ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

সৌদী আরবে হত্যা এবং ডাকাতির অভিযোগে আট বাংলাদেশীর শিরশ্ছেদের ঘটনা অনেকটা পুরনো। তবে বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশীদের মধ্যে ঘটনার রেশ এখনও পুরোপুরি বিদ্যমান। ব্যাপারটি নিয়ে প্রতিটি সংবাদ মাধ্যম বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আলোচলায় সরগরম। সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবির মানবতাবোধের (?) বদৌলতে বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। আট বাংলাদেশীর জন্য মানবাধিকার সচেতন আমাদের দেশের সেক্যুলার হিসেবে পরিচিত কিছু লোকের দরদ এবং মায়াকান্না বেশ লক্ষণীয়। অন্যদিকে ইসলামিস্ট কিছু লোকও এটার মধ্যে অন্য কিছুর গন্ধ খুজে পাচ্ছেন। আমরা সাধারন মানুষ আছি ধোঁয়াশার মধ্যে। পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকে হাবুডুবু খাচ্ছেন সন্দেহের দোলাচলে।

রকমারি সমালোচকদের মধ্যে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন আট বাংলাদেশী আদৌ কোন অপরাধের সাথে জড়িত ছিল না, যদিও এটা যে তারা স্রেফ আবেগতাড়িত হয়ে বলছেন তা বলাই বাহুল্য। আট বাংলাদেশী অপরাধী ছিল কি ছিল না সেই বিতর্কে না যাওয়াই শ্রেয়। যেহেতু কয়েক বছর ধরে একটা বিচার প্রক্রিয়া শেষে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে সেই হিসেবে বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারেও কোন মন্তব্য নেই। আট বাংলাদেশী যদি নিরপরাধ হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ তাদের নিরাশ করবেন না। সহনশীলতার খাতিরে যারা দেশি ভাইদের নিরপরাধ বলছেন তাদের কথার উত্তর দিতে যাওয়াটাও সময়ের অপচয়। স্রেফ যারা মুর্খতাবশত ইসলামের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বিবেকের তাড়নায় সেই সকল সেক্যুলার এবং নব্য ইসলামিস্ট সমালোচনাকারীদের সমালোচনার কয়েকটি জবাব দেওয়া দায়িত্ব মনে করি।

সমালোচকদের অধিকাংশই শিরশ্ছেদের ঘটনায় ইসলাম এবং মুহাম্মদ (স) এর মধ্যে মারাত্মক ত্রুটি এবং অমানবিকতার (!) সন্ধান পেয়ে শান্তির ধর্ম ইসলামকে সেকেলে হিসেবে গালি দিয়ে মজা হাছিল করছেন। এই সম্প্রদায়ের মূল কথা হচ্ছে মানবতার এই আধুনিক যুগের সাথে অন্যান্য ধর্ম যেভাবে যায়, ইসলাম সেভাবে যায় না। ইসলাম ধর্মকে নিয়ে তাদের ভাবনার অন্ত নেই। সেক্যুলার মুসলমান দাবীদার এই লোকগুলোর নামাজ রোযায় কোন সমস্যা নেই, ইসলামের অন্য সব কিছুতেই সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক অসংগতিও খুজে পান! আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল মুসলমান নামধারী এই সেক্যুলার জনতা ইসলামের ঠুনকো বিষয়ে অহেতুক ভুল ধরতে যতটা তৎপর, অন্যান্য ব্যাপারে ঠিক ততটাই নিশ্চুপ। এই সেক্যুলারমহল মানবতা আর মানবাধিকার জপতে জপতে মুখে ফেনা তুলে। অথচ বাংলাদেশের পদে পদে মানবতা চরমভাবে লঙ্ঘিত হলেও এই মানবতার দরদীরা মুচকি হাসিতো হাসেনই, কখনও কখনও এগুলোর পক্ষে দিব্যি সাফাই গাইতেও শোনা যায়। একটা নির্দিষ্ট বিচার প্রক্রিয়া শেষে অপরাধীদের ধড় থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে শাস্তি কার্যকর করা যদি মানবতা বিরোধী হয়, তাহলে কোথায় থাকে তাদের মানবতা যখন আইন বিচারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নিরপরাধ মানুষদের প্রকাশ্য সাপের মত পিটিয়ে মানুষ মেরে একজন মাকে সন্তানহারা করা হয়, একজন শিশুকে পিতৃহারা করা হয়, একজন নারীকে বিধবা করা হয়। তখন স্বপ্রণোদিত হয়ে কোন বিচারপতিকে দেখা যায় না রূল জারি করতে কিংবা বিবেকের তাড়নায় কোন আইনজীবিকেও দেখা যায় না হাইকোর্টে রিট আবেদন করতে। যে দেশের সরকার শুধুমাত্র শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য একজন লোককে ভিনদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রের কাড়ি কাড়ি টাকা নষ্ট করছে, তাদের মুখে শাস্তির ধরন নিয়ে কথা বলা একেবারেই বেমানান। এদের মানবতা প্রেম ভয়ঙ্কর একপেশে। একাত্তর সালে অগনিত ইজ্জত ভুলুন্ঠিত মা বোনেদের প্রতি তাদের করুণা আর সহানুভূতির শেষ নেই। অথচ হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েও খালেদা জিয়ার ইজ্জত তাদের জন্য পরিহাসের বিষয়।

