ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

রবি ঠাকুর বলেছেন
“ দেশে দৈবক্রমে জন্মেছি মাত্র সেই দেশকে সেবার দ্বারা, ত্যাগের দ্বারা, তপস্যার দ্বারা, জানার দ্বারা, বোঝার দ্বারা সম্পুর্ন আত্মীয় করে তুলি নি ; একে অধিকার করতে পারিনি । নিজের বুদ্ধি দিয়ে, প্রান দিয়ে , প্রেম দিয়ে যাকে গড়ে তুলি তাকেই আমরা অধিকার করি ।“ (কালান্তর)

আপনার ব্যক্তি জীবনের অনেক অভ্যাস ইচ্ছে করলেই বদলে দিতে পারে আমাদের দেশের চেহারা । অনেকের কাছে ব্যাপারটি দুরূহ ও অনেক জটিল মনে হলেও আপনি কি জানেন আমাদের দেশের অনেক ক্ষেত্রে অন্য দেশের পন্যের উপর নির্ভর করতে হয় । ব্যপারটা একটু অন্য ভাবে ভেবে দেখুন তো বাংলাদেশ নামের আমাদের মাতৃভূমি কি আদৌও কোন দ্রব্য ব্যবহার করে ? উত্তর না । তাহলে । তারমানে আমরাই ব্যবহার করি বিদেশী পন্য । আমরা যতবেশী বিদেশী পন্য ব্যবহার করব তত বেশী দেশের অর্থ বাইরে চলে যাবে । আমাদের অর্থনীতি তত বেশী অন্যদেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে । একটু অভ্যেস গুলো পরিবর্তন করলেই আমরা এগিয়ে যাব । এর জন্য যা প্রয়োজন তা হলো আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি । আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ তাদের অনেক ক্ষেত্রে আমাদের উলটো টা করে । তাই বলে ভেবে বসবেন না তাদের অনেক পন্য গুনগত মান খুব ভাল । আমরা অনেক বিদেশী পন্য ইচ্ছে করলেই পরিহার করতে পারি ।

বিদেশী পন্য ব্যবহার করে ফুটানি দেখায় খেঁত যারা তারা । আইডেন্টিটি ক্রাইসিস- এ যারা ভুগে তারা পিতজা যার মুরগির ভাঁজা খেয়ে নিজেদের জাত রক্ষা করে । কেন বাংলা খাবার বুজি খুব অখাদ্য খেতে ?? ধরুন, আপনি একটি চিপস খাবেন, তাহলে আমি বলব যেসব বিদেশী চিপস আছে সেসব না খেয়ে দেশী টা দোকানদার এর কাছে চেয়ে নিন । LAYS , এর মত দেশি মানের চিপস আছে মার্কেটে , যেমন ALOOZ , SUN ইত্যাদি । আমাকে এসব কোম্পানির মার্কেটিং প্রতিনিধি ভাবলে আমার এতটুকু খারাপ লাগবে না । কারন ব্যক্তি জীবনে আমি একটি বহুজাতিক কোম্পানির চাকরি ছেড়ে অনেক কম বেতনের সরকারী কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছি । টাকা ও অর্থের চাওয়ার কোন শেষ নেই । আমি আমার লোভকে সম্বরন করে দেশী কোম্পানিতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি । আপনি জানেন কি একটি বিদেশী পন্য কেনা মানে আপনি ঐ পন্য দেশে আনতে বা বহুজাতিক কোম্পানি হলে দেশে তাদের উতপাদন বাড়িয়ে দিচ্ছেন । দেশের টাকা এতে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে । সাথে সাথে ঐ পন্যটির দেশী উতপাদনকারী কোম্পানিটি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে । দেশকে সকাল বিকাল গালাগালি না করে আপনি যা করতে পারেন সেটাই করুন । আপনার যদি চকলেট খাওয়ার অভ্যেস থাকে তবে বলবো দেশী অনেক কোম্পানির ভাল চকলেট আছে । ওটা খান না ভাই । আমি গত একবছর ধরে নিভৃতে এই দেশী পন্য ব্যবহার আমার ব্যক্তি জীবনে বাড়ানোর কাজটি করছি । চলুন সবাই এই কাজটি শুরু করি । দেশ যদি আসলে মা হয় এবং আমরা যদি সেই মায়ের জারজ সন্তান না হই তবে এটা করতে আমাদের খুব বেশী কষ্ট হওয়ার কথা না । যেসব পন্য দেশী ভাল পাবেন না সেটা আমার লেখার বিষয় নয় ।

