অন্যায় আচরণে আমাদের মত ছা পোষা লোকজন চরম ব্যথিত হয়েছে। অন্তত বাকি অধম (?) লোকগুলোর মত তিনিও অধম হবেন না বলেই আশা করেছিলাম। নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রীকেকে উত্তমরূপে দেখতে না চায়? দুর্ভাগ্য এই জাতির। সেরকম বড় মনের মানুষকে প্রধানমন্ত্রী করতে পারেনি।

প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিজের বিরুদ্ধে সাজানো এবং হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের অভিযোগ তোলেন। তখনকার বিচার ব্যবস্থার বেহাল দশার বর্ণনাও ফুটে ওঠে তার কথায়। বাস্তবেই মামলার ফুলঝুড়ি ফুটেছিল তখন। কতিপয় নামের বিরুদ্ধে একের পর এক উদ্দেশ্যমূলক মামলা গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল কোন সন্দেহ নেই। বিশেষ করে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়ানো বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র মামলা দিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি, অকথ্য নির্যাতনও করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও একজন ভুক্তভোগী। সে হিসেবে রাজনীতি সচেতন দেশপ্রেমিক জনতার চাওয়া ছিল অন্তত নির্বাচিত সরকারের অধীনে যেন এগুলোর ছায়াও না থেকে। বাস্তবে পাওয়াটা হল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের শিক্ষিত এবং এতিম প্রধানমন্ত্রী অনির্বাচিত সরকারকেও টেক্কা মেরেছেন। একজন মাত্র ব্যক্তির বিরুদ্ধে ডজন ডজন মামলা দায়ের তো ঝালমুড়ির মত, হাফ সেঞ্চুরিও এখন ডাল ভাত। আর জুলুম নির্যাতনকে শুধু ৭২ থেকে ৭৫ সালের সাথেই তুলনা করা যায়। বিচার ব্যবস্থাকে এক কথায় উলঙ্গ করা হয়েছে। ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করাটাও এখন অন্যায়।

দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরায় মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে শুধু অর্ধশত মিথ্যা মামলাই করা হয়নি, বয়স্ক লোকটিকে অর্ধ বছরেরও বেশি চার দেওয়ালের মাঝে বন্দী করে অমানবিক নির্যাতনও করা হয়েছে। বিরোধী মতের হওয়া সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চাটুকারীতা করে প্রথম সারির কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা মামলা, গ্রেফতার এবং নির্যাতন-নিপীড়ন এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। শেখ হাসিনার আমলে মনে হয় না সে সুযোগের উৎপীড়ন হবে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য সকল অপকর্মের মত এখানেও মুজিব কন্যার দারুন সখ্য। যেখানে অভিযোগ তোলার আগেই মামলার হিড়িক পড়ে যায়, সেখানে সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলার পরও প্রথম আলো সম্পাদক দিব্যি সংশয়হীন। অথচ অন্যদের বেলায় যেই প্রক্রিয়ায় একের পর এক মামলা দায়ের করা হচ্ছে, তাতে সরকার সংশ্লিষ্টদের জ্ঞানের তারিফ না করে পারা যায় না। টাকা পাচার মামলায় কোকো তো ২১ আগস্ট মামলায় তারেক রহমান, দশ ট্রাক মামলায় নিজামী তো ২১ আগস্ট মামলায় মুজাহিদ। বাহ, চমৎকার। মনে হচ্ছে নিজামী, মুজাহিদ, তারেক, কোকো অপকর্মগুলো শেয়ার বাজার থেকে লুট করা টাকার মতই বাগ বাটোয়ারা করে করেছেন? বেচারা খন্দকার দেলোয়ার হোসেন বড্ড বাঁচা বেচেছেন। জীবিত থাকলে বৃদ্ধ বয়সে নিজামী মুজাহিদদের মত না জানি কোন মামলায় জড়িয়া যেতেন! ভীষণ অবাক হয়েছি মামলাগুলোতে খালেদা জিয়ার নাম না দেখে! ২১ আগস্ট, দশ ট্রাকসহ কত মামলাই তো আছে একটিতে জড়িয়ে দিলেই তো হত। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তো হয়েই গিয়েছিল। ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটি না ভাঙ্গলে অবশ্য ওটাকে “সাবজেল” হিসেবে আমার প্রথম পছন্দ ছিল!

