ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

আমি পেশোয়ার থেকে বাই বাস ডাইয়্যু এক্সপ্রেস করে ভ্রমন শুরু করলাম । আমরা লাহোর যাব পথিমধ্যে রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদ হয়ে যাবে গাড়ি । রাওয়ালপিন্ডির অদূরে হল তক্ষশীলা । তক্ষশীলাকে উর্দুতে বলে টেক্সিলা ।

তক্ষশীলা প্রাচীন গান্ধারা রাজ্যের রাজধানী, এক বিলুপ্ত শিক্ষালয়ের নাম, এক সফল বানিজ্য কেন্দ্র, উন্নত কারুশিল্প ও সংষ্কৃতি বিকাশের তীর্থস্থান, বৌদ্ধ, হিন্দু, জৈণ যুগের শিক্ষা সভ্যতার মূল্যবান পুরাতত্ত্বের অনন্য এক প্রাচীন সভ্যতার মহিমামন্ডিত নিদর্শনের স্মারক। টেক্সিলা বা তক্ষশীলা হলো সেই অতি আদি সভ্যতা যেখানে মৌর্য্য আমলের পন্ডিত চানক্য পড়াতেন । আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট এই সভ্যতার সাথে অবগত ছিলেন ।খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডার সিন্ধু নদ পার হয়ে তক্ষশিলায় প্রবেশ করেন। এই সময় তক্ষশিলার রাজা অম্ভি আলেকজান্ডারের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে তক্ষশিলায় অভ্যর্থনা করেন। এটি একটি প্র্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৬০০-৭০০ বছর আগে এটি স্থাপিত হয়। তক্ষশীলার প্র্রত্যেক শিক্ষক ছিলেন স্বাধীন। কোন বিষয়ে ক’জন ছাত্র ভর্তি করা হবে তা নির্ভর করত ওই বিষয়ের শিক্ষকের একক সিদ্ধান্তের উপর। কোনো শিক্ষকের ছাত্র অতিরিক্ত হলে পুরনো মেধাবী কোনো ছাত্র তাদের জ্ঞান দানের ভার তুলে নিতেন। পন্ডিত পাণিণি এখানে পড়েছিলেন । হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের একটি আদি তীর্থ স্থান এইটি ।২০০ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করা চরক চিকিৎসা শাস্ত্রে তক্ষশীলার আরেক বিস্ময়কর অবদান। যোগ সাধনা চর্চার জন্য অনেকে আবার তাকে চরক মুনি বা ঋষি হিসাবে ডেকে থাকেন। তক্ষশীলার পাশ দিয়ে চলেগেছে উত্তরপথ (গ্রান্ড ট্রাংক রোড ) । এখানে আমি গিয়ে ছিলাম সেখানকার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুর সুবাদে । ইতিহাসের মত শিক্ষক নেই । এই পেশোয়ার (যাদের ভাষা পশতু) থেকে পঞ্চগড় (যাদের ভাষা বাংলা )পর্যন্ত আমার ভ্রমনে আমার ছিলো অনেক মজার মজার অভিজ্ঞতার ও নতুন কে খুজে পাওয়ার আনন্দ ।

