ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

নিম্নমাধ্যমিকের ছাত্র থাকাকালীন আমাদের একজন নতুন শিক্ষক এসেছিলেন, তাঁর নাম মাহাবুব আলম৷ আমাদের ব্যাচে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল শতাধিক, তাই ক, খ, গ শাখা করতে হয়েছিল৷ এতো শিক্ষার্থীর মধ্যে আমি ও জাহাঙ্গীর নামক একজনের উপর স্যারের বিশেষ প্রভাব ছিল৷ এই প্রভাব আমরা আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি৷ শিক্ষাপুস্তকের বাইরে পাঠ্য বইয়ের যে একটা জগত আছে, আর সে জগতে বিচরণ কত প্রয়োজনীয়, তা মাহাবুব স্যারের কাছেই শিখেছি৷ স্যারের ব্যক্তিগত সংগ্রহে অনেক বই ছিল, তিনি আমাদের দু’জনের জন্য তা উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন৷ স্যার আজ নেই, পাঠে তার অনুপ্রেরণা আজও আছে৷

২০০৫ সালের আগস্টে আমি সাউদি আরবে এসেছি৷ সাথে কিছু বই নিয়ে এসেছিলাম৷ এখানে আমার সহবাসীরা যখন সন্ধ্যার পরে তাসের আড্ডায় মেতে উঠতো তখন আমি থাকতাম পাঠে মগ্ন হয়ে৷ এই জন্য অনেক ঠাট্টা-মশকরারও শিকার হয়েছি৷ লোকে বলতো আকামিলা পণ্ডিত৷

তখন ইন্টারনেটের এতো প্রচলন হয়নি৷ ইন্টারনেট বলতে প্রবাসীরা কম খরচে ফোন করার ব্যবস্থাকেই বুঝতো৷ বাংলা টিভি বলতে এটিএন বাংলা, তাও হিন্দি চ্যানেলের সাথে আসতো না৷ এখানে ক্যাবল ব্যবস্থা নেই, যার প্রয়োজন সে নিজেই ডিশ লাগাতে পারে৷ একটা বাংলা চ্যানেলের জন্য একটা ডিশ লাগানোর ইচ্ছা অনেকেরই থাকতো না, বরং একটা ডিশে অনেকগুলো হিন্দি চ্যানেল পেয়েই খুশিতে আটখানা হতো বাঙালিরা৷

দেশের খবর পাওয়া যেতো না নিয়মিত৷ বাঙালিদের আড্ডা বাথায় বাংলা পত্রিকা ও ম্যাগাজিন পাওয়া যেতো, তাও সপ্তাহ খানিক আগের পত্রিকা৷ ম্যাগাজিনের মধ্যে মধুছন্দা, ছায়াছন্দ, আনন্দবিনোদন এগুলোই বেশি পাওয়া যেতো৷ এসবে বলিউড ঢালিউডের নায়ক-নায়িকাদের চটকদার খবরের বেশি কিছু আশা করা যেতো না৷

ফলে সাথে আনা বইগুলো প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল৷ একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি, এখানে বাকালা (মুদি দোকান) গুলোতে ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, উর্দু, মালায়ালাম ভাষার দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও বই পাওয়া যায়, কিন্তু কাছে দূরে অনেক বাকালাতে খুঁজেছি, বাংলা কিছু পেলাম না৷ বাঙালিরা বাংলাদেশি পণ্য কিনে না, এমনকি তরকারিতে পাকিস্তানি মেহেরান গুড়া মশলার বিকল্প কল্পনাও করতে পারে না৷

আরব নিউজগ্রুফ হতে ইংরেজির পাশাপাশি উর্দু, মালায়ালাম ভাষায় দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়৷ খবর নিয়ে জানলাম বাংলা নিউজ নামে তাদের একটা বাংলা দৈনিক ছিল, পাঠকের অভাবে ছয়মাস চালিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে৷ আপসোস হলো, এই দেশে তখনও প্রায় বিশ লক্ষ বাংলাদেশির বাস ছিল, অথচ, পাঠকের অভাবে একটা বাংলা পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলো৷

এর মাশুল বাংলাদেশিদের দিতে হয়েছে৷ নিজেদের অপমান, অবহেলা, অপবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো কোন মিডিয়া ছিল না, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে ভারতীয় ও পাকিস্তানীরা৷ কোন ভারতীয় বা পাকিস্তানির অপরাধের দায় অনায়াসে বাংলাদেশিদের ঘাড়ে এসে পড়তো মিডিয়ার কারসাজিতে৷ কেননা, এদেশের মিডিয়াগুলোতে অনেক ভারতীয় ও পাকিস্তানি কাজ করতো৷

