ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে গোপন ক্যামেরার ফাদে আটকা পড়ছে উঠতি বয়সী তরুনী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী মহিলারা পর্যন্ত। এক শ্রেণীর উশৃঙ্খল এবং বেহায়া নারী পুরুষ এক্ষেত্রে নেপথ্যে থেকে কুকর্মগুলো অনবরত ঘটিয়ে যাচ্ছে। আনকোরা ছলিমুদ্দি, কলিমুদ্দি থেকে আরম্ভ করে সমাজের নামিদামি সাধক (!) শ্রেণীর বিশেষ কিছু লোকও নিজেদের নষ্ট খায়েশ পূরণের ঘৃন্য খেলায় মেতে উঠেছে। আর ইন্টারনেটের বদৌলতে মুহূর্তেই তাদের নোংরামি ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। এ থেকে সমাজের সার্বিক করুণ অবস্থার একটা ভয়াবহ চিত্র পরিষ্কার বুঝা যায়। এ সকল অপকর্মের মাধ্যমে যুব সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং হবে কোন সন্দেহ নেই। বিশেষ করে একের পর এক ঘটনা ঘটার পরও কোন উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা না নেওয়ায় এরা শাসক এবং সুশীল শ্রেণীর এক প্রকার আনুকুল্য, অন্যভাবে বললে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে চলেছে। যার ফলে অশ্লীলতা বন্ধ হওয়ার কিংবা হ্রাস পাওয়ার কোন লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

নিরাপত্তা কিংবা অন্য কোন প্রয়োজনে কোন স্থানে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করার মধ্যে দোষের কিছু দেখি না। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে গোপন ক্যামেরা অত্যন্ত সাধারণ একটি ব্যাপার। মানুষের নিরাপত্তা বিধান ও চুরি ছিনতাই রোধ করতেই মূলত ক্যামেরা স্থাপন করা হয়ে থাকে। তবে অন্যান্য প্রয়োজন যেমন ওভার স্পীডে গাড়ি চালানো রোধ করতে অনেক সময় রাস্তার পাশে বন জঙ্গলের মধ্যেও ক্যামেরা বসানো হয়। রাস্তার পাশের ঝোপ ঝাড়ের মধ্যে লুকায়িত ক্যামেরা আবিষ্কার করা সত্যিই কঠিন। যার কারণে গাড়ি চালকদের সব সময়েই অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়। অন্যথায় ওভার স্পীডে গাড়ি চালানোর অপরাধে ক্যামেরার কল্যাণে জরিমানা গোনার সম্ভাবনা থাকে। নিরাপত্তার জন্য নূন্যতম হুমকি হতে পারে এমন যে কোন স্থানে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করা যুক্তিসংগত। তাই বলে নিরাপত্তার কথা বলে টয়লেটে ক্যামেরা স্থাপন করার ব্যাপারটি কেউই মেনে নিবে না। তবে মানুষের দিন দিন যে অধপতন হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে টয়লেটেও গোপন ক্যামেরার সন্ধান মিললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের নামকরা প্রসাধন ও অঙ্গসজ্জার দোকান পারসোনার স্পা কক্ষের পোষাক পরিবর্তনের জায়গায় গোপন ক্যামেরার অস্তিত্ব সুস্থ মস্তিষ্কের সকল ব্যক্তিকেই মারাত্মকভাবে আহত করেছে। সংগত কারণে এটা নিয়ে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার গুড়ে বালি ঢেলে পারসোনা যে নগ্ন নজির সৃষ্টি করেছে তা শুধু লজ্জাজনকই নয়, সমাজের জন্যও মারাত্বক হুমকি। দেশে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির সংখ্যা যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে সকলেরই প্রত্যাশা ছিল পারসোনার মত জায়গায় এমন অপকর্ম ঘটার পর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অথচ দ্বায়িত্বশীল মহলের পক্ষ থেকে এখন ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে ভিডিওতে আপত্তিকর কিছু পাওয়া যায়নি। ভিডিওতে কিছু পাওয়াতো পরের কথা, পোষাক পরিবর্তনের জায়গায় ক্যামেরা থাকাটাইতো শাস্তিযোগ্য এক মস্ত বড় অপরাধ। ভিডিওতে আপত্তিকর কিছু ছিল না বলে অপরাধীদের খালাস দিয়ে বিশেষ স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করাকে বৈধতাই দেওয়া হচ্ছে যা ভবিষ্যতে পোষাক বিক্রেতাদের ট্রায়াল রুম কিংবা মহিলা ব্যয়ামাগারে ক্যামেরা স্থাপন করতে অনুপ্রেরণা যোগাবে।

