ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

তখন আমি কৈশোর পেড়িয়ে সদ্য তরুন । উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এর ভরতি যুদ্ধে উতরে যাওয়া হলেও পছন্দের বিষয়ে পড়তে না পারার কষ্ট নিয়ে ঘরে । হঠাত জাপানের মনবুশো স্কলারশীপ আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টটিভ স্কলারশীপে এপ্লাই করে ফেললাম । পেয়ে গেলাম পাকিস্তানের টা । বাসায় সবাই প্রথমে মেনে নিতে না চাই লেও কেমন করে যেন আমার পায়ের বাধন একটু হালকা হলো । শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে যখন ফোন এলো তখন আমি রোমাঞ্চিত নতুন কিছু দেখব বলে আবার শত্রু দেশ পাকিস্তানে যাব বলে মন ছোট লাগছিল ।কারন আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং ১৯৭১ সনে ছাত্রলীগের নেতও ছিলেন । তবে আমার ছিল আরও একটি কারন .।.।.। এই উপমহাদেশ কে জানার । আর আমি “আমার এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ” এর উপর রচনা প্রতিযোগিতায় জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলাম । তখন আমি হাসান আজিজুল হক সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে আমার পাকি দের উপরে ঘৃনা আর ওদের মুল্যবোধের অবক্ষয় জানার আগ্রহও ছিল ।

আমি প্রথম বার যাওয়ার সময় বিমানে ঢাকা টু করাচি, করাচি টু পেশোয়ার গিয়ে ছিলাম । কিন্তু এরপর আমি অনেকাবার পেশোয়ার টু পঞ্চগড় ভ্রমন করেছি আমি সড়ক , রেল পথে । এই পথে আমি নিম্নোক্ত পথ টি অনুস্বরন করেছি ।

পেশোয়ার টু লাহোর (ভায়া রাওয়াল পিন্ডি-ইসলামাবাদ) – বাই বাস

লাহোর টু অমৃতসর (ভায়া উয়াগা বর্ডার) – বাই ট্রেন / বাস

অমৃতসর টু দিল্লী – বাই বাস ।

দিল্লী টু কোলাকাতা – বাই ট্রেন ।

কোলকাতা টু ঢাকা বাই বাস

তারপর ঢাকা টু পঞ্চগড় বাই বাস .।.।।

ভাইরে তা আবার ৪দিনে । এখন অবাক লাগে বৈকি ।

এই স্মৃতি গুলো একজন তরুনের উন্মুক্ত পাখির মত , রঙ্গিন দুরবীন দিয়ে তাকানোর মতই সুন্দর আর রোমাঞ্চকর । মোট ৫ বার আমি এই পথে হেঁটেছি । ইতিহাসের পাতা একটার পর একটা খুলে গেল আমার যৌবনের উম্মাদনায় ।

সামাজিক বিজ্ঞানের বইয়ের পাতায় ছাড়া তখন তেমন পড়াশুনাই বা কি ছিল আমার । তক্ষশীলা , হরপ্পা সভ্যতা , পাল, সেন শাসন, মোঘল শাসন , নবাব রা , ইংরেজ রা , ইন্দোপাক আমল এবং এরপর আমাদের হাজার বছরের অর্জন স্বাধীনতার ইতিহাস আমার কাছে ধরা দিয়েছে ।

আমি যেমনি পঞ্চগড়ে কাঁঠাল গাছ থেকে কাঁঠাল পেড়ে খেয়েছি তেমনি তেমনি চীন- ইন্দো- পাক সীমান্তের অভীন্ন কারাকোরাম পর্বতমালার কে-২ পাদদেশের আপেল গাছে চড়ে আপেল পেড়ে খেয়েছি ।সে এক চমতকার অভিজ্ঞতা ।

পেশোয়ার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরিত প্রকৌশল বিষয়ে পড়ছিলাম । প্রথম সামার ভেকেশনের ২মাস ছুটি । আমার সাথে ছিল খুলনার বন্ধু কুয়েট সিভিলের সুজন । প্রথম সেমিস্টারে আমরা লেট থাকার কারনে একটু পিছিয়েছিলাম বটে কিন্তু পাকি দের বাঙ্গালির মেধা দেখাতে ভুল করিনি । ফাইনাল ইয়ারে মরন কামড় দিলাম রিসার্চ এ । হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে কনফারেন্স স্পীকার হিসেবে সু্যোগ পেয়েছিলাম ।

চলুন যাত্রা শুরু করা যাক । আমরা ঠিক করলাম আমরা বাই রোড যাব । এর আগেই আমরা একজন যিনি আগে এই পথে গেছেন তার কাছে ব্যাপার গুলো(ট্রান্সসিট ভিসা পাওয়ার উপায়, খরচ, পথের বর্ননা ) জেনেনিলাম ।

আর এক শুভ দিনে বেড়িয়ে পড়লাম আমি আর সুজন পেশোয়ার থেকে পঞ্চগড়েরপথে , আমার পিঠে ট্রেভেলিং ব্যাগ আর বুকের মাঝে অপাড় রোমাঞ্চ ।

প্রথমে আসা যাক আমরা যেই পেশোয়ার থেকে ভ্রমন শুরু করছি সেই শহরের কথায় । সংস্কৃত ভাষায় যার নাম পুরুষ্পুড়া যার মানে দ্যা সিটি অফ মেন । ২০০০ বছর পুরনো ইন্দো-ইরানী গান্ধারা সভ্যতা এখানেই ছিল খাইবার গিড়িপথ এখান থেকে আফগানস্থান যাওয়ার এবং স্থল পথে উপমহাদেশে আসার তখনকার সময়ে একমাত্র পথ । আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট এই পথেই এসেছিলেন । আমিও আসেছি । আমরা যারা নব্য মুসলিম (৬০০বছর ) তাদের পুর্বপুরুষ এই পথে এসেছেন ।

আমি পেশোয়ার থেকে বাই বাস ডাইয়্যু এক্সপ্রেস করে ভ্রমন শুরু করলাম । আমরা লাহোর যাব পথিমধ্যে রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদ হয়ে যাবে গাড়ি । রাওয়ালপিন্ডির অদুরে হলো তক্ষশীলা । তক্ষশীলাকে উর্দুতে বলে টেক্সিলা ।

আজ এখানেই থাক । অন্য একদিন সামমের রাস্তার কথা বলা যাবে । আপনারা শুনতে চাইলে ।

পেশোয়ার