দেশী কোম্পানির বডি স্প্রে আছে ভাল মানের । দেশী ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি গুলো ভাল মানের টিভি, ফ্রিজ, এসি বানাচ্ছে । ভাবুন এবং দেশীটি কিনুন । দেশী কোম্পানির মোবাইলও এসেছে মার্কেটে । অনেকে নিজেকে মহান দেখানোর জন্যে বিদেশী কাপড় পড়ে ও কিনে । আরে ব্যাটা গোটা দুনিয়া মেনে নিয়েছে গার্মেন্টসে আমরাই সেরা, তোর মত আহাম্মক কি আর আছে । যা আজকেই দেশী কাপড় কিনে আন । মহিলা রা ভারতীয় ড্রেস , লেহেঙ্গা খুব পছন্দ করে । আপামনি দেশীও অনেক কাপড় আমাদের টা অনেক ভাল ।

মটর বাইক চালায় বাংলার দামাল ছেলেরা রাস্তা দাঁপিয়ে । তাদের কে বলছি বলিউডের হিরোদের দেখে সেই দেশের বাইক চড়তে হবে এরকম হিনমন্যতা থেকে বেড়িয়ে আসুন । দেশের কয়েকটি কোম্পানি এখন মটর বাইক বানায় । সেগুলো খারাপ কোয়ালিটি ??? তাহলে দুটো সত্যি গল্প বলি । ১। আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা । বাবার চাকুরির কারনে আমি জীবনে অনেক নতুন মটর বাইক এর পেকেট খুলেছি । আজ থেকে ১০/১২ বছর আগে অনেক গুলো ভারতীয় কোম্পানি (Hero Honda) বাইক কিনেছিলো । আমার বাবার জন্য এলো নতুন মটর বাইক । এক বছরের মাথায় সেই মোটর বাইক এর কিছুই আর ঠিক থাকলো না । এমন হয়েছিল অনেক যন্ত্রাংশ খুলে পরে গিয়েছিলো । তখন এক পরিচিত জন আমাকে বলেছিলো ভারতীয় রা ভাল মাটির প্রতিমা বানায় , তাদের কে বলেছে মটর বাইক বানাতে । কিন্তু আমার সেই পরিচিত জনকে আজ বলতে ইচ্ছে করছে দেখুন আজ তারা অনেক ভাল প্রতিমাই শুধু বানায় না , মটর বাইকও বানায় । তাই এই যে বিদেশী বাইকে চড়ে সারাক্ষন বাংলাদেশ কে গালাগালি করা ভাইডি , সে দিন দূরে নেই আমরাও অদের থেকে ভাল বাইক বানাবো । এবং এরইমধ্যে কিছু উন্নত মডেল এসেও গেছে । ২। ভারতের মন্ত্রীদের তাদের দেশের বানানো গাড়িতে চড়তে হয় । Ambassador নামের ওই গাড়িটি ঐ দেশে আমি টেক্সি হিসেবে ব্যবহার হতে দেখেছি । বুঝুন তাহলে দেশ প্রেমে আমরা কত পিছিয়ে আর দেশ রসাতলে গেলো বলে গালাগালিতে কত এগিয়ে ।

পিতজা হাট , কে এফ সি তে কিছু তরুন তরুনী নিয়মিত যায় । এবং অনেকেই এসব জায়গায় গিয়ে তারা তাদের নিজেদের কে একটু উঁচুশ্রেণীর ভাবার চেষ্টা করে । জনাব , ফেসবুকে দেওয়ার জন্যে ছবি তোলার নিমিত্তে হোক আর নিজেকে ব্রাক্ষ্মণ দেখানোর জন্যে হোক এটা আপনার হীনমন্যতার পরিচয় । আপনার এই হিপোক্রেসির জন্য দেশের ক্ষতি হচ্ছে । যদি এটা আপনি ছাড়তে না পারেন তবে বলবো দেশকে গালাগালি করার অধিকার আপনার নেই । নীতিগত কারনেই আপনি তা হারিয়েছেন । আবারো বলবো দেশ যদি আসলে মা হয় এবং আমরা যদি সেই মায়ের জারজ সন্তান না হই তবে এটা করতে আমাদের খুব বেশী কষ্ট হওয়ার কথা না । দেশী খাবার খেতে যাদের জাত যায় তারা কেন এই দেশে আছে ?? এই বাংলার জল , বাতাস , নদী, রাস্তা , ঘাট কেন যে তারা ব্যবহার করে । আমরা গেও বাংলার ভূত , আমরাই সেসব খাব । আর পহেলা বৈশাখে পান্তা খেয়ে ভং ধরার মানেই হয় না ।