কুকর্মের পিছনে সেক্যুলারদের দৌড়ঝাপ সকলেরই জানা। বসে নেই নতুন যুগের ইসলামিস্টরাও যারা ইসলামকে ঘষেমেজে একটা আধুনিক রূপ দিতে বদ্ধ পরিকর। এই গোষ্ঠির দাবী সৌদী আরব যেহেতু পুরোপুরি ইসলামী রাষ্ট্র নয় এবং রাজতন্ত্রও যেহেতু ইসলাম সমর্থন করে না, তাই অপরাধীদের শিরশ্ছেদ তথা শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন করার এখতিয়ার সৌদীয়ানদের নেই। বড়ই হাস্যকর তাদের দাবী। এতদিন তাদের এই যুক্তি কোথায় ছিল? এমনতো নয় যে সৌদী আরবে এটাই প্রথম শিরশ্ছেদের ঘটনা। সেখানেতো এর আগেও অনেক শিরশ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। একই অপরাধে অভিযুক্ত সৌদী নাগরিকদেরকেও অভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়। আর সৌদী আরবে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই শরীয়াহ আইন চালু রয়েছে। স্বদেশীয় ভ্রাতাবর্গের প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ নব্য ইসলামিস্টরা এভাবে না করলেও পারতেন। তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম সৌদীয়ানদের শরীয়াহ আইন প্রয়োগ করার কোন অধিকার নেই। তাতেইবা বিশেষ কি পার্থক্য ধরা পড়ে। খুনের শাস্তি তো বাংলাদেশেও মৃত্যদন্ড। সৌদী আরবেও তো মৃত্যদন্ডই কার্যকর করা হয়েছে। অন্য কিছু করা হয় নি। শুধুমাত্র মৃত্যদন্ড প্রয়োগ পদ্ধতিটা ছিল ভিন্ন, তাই নয় কি? যেহেতু তারা বাংলাদেশের মৃত্যদন্ডের বিরোধীতা করেন না, তাই এর মাধ্যমে পরোক্ষোভাবে তারা আল্লাহর দেওয়া বিধানেরই বিরোধীতা করছেন কিনা সেটা বিচারের ভার সচেতন মহলের উপর। তাদের আরেকটি যুক্তি কানাডা, ভারতসহ কয়েকটি দেশের অপরাধীদের যেহেতু একই শাস্তি দেওয়া হয় না, তাই বাংলাদেশীদের জন্য এই ধরনের শাস্তি প্রয়োগ করা জুলুম। আমার ধারনা যারা এই ধরনের যুক্তিতর্কে লিপ্ত হন তারা যথেষ্ট জ্ঞান-বুদ্ধির অধিকারী, শুধু জায়গামত সেটার সঠিক প্রয়োগ করেন না। ঐ সকল দেশের সাথে মৃত্যদন্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের ক্ষেত্রে সৌদী আরবের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে যা বাংলাদেশের সাথে নেই। সুতরাং কিসের ভিত্তিতে সৌদী কর্তৃপক্ষ অপরাধীদের আমাদের দেশের সরকারের নিকট হস্তান্তর করবে সেই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই ইসলামিস্টদের জানা আছে।

তথাকথিত মানবতা আর মানবাধিকার প্রেমিকদের জন্য বড্ড মন খারাপ হয়। তাদের বোধবুদ্ধি আর বিবেকের জীর্ণদশা প্রত্যক্ষ করেও খুব মায়া লাগে। তাদের পক্ষপাতদুষ্ট মানবতা আধুনিক হতে পারে, কিন্তু নিজেরই অমানবিকতার বিষে জ্বলে পুড়ে মরমর অবস্থা। সেদিকে তাদের মোটেও ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজ দেশে মানবতার আসল সংজ্ঞাটাই পরিবর্তিত, দেখেও না দেখার ভান করা যেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বীকার এই বিশেষ জনগোষ্ঠির ক্ষেত্রে মানবতার কোন বালাই নেই। মানবতার এই সকল ফেরিওয়ালাদের স্পস্ট বাতানো প্রয়োজন নিজের দেশের সকলের জন্য মানবতা প্রতিষ্ঠা করে তারপর অন্যদের বলুন। ইসলামের চেয়ে মানবতার ধর্ম পৃথীবিতে কখনই ছিল না, ভবিষ্যতেও আসবে না। কালো চশমা পরিহার করুন। কালো চশমায় সাদা জিনিসও কালো মনে হয়। ইসলামকে নিয়ে অযথা নাড়াচাড়া না করে নিজেদের মধ্যে সর্বাগ্রে ইসলাম প্রদত্ত মানবতা আর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করুন। অপরাধীদের হয়ে কথা না বলে অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলুন। তাহলে দেশও বাঁচবে, দশও বাঁচবে। বাংলাদেশকে নতুন করে চিনবে বিশ্ব।