একবার জিদ্দা শহর হতে সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরে রাবিগ নামক শহরে গিয়েছিলাম কাজের উদ্দেশ্য৷ ওখানে প্রায় বছর খানেক ছিলাম৷ আমাদের নোয়াখালির এক মুতাওয়ার (হুজুর, এরা সাউদি ধর্মমন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে এবং ইসলাম প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত) সাথে পরিচয় হলো৷ রাবিগ ইসলামী দাওয়া ও ইরশাদ সেন্টারের গ্রন্থাগার প্রধান ছিলেন তিনি৷ তার কাছে কিছু ধর্মীয় বই পেয়েছিলাম, তাও ব্যক্তিগত সংগ্রহের বই৷ মূল গ্রন্থাগারে কোন বাংলা বই না পেয়ে তার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, বিগত তিন বছরে একটা বাংলা বই কেউ পড়েনি তাই সকল বই জিদ্দা অফিসে ফেরত পাঠানো হয়েছে৷

বাঙালি পড়ে না, বাংলা গান শুনে না, বাংলা সিনেমা দেখে না, বাংলাদেশি পণ্য কিনে না৷ নিজেদের বিষয়ে গভীর হীনমন্যতায় ডুবে ছিল সাউদি প্রবাসি বাংলাদেশিরা ৷বিগত দশ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে৷ মুতাওয়াদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশি অনেকেই পড়তে আগ্রহী হয়েছে৷ যদিও মুতাওয়ারা ইসলামী বইয়ের বাইরে অন্য বই দিতে পারেন না, তবুও বাংলাদেশিদের পাঠে আগ্রহী করতে তাদের ভূমিকা প্রশংসনীয়৷ সাউদি প্রবাসি বাঙালিদের মেধা চর্চায়, পাঠে আগ্রহীকরণে, নিজেদের জানতে ফেসবুক ও অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর অবদানও কম নয়৷ মোদ্দা কথা, অতীতের তুলনায় বাঙালির পাঠাগ্রহ অনেক বেড়েছে৷

অনেকেই এখন ইন্টারনেটে বই খুঁজে বেড়ান৷ পছন্দের বই চেয়ে পরিচিত জনেরা আমাকে ফোন করেন৷ আমি সাধ্যমতো তাদের বই জোগাড় করে দিতে চেষ্টা করি৷ একটি ডিজিটাল লাইব্রেরি গড়ে তোলার স্বপ্ন আমার অনেক দিনের৷ চর্যাপদ থেকে অধুনা প্রকাশিত বইগুলোও থাকবে এই লাইব্রেরিতে৷ বইগুলো সবার জন্য থাকবে উন্মুক্ত, বিনামূল্যে৷ তবে জীবিত লেখকদের বইগুলো পড়তে একটা ফি অবশ্যই দিতে হবে৷ লেখকেরও পেট আছে, সংসার আছে, টাকার প্রয়োজন আছে৷

১৯৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর একটা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলাম৷ এডুলিচার (edu, lit, ure, education, literature and calture) নামক সেই ক্লাবের একটা উন্মুক্ত পাঠাগারও ছিল, যা কিছু দস্যু লুটে নিয়ে গিয়েছিল দু’বছরের মাথায়৷ একটা স্বপ্ন নিয়ে এডুলিচার গড়ে তুলেছিলাম৷ ভৌতিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দিলেও স্বপ্নকে নষ্ট করার সাধ্য তাদের ছিলো না৷

অনেকদিন থেকে এডুলিচার পাঠশালা নামে একটি ডিজিটাল লাইব্রেরি গড়ে তোলার চেষ্টা করছি৷ তিন বছর যাবৎ ডোমেন, হোস্টিং নিয়ে অল্প অল্প কাজও করেছি৷ বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র, রবি ঠাকুর ও নজরুলের জন্য আলাদা সাব-ডোমেন করেছি৷ কিন্তু আশানুরূপ কিছু এখনো হয়ে উঠেনি৷ ইত্যবসরে একটি অনলাইন শব্দকোষের কাজ শুরু করায় লাইব্রেরির কাজ ঝিমিয়ে পড়েছে৷ আশা করছি, স্বত্বর শুরু হবে নতুন উদ্যমে৷

একটি ডিজিটাল লাইব্রেরির স্বপ্ন দেখা যত সহজ, বাস্তবায়ন তত সহজ নয়৷ এর জন্য দরকার টিমওয়ার্ক ও অর্থ৷ এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার টিমওয়ার্ক৷ বই সংগ্রহ, টেক্সটভার্শন তৈরি, প্রুফরিড এসব একা করতে গেলে কখনো পেরে উঠা যাবে না৷

এই ডিজিটাল লাইব্রেরি গড়ার কাজে যদি কেউ আমার সাথে হাত মিলাতেন ধন্য হতাম৷