ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

মানুষের মস্তিষ্কটি আসলে মুখস্থ করার জন্য তৈরি হয়নি। মস্তিশষ্কের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো চিন্তা করা, চিন্তা করে সমস্যার সমাধান করা। চিন্তাশক্তি মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। চিন্তাশক্তির বলেই মানুষ জগতের বড় বড় পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে। মহৎ কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষকারই হোক কিংবা বিশাল কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিপ্লবই হোক-এসব ঘটে উন্নত চিন্তাশক্তিসম্পন্ন মানুষের চিন্তার ফসল হিসেবে। কিন্তু আমরা যখন না বুঝে কোনো কিছু বারবার আবৃত্তির মাধ্যমে স্মৃতিতে ধরে রাখি অর্থাৎ মুখস্থ করি তখন কোনো জ্ঞান অর্জন হয় না, শেখা হয় না নতুন কিছু। মুখস্থবিদ্যার সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো এটা আমাদের চিন্তাশক্তিকে মরিচা ধরিয়ে দেয়। ছুরির নিয়মিত যত্ন না নিলে, ধার না দিলে এটা ভোঁতা হয়ে যায়। যে ছাত্র বা ছাত্রী কেবল মুখস্থ করে কিন্তু পাঠ্য বিষয় বোঝার চেষ্টা করে না, এ নিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করে না তার চিন্তাশক্তিও ব্যবহারের অভাবে এক সময় ভোঁতা হয়ে যায়।

মুখস্থবিদ্যানির্ভর হয়ে যদি পরীক্ষার ফলাফল ভালোও হয় তবু এটাকে ক্ষতিকর না বলে উপায় নেই। কারণ চিন্তাশক্তি অকেজো করে দিয়ে মুখস্থবিদ্যা ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে উচ্চতর পর্যায়ে পড়াশোনা কঠিনতর করে তোলে। যত উপরের ক্লাসে ওঠা হবে পাঠ্য বিষয়গুলো আরো বেশি জটিল ও সূক্ষ্ম হবে। যাদের চিন্তাশক্তি সতেজ তারাই এখানে ভালো করবে।

বিশেষ করে সৃষ্টিশীল কাজ করা মুখস্থবিদদের জন্য অসম্ভব। যারা উচ্চতর গবেষণা করেছেন বা করছেন, যারা নতুন কিছু আবিষকার করেছেন বা করছেন তারা তোতা পাখির মতো না বুঝে পড়া মুখস্থ করার বদঅভ্যাস থেকে দূরে ছিলেন-এমনটাই বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল-এ অধ্যয়নরত মোস্তাক আহমেদ। কিন্তু এ কাজটিই এদেশের ছাত্র-ছাত্রীরা দিনের পর দিন করে যায়। কারণ এর কোনো বিকল্প তাদের জানা নেই। এ অবস্থায় ছাত্র-ছাত্রীদের নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে নিজেদেরই। আমরা ইচ্ছা করলেই মুখস্থবিদ্যা অবলম্বন না করেও পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করতে পারি।

পড়াশোনার পদ্ধতি সম্পর্কিত পরামর্শমূলক বিদেশী বইগুলোতে SQ3R পদ্ধতি একটি খুব সাধারণ আলোচ্য বিষয়। যদিও এ পদ্ধতিটি আমাদের দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়। আপনাকে কোনো পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য বা নিজের আগ্রহের কোনো কঠিন বিষয় আয়ত্ত করার জন্য একটি বই বা রচনা পড়তে হবে। এ কাজটি ভালোভাবে সম্পাদন করার একটি উপায় নির্দেশ করে SQ3R পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে পড়াশোনার কাজটি পাঁচটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়। SQ3R দ্বারা বোঝানো হয়-

S : Survey
Q : Questioning
R(1) : Read
R(2) : Recall/Remember
R(3) : Review/Revise

ধাপগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো-

Survey বা চোখ বোলানো:
প্রথমে আপনি যা পড়বেন সে সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা অর্জনের চেষ্টা করুন। যদি একটি পাঠ্যবই পুরোটা পড়বেন বলে ঠিক করে থাকেন তাহলে এর ভূমিকা (চড়পফথধপ) ও সূচিপত্র (ঈসষয়পষয়ঢ়) পাঠ করুন। বিভিন্ন অধ্যায়ের শিরোনাম ও উপশিরোনামগুলো দেখুন। কোনো অধ্যায়ের শেষে অধ্যায়টির সারসংক্ষেপ দেয়া থাকলে তাও পড়ে ফেলুন। একইভাবে কোনো রচনা বা কোনো বইয়ের একটি বিশেষ অধ্যায় পড়তে হলে এর শুরুর বা শেষের প্যারাগ্রাফটি কিংবা উভয়টিই পড়ুন। কোনো ডায়াগ্রাম, সারণি (ঞথদলপ) বা ছবি দেয়া থাকলে তাতেও চোখ বোলান।

Questioning বা প্রশ্ন করা:
আপনি যা পড়বেন সে সম্পর্কে কিছু মাথায় থাকলে পাঠের জন্য আপনার মধ্যে উদ্দেশ্য তৈরি হবে। ফলে পাঠ করা সহজ এবং আনন্দময় হবে। যে বইটি বা রচনাটি পড়বেন তার মূল ধারণাগুলো (Key Concepts) কী, সেগুলোর একটির সাথে আরেকটির সম্পর্ক কী ইত্যাদি প্রশ্ন করুন নিজেকে। পাঠ্যাংশের শিরোনাম, উপ-শিরোনামগুলোকে প্রশ্নে রূপান্তরিত করতে পারেন। পাঠ্যাংশের সাথে যদি কোনো প্রশ্ন জুড়ে দেয়া থাকে তাহলে সেগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, এ ব্যাপারে আমার শিক্ষক/কোর্স টিউটর কী কী বলেছেন? আরো প্রশ্ন করুন, বিষয়টি সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমি কী কী জেনেছি, প্রশ্নগুলো খাতায় লিখে ফেলুন।

