ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

বিশদ বর্ণনার চেয়ে মূল উদ্দেশ্যটা বুঝানোর জন্য একটি ছবিই যথেষ্ট। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আকা “মোনালিসা” ছবিটা এতই রোমান্টিক যা বাস্তবতাকেও হার মানায়। ছবির মাধ্যমে প্রকৃতি এমনকি সমাজের নিদারুন বাস্তবতাগুলোও ফুটিয়ে তোলা যায় মনের মত করে। সমাজে ঘঠিত এমন কিছু সত্য আছে যা ছবির মাধ্যমে যতটা ফুটিয়ে তোলা যায়, অন্য কোনভাবে ততটা যায় না। আর এই সত্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একজন চিত্রশিল্পী কিংবা আলোকচিত্র শিল্পীকে কখনও কখনও চড়া মূল্য দিতে হয়। ক্ষমতাবান মানুষের রোষানলে পড়তে হয় অনেক সময়। হৃদয়ে দাগ কাটা বহু ছবি অঙ্কন করায় ফ্রান্সের রাজা ফোঁসোয়া এক (François I ) যেখানে দ্য ভিঞ্চিকে নিজ দেশে আমন্ত্রন করেছিলেন ঠিক তেমনিভাবে মকবুল ফিদা হুসেনকে দেশান্তরি হতে হয়েছে। এমন হাজারো ঘটনা ঘটে চলেছে পথে প্রান্তরে।

গতকাল ১৫ আগস্ট ছিল আমাদের জন্য একটি কালো দিন। এই দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে জীবন দিতে হয়েছিল। রাজনৈতিক কিংবা দেশের প্রয়োজনের কথা যতই বলা হোক এ দিনের বর্বরতা ছিল হৃদয় বিদারক। ব্যক্তিগতভাবে এমন বর্বরতা দ্বিতীয়টি না ঘটলেই আমি খুশি। তবে ঘটনা যখন ঘটেই গেছে, কিইবা করার আছে আমাদের? বড়জোর বিচারের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি প্রদান অথবা মরহুমের রুহের মাগফিরাতের জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা। আমার মত আম জনতার অবশ্য দোয়া করা ছাড়া অন্য কোন গত্যন্তর নেই। সাধারন জনগনের মৌলিক চাহিদা পূরনে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হাই প্রোফাইল রাজনীতিবিদেরা তাদের নিজ নিজ দ্বায়িত্ব সঠিকভাবে আঞ্জাম দিতে পারলে ১৫ আগস্টের মত ঘটনা না ঘটার ব্যাপারে কিছুটা নিশ্চয়তা দেওয়া যায়।

সারাবিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে ক্ষিপ্রগতিতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তখনও দুমুঠো খাবারের জন্য মানুষকে হাহাকার করতে হয়। সোমালিয়াতে গত কয়েক মাসে হাজার হাজার শিশু অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছে। আফ্রিকার অন্য কয়েকটি দেশের অবস্থাও ভয়াবহ যেখানে সাধারন মানুষের কোন অধিকার নেই বললেই চলে। শাসকদের সীমাহীন নৈরাজ্য আর সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির সম্পদ লিপ্সা জনমানুষের চলার পথকে ক্রমেই কণ্টকপূর্ণ করে তুলছে। আমাদের প্রানের বাংলাদেশও কম যায় না। পেটপুরে আহার করার জন্য অনেক শিশু-কিশোর, আবাল-বৃদ্ধকে নিদারুন কস্ট সহ্য করতে হয়। তারপরও যদি দুমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা মিলত সেটাকে ভালই বলা যেত। সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলোর একটি বাসস্থান এর জায়গা এখন ফুটপাত কিংবা পার্কে খোলা আকাশের নিচে। বস্ত্রের অধিকার এখন কোনরকম লজ্জা স্থানটা ঢাকা। আর অন্নের অধিকার এখন শাসকগোষ্ঠীর পদতলে।

এ দেশের সহস্র বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পেটপুরে আহার করার জন্য সাধারন মনুষকে ক্ষমতাধর এবং শাসকদের কত রকম নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে। আর এখন তো দিব্যি আহার নিয়ে মশকরা করা হয়, ঠাট্টা করা হয়। যেখানে সরকারের দ্বায়িত্ব প্রতিটি মানুষের অন্নের নিশ্চয়তা প্রদান সেখানে সরকারের পক্ষ থেকেই জনগনকে না খাওয়া কিংবা কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। জনগনের টাকায় দামী বাড়ী, দামী গাড়িতে চড়ে অন্যদের খাবারের জন্য ব্যবস্থা করা হয় কাঙ্গালিভোজের। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর এ ধরনের আয়োজন বিবেক বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই লক্ষ্য করছি। বড়ই আশ্চর্য! যাদের কর্তব্য হচ্ছে মানুষকে ঘরে ঘরে খাবার পৌছে দেওয়া তারাই কিনা নেতার মৃত্যু দিবসে এক বেলা খাওয়ানোর নামে গরীব মানুষদের দুরাবস্থা নিয়ে চরম বিদ্রুপে লিপ্ত হচ্ছে।

উপরের ছবি থেকে স্পষ্টতই দেশের করুন অবস্থা প্রতীয়মান হয়। কাঙ্গালি ভোজে প্রদত্ত এক থালা খাবারের জন্য যেভাবে জনতা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তাতে মানবতারই দীনহীন রূপ প্রতিফলিত হয়েছে। ছবির ছেলেগুলোর চেহারায় পরিষ্কার কষ্টের চিহ্ন খালি চোখেই স্পষ্ট। শুধু মুজিব কিংবা জিয়ার মৃত্য দিবসে জনগনের ভাগ্য নিয়ে এভাবে খেলায় মত্ত হওয়াটা কতটা সৌজন্যমূলক সেটা বিচারের ভার জনগনের। তবে কাঙ্গালিভোজের নামে জনগনের দুরাবস্থা নিয়ে এভাবে তামাশায় লিপ্ত হলে দোয়া তো দূরের কথা বদদোয়াও মিলবে কিনা সন্দেহ। যাদের কাজই হচ্ছে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে চেষ্টা করা তারাই যদি কাঙ্গালিভোজের মাধ্যমে দেশের একটি জনগোষ্ঠিকে কাঙ্গাল হিসেবে সার্টিফিকেট প্রদান করে তাহলে তাদের ক্ষমতায় থাকার কোন নৈতিক অধিকার নেই। প্রশ্ন জাগে দেশে এত কাঙ্গাল তাহলে সরকার কাজ কি বসে বসে আঙ্গুল চোষা?

***
ছবি: বাংলানিউজ২৪