আমাদের গন্তব্য পঞ্চগড় । এখন আমি পেশোয়ার থেকে লাহোরের পথে । আমার সাথে আছে আমার বন্ধু সুজন । দুজনের এই ভ্রমন প্রথমে আমাদের অভিভাবকদের পছন্দ হয়নি প্রাসঙ্গিক কারনেই । আজ কৃতজ্ঞতায় মা-বাবার প্রতি ভক্তি বেড়ে যায় শত গুন । ১৮/১৯ বছরের সেই ছেলেটিকে কি বিশ্বাসই না করেছিলেন । আমার চোখ খুলে দেখার সময় টাতে আমি দেখেছি । সদ্য তরুনের রক্তের পুরো উদ্দীপনা নিয়ে আমি বুকে অসীম সাহস নিয়ে সেদিন বেরিয়ে পড়েছিলাম । আমাদের লাহোর পর্যন্ত যাত্রা করছি পাকিস্তানের সবচেয়ে বিলাসবহুল বাস সার্ভিস ডায়্যু এক্সপ্রেস এ । বাস গুলো চমতকার । তারচেয়েও চমতকার বাস হোস্টেস ললনা রা । বার বার কোমলপানীয় খেতে মন চায় তাই কোমল হাত থেকে । গাড়ীর সিটে ইয়ারফোনের অনেকগুলো সুইচ রয়েছে । ইংলিশ , হিন্দী , উর্দূ গান শুনার ব্যবস্থা তাতে । আমরা যাচ্ছি পাকিস্তানের সবচেয়ে দীর্ঘ রাস্তা মটরওয়ে দিয়ে । পাকিস্তানের এই রাস্তা টির জন্য আমার খুব হিংসে হয় । এটি প্রায় ১২০০কিমি দীর্ঘ এবং ৬লেনের রাস্তা । এতো সুন্দর হাইওয়ে আমি ভারতেও দেখিনি । এই রাস্তা পেশোয়ার, লাহোর, ইসলামাবাদ , ফয়সালাবাদ, করাচি সহ প্রায় সকল শহর কে বাই পাসের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়েছে ।

আমরা সকালে পৌছালাম লাহোরে । লাহোর আমি আগেও এসেছি । লাহোর সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত আছে আর তা হলো “লাহোর কখনও ঘুমায় না” । সারারাত লাহোরের কিছু জায়গা সরগরম থাকে । ফুডস্ট্রিট নামে একটা জায়গা আছে বেশ বিখ্যাত । সেখানে রাতভর চমতকার খাবার পাওয়া যায় । আমি সারা রাতভর একবার লাহোর ঘুরেছিলাম । আজ আমাদের হাতে একদম সময় নেই । আমরা সকালের নাস্তা করেই টেক্সি নিয়ে বেরিয়ে পরবো ওয়াগা বর্ডারের দিকে । একটু লাহোর সম্পর্কে না বললেই নয় । শহরটি পাক-ভারত সীমান্তের কাছে, রাভি নদীর তীরে অবস্থিত এবং পাঞ্জাব প্রদেশের প্রধান বাণিজ্যিক, ব্যাংকিং এবং পরিবহন কেন্দ্র।

লাহোরে স্থাপত্যকলার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু ভবন আছে। এগুলির অনেকগুলি মুঘল আমলে নির্মিত হয়েছিল;ঐ আমলে শহরটির ব্যাপক প্রসিদ্ধি ঘটে। এদের মধ্যে আছে সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রাসাদ ও সমাধি, লাহোর দুর্গ(অনেকটা দিল্লীর লালকেল্লার মতই),বাদশাহী মসজিদ এবং ওয়াজির খান মসজিদ, যেখানে অন্তর্লিখিত মৃতশিল্পের উৎকৃষ্ট নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। শহরের অন্যান্য ঐতিহাসিক ভবন ও সৌধের মধ্যে আছে শালিমার বাগান, লাহোর জাদুঘর, এবং সোনালী ও মুক্তার মসজিদসমূহ। দিল্লীর পরেই আমি এই শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনা বেশী দেখেছি । পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় হলো পাকিস্তানের সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় ।