এবার বঙ্গ ললনাদের ভারতীয় চ্যানেল দেখার ব্যপারে কিছু বলবো । এখন একটা সত্য গল্প বলি । চাচার বাসা গিয়েছি । যথারীতি স্টার প্লাসে কোন এক সিরিয়াল আমাকে জোর করে দেখতে হচ্ছিলো । সেই সিরিয়ালে নতুন ঘরে আসা বৌমা তার শ্বশুরকে ক্ষীর রেধে খায়ালো । ক্ষীর এর স্বাদ ভালো হয়েছে কিনা সেদিন আর জানা গেলো না । আমি হাসলাম । তার একমাস পরের ঘটনা , আমি আবার সেম টাইম সেম চাচার বাড়ি এবং সেম চ্যানেল । আশ্চর্য্য হলেও সত্য একমাস পরেও শ্বশুর মশাই মুখে ক্ষীর ঢুকিয়ে বসে আছেন আর বাংলার অসংখ্য মহিলাকে মানসিক টেনশনে রেখেছেন । নিজের শ্বশুরকে খাওয়ালেও মনে হয় এতো দুশ্চিন্তা তাদের হতো না । এই এক মাস বাংলার মাটিতে অনেক স্বামীকেই এই সিরিয়ালের কারনে অফিস থেকে ফিরে ভাত পেতে দেরী করতে হয়েছে । আহা । আপনি জানেন কি বাংলাদেশ কে শুধু ভারতীয় চ্যানেল দেখা তাই খরচ করতে হয় ২০০০ কোটি টাকা । আর প্রতিনিয়ত আপনি তাদের সেবাদাসে পরিনত হচ্ছেন । আপনার মাথায় বিজ্ঞাপনের নামে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে অসংখ্য পন্য । আমি জোর গলায় বলতে পারি বাংলাদেশের মহিলারা বাংলাদেশের যতটি পন্যের ব্রান্ড নাম বলতে পারবে তার কয়েক গুন বেশি ভারতীয় ব্রান্ড বলতে পারবে । এটা আমাদের ব্যর্থতা । আমাদের দেশী চ্যানেল গুলো সারাদিন মারামারি- কাটাকাটি আর অতি কথক লোকদের টকশো নিয়ে ব্যস্ত । আরে বাবা দেশ কথা বলে পরিবর্তন করা যায় না । কাজ করতে হয় । বাচালের প্রলাপে কোন লাভ হবে বলে মনে হয় না । আসুন নতুন করে ভাবি । দেশী টিভি নাটক গুলোর আমুল পরিবর্তন এখন সময়ের দাবী । গৃহিনীদের আলাদা, শিশুদের আলাদা, তরুন-তরুনীদের আলাদা ব্যবস্থা করা উচিত মনে হয় ।

আপনি যেভাবে দেশকে দেখতে চান দেশ ঠিক তেমনি । ইতিবাচক হোন । মানসিকতার পরিবর্তন করুন । দেশ উন্নতি করবেই । গ্যারান্টি দিচ্ছি জনাব । চাবী আপনার হাতেই । আজ থেকে নিজের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে দেশী জিনিস টি কেনার অভ্যাস গড়ে তলুন । এক দিনে হবে না আস্তে আস্তে হবে । এর ফল কয়েক বছরে আমরা পেয়ে যাব । আপন ভেবে দেশ কে যেমন গালাগালি করেন ঠিক তেমনি নিজের দেশকে এই টুকু ভালবাসা তো আপনি বাস্তবেই পারেন জনাব ।

বিঃ দ্রঃ লিখাটি ছড়িয়ে (Share) দিন বন্ধুদের মাঝে । আসুন রাজনৈতিক ব্যর্থ নেতাদের কথা না ভেবে নিজেরাই নতুন করে ভাবি । দেশ আগানোর দায়িত্ব হাতে নিন । সাধ্যের মধ্যে যতটুকু হয় দেশের জন্য করুন ।