আগেই উল্লেখ করেছি আমাদের শিক্ষিত প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার কিছু ক্ষেত্রে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কৃতিত্বের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের পেছনে ফেলছেন। তথাপি সেই সময় নিরপরাধ অনেক লোক হয়রানির স্বীকার হলেও কোন অপরাধী ব্যক্তি কিংবা সাজাপ্রাপ্ত লোকের রেহাই মিলেছে এমন খবর শোনা যায়নি। ওনারা মনে হয় কিছুটা নির্দয় ছিলেন! শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত, ধারণা করা হয় যিনি প্রধানমন্ত্রীর আদেশ ছাড়া চুল পরিমান নড়েন না সেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি বৃদ্ধ বয়সে অতটা নির্দয় হতে চাননি। দেদারসে তিনি সাজাপ্রাপ্ত এমনকি ফাঁসির আসামীদেরও একের পর এক খাল্লাস করছেন। সম্ভবত “ক্ষমা মহৎ গুণ” কথাটি ওনাদের খুব ধরেছে। “ক্ষমা মহৎ গুণ” বাক্যটি প্রবাদ কি না জানি না। তবে স্কুল জীবনেই কথাটির সাথে পরিচয় ঘটেছিল। ক্ষেত্রবিশেষে অনেককে এটা বলে ছবকও দেওয়া হয়েছে। ফাঁসির আসামি, খুনি কিংবা দাগি অপরাধীকে ক্ষমা করা যে মহৎ কাজ হতে পারে এটা স্বাভাবিক কারনেই তখন চিন্তা চেতনার বাইরে ছিল। এমন সব অপরাধীকে তখনই ক্ষমা করা যেতে পারে যখন তাদের কাছ থেকে কোন ধরনের মামুলি অপরাধ হবে না মর্মে গ্যারান্টি পাওয়া যায়। বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ক্ষমাপ্রাপ্ত সরকার দলীয় সেই সকল খুনী কিংবা দুষ্কৃতকারীরা মামুলি তো দূরের কথা জড়িয়ে পড়ছেন আরও ভয়ানক অপরাধের সাথে। একদিকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ভিন্ন মতাবলম্বী লোকদের হেনস্তা, অন্যদিকে নিজ দলের সন্ত্রাসী-দুষ্কৃতকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা। এই হল সোনার বাংলাদেশের বর্তমান হালচাল। শান্তিতে বসবাস করার নূন্যতম সুযোগটুকুও এখানে নেই। অথচ প্রধানমন্ত্রী দেশে শান্তি ছাড়া কিছুই দেখেন না। উল্টো যারা দেশের বেহাল দশার কথা বিভিন্ন মাধ্যমে তুলে ধরছেন তাদেরও একহাত নিতে ভুল করেননি।

অনেক গুনে গুনান্বিত আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন বাগ্নীতো বটেই এখন বেশ লেখালেখিও করছেন। কিছুদিন আগেই খালেদা জিয়ার সাথে ওনাকে তুলনা করতে বারণ করেছেন। তুলনা হয় কি করে? একেতো হালি হালি ডক্টরেট (?) ডিগ্রীধারী, তার উপরে জাতির জনকের (!) কন্যা। এখন তো পুরোদস্তর লেখিকা। খালেদা জিয়ার অবশ্য এই মহামুল্যবান (?) গুনগুলো নেই। প্রধানমন্ত্রী আর কয়েকটি ক্ষেত্রেও খালেদা জিয়ার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। বেফাঁস মন্তব্যের কথা না হয় বাদই দিলাম, অহেতুক মিথ্যা বলায় তার হৃদয়টা একটুও কাঁপে না। মানুষের সেন্টিমেন্ট অথবা ধর্ম নিয়ে খেলা করায়ও বেশ পারদর্শী। তিনি নিজের জ্ঞানে কতটুকু চলতে পারেন সেটা জানলে ফিরিস্তিটি আরেকটু লম্বা করা যেত। সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থা উঠিয়ে দিলেন তিনি কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে। মঈন উদ্দীনকে সেনাপ্রধান রাখা না রাখার বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বছর দুয়েক আগে বলেছিলেন “সব কিছুরইতো একটা শেষ আছে”। পরম পরিতাপের বিষয় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা শুধু অন্যের বেলায়ই বুঝেন, নিজের বেলায় বুঝেন না। নিজের বেলায় বুঝলে সেটা দেশ ও দশের জন্য নি:সন্দেহে সুখের খবর হত। এ সরকারের আমলে মামলার হাফ সেঞ্চুরি উদযাপন করা হলেও সেঞ্চুরি হয়নি। সরকারের সবচেয়ে বড় জম নিজামী, মুজাহিদ তো ইতিমধ্যেই শ্রীঘরে। এই আমলে মুক্তি মেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আরেক জম তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়ে দেশে আসার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। বাকি থাকলেন শুধু খালেদা জিয়া। ওনাকে দিয়ে মামলার সেঞ্চুরি উদযাপন করাটা মন্দ হয় না। চার দেওয়ালে বন্দী করার কাজটা সাঙ্গ করাও সহজ হয়।