লাহোর শহরটি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়াকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের উপর অবস্থিত। ফলে দীর্ঘ ইতিহাস জুড়ে বহু রাজ্য ও রাজবংশের রাজধানী হিসেবে শহরটি ব্যবহৃত হয়েছে। হিন্দু পুরাণমতে রামের সন্তান লাভা বা লোহ এই শহরের পত্তন করেন। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে চীনা পুরোহিত চুয়ান জাং ভারতে তীর্থযাত্রায় যাওয়ার পথে লাহোর দিয়ে যান এবং তিনি এখানকার বিবরণ দিয়ে গেছেন। ১১শ শতকে মুসলিম গজনভিদরা ব্রাহ্মণদের হাত থেকে শহরটির নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেন। তারা ১১৫২ সালে এখানে তাদের রাজধানী স্থাপন করেন। ১২শ শতকের শেষ দিকে উত্তরের ঘোরি সুলতানেরা শহরটি দখল করেন এবং ১৩শ শতকের শুরুতেই শহরটিতে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান শাসকের অভিষেক অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়। এরপর পরে কয়েক শতাব্দী যাবৎ মঙ্গোল হানাদারেরা লাহোরের উপর উপর্যুপরি আক্রমণ চালায়, কিন্তু লাহোর তা সত্ত্বেও টিকে থাকে এবং ১৫২৪ সালে এটিকে ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী বানানো হয়। মুঘলদের পতনের পর ১৭৬৭ সালে লাহোর একটি শিখ রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত হয়। শিখরা পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হলে ১৮৪৯ সাল থেকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত এটি ব্রিটিশ ভারতের একটি শহর ছিল। ১৯৪০ খ্রীস্টাব্দের ২৩ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ভারতীয় উপমহাদেশে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম দেশের দাবী জানিয়ে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব অনুমোদন করে। বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে এটি পাকিস্তান প্রস্তাব হিসেবে অভিহিত হয়। এর স্মরণে মিনার-ই-পাকিস্তান তৈরী করা হয়েছে লাহোরে । আমি সেখানে গিয়েছিলাম । এখন সেখানে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এর নাম জ্বলজ্বল করছে । আরে ব্যাটা পাকি , তোরা তো পাকিস্তান বানাস নাই । পাকিস্তান আমরাই বানিয়েছিলাম কিন্তু ১৯৪৭ পর তোরা আমাদের নিজ দেশে পরবাসী বানিয়ে ফেলেছিলি ।

এই সেই মিনার – ই পাকিস্তান ।

মিনার - ই - পাকিস্তান

লাহোর জাদুঘর

ফুডস্ট্রিট , লাহোর

আমি আর সুজন পেট পুরে নাস্তা করলাম লাহোরে । লাহোরের খাবার খুব মজার । টেক্সি নিলাম ওয়াগা পর্যন্ত । দেড় ঘন্টা লাগবে আমাদের । লাহোর থেকে বর্ডার ৩০কিমি দূরে । গ্রান্ড ট্রাংক রোড ধরে চলছি আমরা । এই সড়ক ঐতিহাসিক এক শহর । অন্য কোনদিন অন্য কোন লেখায় সেটা বলা যাবে । ওয়াগা বর্ডারে অসংখ্য পর্যটক আশে । সকালে ও সুর্যাস্তের ৩০ মিনিট আগে পতাকা উত্তোলন ও নামানো নিয়ে এখানে রীতিমত প্রতিদিন এদের বর্ডার প্রহরীদের বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ হয় দুই দেশের । আমার একবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো সেই অনুষ্ঠান ।

আমাদের বুক দুরু দুরু করছে । আমাদের পার হতে হবে প্রথমে পাকিস্তানের ইমিগ্রেশন ও কাস্টম এর পর ভারতের ইমিগ্রেশন ও কাস্টম । আমরা অপেক্ষা করছিলাম অসংখ্য প্রশ্নের জন্য ।
ওয়াগা পার হলে আমরা যাব অমৃতস্বর শহর (ভারতের পাঞ্জাবের রাজধানী) । দেখা যাক কি হয় ।

আজ এখানেই থাক । অন্য একদিন সামমের রাস্তার কথা বলা যাবে । আপনারা শুনতে চাইলে ।

বাদশাহী মসজিদ (মোঘল আমলে নির্মিত)

প্রথম পর্ব পড়ুন নিচের লিঙ্কেঃ
http://blog.bdnews24.com/mirzaleo/145517