পত্রিকা মারফত জানা গেল, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পারসোনা কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘ক্যামেরা ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে’। এত বড় আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনার জন্ম দেওয়ার পর যেখানে কানিজ আলমাস গংদের আত্মপক্ষ সমর্থন করে দেশবাসীর কাছে দুঃখপ্রকাশসহ ক্ষমা প্রার্থনা করাটাই যুক্তিযুক্ত ছিল, উল্টো তারা পুরো দেশবাসীকেই ধমক দিয়ে বসল। কি এমন বিশেষ ব্যক্তি বনে গেছেন মিসেস খান সেটা বুঝা বেশ মুশকিলই মনে হচ্ছে। অথবা হতে পারে যারা সুশীল শ্রেণীর লেজুড়বৃত্তি করে তাদের জন্য দেশ ও জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোও জায়েয। কানিজ আলমাসদের হুমকিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের মারাত্মক অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। ঠুনকো অভিযোগেই যেখানে জনগণ অমানসিক হয়রানি ও নির্যাতনের স্বীকার হয়, যেখানে সংবাদ মাধ্যমে বাঘা বাঘা মন্ত্রীদের অনবরত একের পর এক বক্তব্য প্রকাশ হয়, সেখানে এত বড় স্পর্শকাতর একটি ঘটনা ঘটার পর সরকারের চুপ মেরে থাকা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। ঘটনাস্থলে দ্বায়িত্বরত একজন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত আর দায়সারা গোছের গতানুগতিক একটি তদন্ত কমিটি গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ সরকারের কার্যকলাপ। ভাগ্যিস কোন মন্ত্রী এর মধ্যে অন্তত জঙ্গি সংশ্লীষ্টতা অথবা যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়া বানচালের কোন যোগসাজোস খুঁজে পান নি। বর্তমান সরকারের নিজেদের চেয়ে প্রতিবেশীদের জন্যই অনেক বেশি দরদ। তাই হয়ত দেশীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে মাথা ঘামানোর সময় তাদের নেই। অথবা হতে পারে সরকার সংশ্লিষ্টদের নিশ্চিত করা হয়েছে তাদের পরিবারের কেউ এ ধরনের ঘটনার স্বীকার হবেন না।

পারসোনার এমন হীন কাজের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিটি সংবাদ মাধ্যম, ব্লগ, ফেইসবুকসহ সকল সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বাধ সেধেছে শুধু সুশীল মিডিয়াগুলো। দাড়ি টুপিওয়ালা লোকদের ক্ষেত্রে পান থেকে চুন খসলেই সুশীলদের বিবৃতির ফুলঝুড়ি ফোটে। নারী স্বাধীনতা এবং অধিকার নিয়ে তাদের দৌড়ঝাপের শেষ নেই। অথচ পারসোনার গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা পদদলিত হলেও সুশীলদের মুখে কুলুপ আটা। ঘটনার দিন থেকে চারদিন পর্যন্ত তাদের খুঁজেই পাওয়া যায় নি। ঘটনাটি আদৌ তাদের জন্য কোন বিশেষ খবর হতে পারে নি। অথচ ঘটনার চারদিন পর সুশীলদের মুখপাত্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দালাল একটি পত্রিকা ঘটনাটিকে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করতে মহাব্যস্ত হয়ে পড়ে। পারসোনা কর্তৃপক্ষ এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের মধ্যে একটি হাস্যকর বিবৃতি প্রচারের ক্ষেত্রেও সুশীল পত্রিকাটি গুরুদ্বায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সুশীল সমাজ কর্তৃপক্ষ (!) দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতামূলক বিবৃতি প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানোর কাজটাও বেশ ভালভাবেই আঞ্জাম দিয়েছে। তবে তাদের জন্য দুঃসংবাদ এখন আর ওত সহজে মানুষকে বোকা বানানো সম্ভব নয়। মানুষ বুঝতে পেরেছে সমঝোতামূলক বিবৃতিটি নিছক একটি কৌতুক ছাড়া কিছুই নয়।

এর আগেও গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বর্তমান মহাজোট সরকার কর্তৃক এ ধরনের হাস্যরস সৃষ্টিকারী বিবৃতি দিতে কিংবা মামলা করতে অনেককে বাধ্য করা হয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কারাগার থেকে লেখা আবদুল জলিলের বিবৃতি সম্বলিত চিঠি এবং হাসমত আলী কর্তৃক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের। সোজা কথায় ভয়ভীতি দেখিয়েই এগুলো করানো হয়েছে। পারসোনার সমঝোতামূলক বিবৃতির ক্ষেত্রেও যে অতীতের এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি তার নিশ্চয়তা পাওয়া ভার। গোপন ক্যামেরা আবিষ্কার অতঃপর বিবৃতির মাধ্যমে সুশীল মহলের এমনই আচরণ যে পোষাক পরিবর্তনের জায়গায় ক্যামেরা বসিয়ে খারাপ কিছু করা হয় নি। গোপন ক্যামেরা বসিয়ে মন্দ বাসনা পুরনে যে সুশীলদের এতই সখ তাদের প্রতি হৃদয় থেকে ঘৃণা প্রকাশ করা ছাড়া আমাদের মত আম জনতার আর কিইবা করার আছে। পারসোনার ঘটনা থেকে আরও একবার তথাকথিত সুশীল শ্রেণীর মুখোশ উম্মোচিত হল। বারবার তারা বলছেন ভিডিওতে আপত্তিকর কিছু পাওয়া যায় নি। প্রশ্ন জাগে আপত্তিকর কিছু পেলে তারা কি করতেন? খুশি হতেন নিশ্চয়ই?

পরিশেষে একটা কথা পরিষ্কার বলা প্রয়োজন ভিডিওতে কিছু পাওয়া যাক বা না যাক পোষাক পরিবর্তনের স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করে পারসোনা তথা সুশীলদের দোসর কানিজ আলমাস খান যে অপরাধ করেছেন তার উপযুক্ত শাস্তি সকলেরই কাম্য। আজকের হাজারো পরিমলদের উত্থানে কানিজ আলমাসদের ভুমিকা কোন অংশে কম নয়। বারবার অপরাধ করার পরও সুশীল শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় একটি গোষ্ঠী অনবরত রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। মাত্র কিছুদিন আগেও এক তরুনী মডেলের শ্লীলতাহানী করা অরুন চৌধুরীকে শাস্তিতো দূরের কথা সুশীল মিডিয়া চ্যানেল আই চাকুরি দিয়ে পুরষ্কৃত করেছে। এ সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে আশু ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সোনার বাংলাদেশকে রসাতলে পাঠাতে খুব একটা সাধনা না করলেও চলবে।