Read বা পাঠ করা :
এবার পড়তে শুরু করুন। নোট করার জন্য না থেমে একটানা পড়ে যান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। বইয়ের এক একটি অধ্যায় ধরে আপনি SQ3Rপদ্ধতি খাটাতে পারেন। কিংবা পুরো বইয়ের ওপরও ব্যবহার করতে পারেন পদ্ধতিটি। অর্থাৎ বর্তমান ধাপটিতে পুরো বইটি একবার পড়ে ফেলতে পারেন বা বইয়ের একটি অধ্যায়ও পড়তে পারেন। আপনার বর্তমান পঠন দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিন কোনটি করবেন। বিষয়টি যতটা কঠিন বা সহজ সে অনুযায়ী পাঠের গতি নির্ধারণ করুন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা পয়েন্ট পেন্সিল দ্বারা চিহ্নিত করুন।

Recall বা স্মরণ করা:
এ ধাপে আপনি যা পড়েছেন তার মূলকথাগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করুন। পঠিত অংশের সারসংক্ষেপ লিখে ফেলুন নিজের ভাষায়। অধিকাংশ পড়াশোনাসংক্রান্ত পরামর্শদানকারী বইতে এ ধাপটিকে খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়। Learn how to study MÞËìÿ D. Rowtree এই ধাপে মোট পড়াশোনার সময়ের অর্ধেক সময় ব্যয় করতে বলেছেন। কিন্তু তিনি আবার কোনো ফর্মুলা, গ্রাফ ইত্যাদির ব্যবহার শেখার ক্ষেত্রে এ ধাপে মোট পড়াশোনার সময়ের শতকরা ৮০-৯০ ভাগ খরচ করতে বলেছেন। অন্যদিকে ইতিহাস, সাহিত্য ইত্যাদির মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে অনেক কম সময় ব্যয় করলেই চলে।

Review বা পুনর্বিচার:
জবারবধাপে আপনি যা স্মরণ করেছেন তার সাথে মূল পাঠ্যাংশের তুলনা করবেন। দেখুন সবগুলো মূলকথা আপনি লিখতে পেরেছিলেন কি না। এছাড়া Questioning ধাপে যে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেছিলেন সেগুলোর উত্তর কতটা পেয়েছেন তাও ভেবে দেখুন। উত্তরগুলো লিখে ফেলুন। কিছুদিন পরপর Review করার চেষ্টা করুন। Review যত বেশিবার করবেন আপনার শেখাও তত গভীর হবে।

SQ3R পদ্ধতির ধাপগুলো মোটামুটি একই রকম। যদি এর আগে এ পদ্ধতিতে কখনো পড়াশোনা না করে থাকেন তাহলে একবার করে দেখতে পারেন। এর বিভিন্ন ধাপে যেসব কাজ করতে হবে সেগুলোকে ঝামেলার মনে হবে না, যদি আপনি একটি বিষয়ের মৌলিক কিছু বোঝাপড়ার কাজে পদ্ধতিটি ব্যবহার করেন। তবে মুখস্থবিদ্যা পরিহার করার মানে এই নয় যে, সচেতনভাবে কোনো কিছু মনে রাখার চেষ্টা করা যাবে না। বিভিন্ন টুকরো তথ্য, যেমন সাল, তারিখ, বইয়ের নাম ইত্যাদি মনে রাখার দরকার হতে পারে। কী মনে রাখবেন, কেন মনে রাখছেন, এর সাথে অন্যান্য বিষয়ের সম্পর্ক কী এসব সম্পর্কে সজাগ থাকলে মনে রাখা দোষের কিছু নয়। না বুঝে তোতা পাখির মতো মনে রাখাই সমস্যা। কোনো কিছু পাঠের সময় আপনার বাস্তব জীবন বা বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে পাঠ্য বিষয়কে মেলানোর চেষ্টা করুন। প্রশ্নের উত্তর হুবহু পাঠ্যবইয়ের ভাষায় বা গাইড নোটের ভাষায় না লিখে যতদূর সম্ভব নিজের ভাষায় লিখতে চেষ্টা করুন। নিজের ভাষায় লিখতে গিয়ে আমরা চিন্তা করতে বাধ্য হই। ফলে চিন্তার বন্ধ্যাত্ব ঘুচতে শুরু করে। শেষ কথা হচ্ছে, না বুঝে মুখস্থ করা বন্ধ করুন। পড়াশোনার কাজটি আপনার জন্য আনন্দময় ও সত্যিকার ফলপ্রসূ করে তুলুন।

গ্রন্থকার:
আশরাফুজ্জামান মিনহাজ
গবেষক ও পিএইচডি, ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

***আমার লেখা প্রবন্ধটি সামাজিক সচেতনতা মূলক।তাই, প্রবন্ধটি শেয়ার করে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহয়তা করুণ এবং এই বিষয়ে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা, মতামত অথবা পরামর্শ থাকলে দয়া করে মন্তব্য করুণ***

*** In my article based on social awareness to share my article to awake consciousness. Now, you’re cordially invited to read through article or comments below and share your own thoughts through the comment box.***

Penman:
Ashrafuzzaman Minhaz
Researcher at York University,Canada
Ph.D in Public Administration and Good Governance,York University.

https://twitter.com/A_Minhaz
www.facebook.com/Minhaz

Member of the federal executive committee of Conservative Party of Canada – Parti conservateur du Canadahttps://twitter.com/A_Minhaz
http://bjbd.prothom-alo.com/archives/130026