ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

পরাধীনতার জাল থেকে মুক্তি পেতে, নিজ ভূমিকে স্বাধীন করতে অনেক জাতিই রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। বিসর্জন দিতে হয়েছে অগণিত তাজা প্রাণ। কিন্তু বাংলা ভাষা ছাড়া নিজ ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে পৃথিবীতে এমন নজির সম্ভবত দ্বিতীয়টি নেই। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবীতে এ দেশের ছাত্র জনতার আন্দোলন এবং আত্নত্যাগই বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আজ বিশাল মহিমায় স্থান করে দিয়েছে। এই ভাষার জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছেন রফিক, শফিক, সালাম, বরকতসহ আরও অনেকে। তাদের এ মহান আত্মত্যাগ কোন এক মৌসুমের ভাষা প্রেমের জন্য ছিল না, তাদের এ আত্মত্যাগ ইতিহাসে নাম লেখানোর উদ্দেশ্যে ছিল না, তাদের এ আত্মত্যাগ রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল না, তাদের এ আত্মত্যাগ মানুষের বাহবা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল না; তাদের এ আত্মত্যাগ ছিল বাংলা ভাষাকে স্থায়ীভাবে এ দেশের মানুষের প্রানের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। আমরা ইতিহাসের এই মহনায়কদের আত্মত্যাগের ন্যায্য মূল্য দিতে পারি নি।

বাংলা ভাষাকে এখন শুধু ফেব্রুয়ারি মাসের ভাষায় রুপান্তর করা হয়েছে। অনেকেই বাংলা ভাষার মৌসুমী প্রেমিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে যারপনারই ধন্য হয়েছে। বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এখন শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। এগুলো কি পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে কিনা তা আমার কাছে অত্যন্ত অস্পস্ট। সারা বছর যারা শুদ্ধ করে একটা বাংলা শব্দ উচ্চারন করে না, ফেব্রুয়ারি মাস আসলে তাদের বাংলা ভাষার জন্য অনেক দরদ দেখা যায়। সারা বছর যাদের ঘরে হিন্দী চ্যানেল ছাড়া চলে না, ফেব্রুয়ারি মাসে অন্য ভাষায় গান গাইলে তাদের ইজ্জত মানের প্রচণ্ড হানি হয়। সারা বছর যারা প্রবাসে হিন্দীতে কথা বলে আর নিজেদেরকে ভারতীয় বলে পরিচয় দেয়, ফেব্রুয়ারি মাস আসলে তারা ভাষানুষ্ঠান করে। আশ্চর্য! বড়ই আশ্চর্য!

যে কোন ভাষা জানা দোষের কিছু নয়। বরং আমি মনে করি একটি বাড়তি ভাষা জানতে পারাটা কৃতিত্বের। অন্য ভাষায় কথা বললে যেমন বাংলা ভাষার মর্যাদা কমে না, তেমনি অন্য ভাষায় গান গাইলে বা গান শুনলেও বাংলা ভাষার সম্মানের কোন ঘাটতি হয় না । বাংলা ভাষার মর্যাদা হ্রাস পায় যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়, যদি ভাষা নিয়ে মিথ্যা ইতিহাস সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালানো হয়, যদি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে ভাষা আন্দোলনকে ব্যবহার করা হয়, যদি ভাষা সৈনিকদের অবদানে অন্য কাউকে শরীক করা হয়। অথচ এক শ্রেনীর মিডিয়াতে অহরহ বাংলাকে বিকৃত করে পেশ করা হচ্ছে, এমনকি ভাষা আন্দোলনের অনুষ্ঠানেও এমনটি করা হচ্ছে। এক শ্রেনীর লোকজন ভাষা নিয়ে বিকৃত ইতিহাস সৃষ্টির তোড়জোর চালাচ্ছে, ভাষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আমি অবাক হই বছরের বছর এরকম করা হলেও তথাকথিত ভাষাপ্রেমিকদের কখনও প্রতিবাদ করতে দেখা যায় নি।

এখন ভাষা নিয়ে রাজনীতির মাঠও গরম হয়। অথচ বাস্তব ইতিহাস হচ্ছে ভাষা আন্দোলন কোন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা ছিল না, বরং এটি ছিল সমগ্র জাতির চাওয়া; দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহনে একটি জাতীয় আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনে কোন ধরনের ভূমিকা না থাকার পরও যখন কাউকে কৃতিত্ব দেওয়া হয় খুবই বেদনাহত হই। আরও বেশি খারাপ লাগে যখন দেখি এক শ্রেনীর ভাষা সৈনিকরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদটুকুও করে না। এই সকল ভাষা সৈনিকদের চাওয়া পাওয়া আর সালাম, বরকতের চাওয়া পাওয়ার মধ্যে আমি পার্থক্য খুঁজে পাই। মৌসুমী ভাষা প্রেমিক আর ভাষা আন্দোলন নিয়ে ইতিহাস বিকৃতকারীদের প্রতি হৃদয়ের সবটুকু ঘৃনা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করি। বাংলা ভাষাকে শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে নয়, বাংলা ভাষাকে ভালবাসি প্রতিটি ক্ষনে, প্রতিটি মুহূর্তে।