ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

অফিস থেকে ফেরার পথে মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেলো । আমার , আমাদের প্রিয় শিক্ষক হাসিম আখতার মোঃ করিমদাদ স্যার খুব অসুস্থ । ২ সপ্তাহ আগে পঞ্চগড়ে দেখে এলাম গুরু কে । চোখ মন কোনটাই বাধঁ মানতে চায় না । পঞ্চগড় জেলার শিল্প , সংস্কৃতি , সাহিত্য , নাট্যজগতে তার অগাধ বিচরন । বলা যায় তিনি বাচিয়ে রেখে ছিলেন আমাদের পঞ্চগড়ের এই দিকগুলো । নির্হংকারী এই মানুষটা পঞ্চগড়ের হাজার হাজার ছাত্রের অসম্ভব প্রিয় একজন মানুষ । শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত্য সুনামের সহিত পঞ্চগড় বি পি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করছেন ।

হেনরি এডামস এর একটি কথা আজ খুব মনে পড়ছে “ শিক্ষকের প্রভাব অনন্তকালে গিয়েও শেষ হয় না “ । সে কথা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি । আজ যাঁর কথা বলবো তিনি নিছক পাঠদান কারী শিক্ষক নন , তিনি জ্ঞান বুদ্ধ , তিনি আত্মার মিস্ত্রী , তিনি ভরা কলসের মতো । অযুত জ্ঞানের মাঝেও কখনও তাঁর মদ্ধ্যে এক চিলতে অহংকার দেখিনি ।

হাসিম আখতার মোঃ করিমদাদ । একটি নাম নন , তিনি একটি প্রতিষ্ঠান । এতো কিছু যানতেন , যানাতেন । মনে হতো তার পাশে থাকলেই বুঝি পুন্য হয় । আজ একটা স্মৃতি না বললেই নয় । ২০০৯ সালের কথা । আমরা সবাই তখন ঈদের ছুটিতে পঞ্চগড়ে । হতাত মনে হল পঞ্চগড়ের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নাটক করবো । দৌড়ে গেলাম স্যারের কাছে । খুব করে বললাম ১০দিনে নাটক তুলবো মঞ্চে । যারা মঞ্চে কাজ করেছেন তারা যানেন এটা কত দুরহ , তাও আমরা সবাই আনাড়ি অভিনেতা । স্যার তার লেখা “মিশন সোনারবান” নাটক টি দিলেন । রিহেয়ারসেলে অনেক হেল্প করলেন । পঞ্চগড় নাট্যসমিতির সবাইকে নিয়ে এগিয়ে এলেন । ৮দিনের মাথায় পঞ্চগড় অডিটরিয়ামে নাটক মঞ্চস্থ হলো । বাচ্চু স্যার কেঁদেদিলেন । এর পর যতবার গেছি খালি হাতে নয় বরং হাত আর হৃদয় ভরিয়ে দিয়েছিলেন । পড়ে পঞ্চগড়ের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হারুন উর রশিদ, নাজিম চেয়ারম্যান ও অনেকের চরিত্র নিয়ে আমি “আত্মজ” নামে একটা নাটক লিখি । স্যারের সহায়তা ছাড়া যা সম্ভব হতো না বলে আমি মানি ।

আদর্শ ছাড়া , মুল্যবোধ ছাড়া , ন্যায় ছাড়া , জ্ঞানের রাজ্যে পরিভ্রমের আকর্ষন ছাড়া , মনের সুপ্ত চিন্তাশক্তির প্রকাশ যদি হয় গুরুর কাজ , তবে শিষ্য হিসেবে আজ বলে যেতে চাই তিনি পৃথিবীর যোগ্যতম শিক্ষাগুরু । যারা তোমার সানিধ্য পেয়েছিল তারা যানে কোন মহামুল্যবান সুগন্ধির সুবাস স্পর্শ না করলেও তনু মনে লেগে থাকে , তুমি তেমনি । আমরা হয়তো সুগন্ধ ধারনের যোগ্যতা অর্জন করিনি কিন্তু উপকৃত হয়েছি ।

কবি গোলাম মোস্তফার শিক্ষক নিয়ে একটা লাইন বলি

“ পিতা গড়ে শুধু শরীর , মোরা গড়ি তার মন ,
পিতা বড় কিবা শিক্ষক বড় – বলিবে সে কোন জন ? “

তিনি আমাদের পিতার মতই ছিলেন বটে । শিক্ষক হিসেবে আমি তার কাছে পড়ার ও জানতে চাওয়ার ক্ষুদা বাড়ানো শিখেছি । স্বামী বিবেকানন্দের কথা বললে একটা কথা বলতেই হয় ব্যক্তির আত্মা হতে অন্য আত্মায় শক্তি সঞ্চারিত হলেই যদি তাকে গুরু বলে তবে হাসিম আখতার মোঃ করিমদাদ আমার গুরু , আমি বা আমরা তার অযোগ্য শিস্য ।

বাচ্চু স্যারকে আমি কখনও সুনাম , অর্থের পিছনে দৌড়াতে দেখিনি । তিনি সত্যি পাহাড়ের মতো বড় মনের অধিকারি ছিলেন । ছোট হননি কখনও । সম্মান পেয়েছেন সব শ্রেনীর মানুষের কাছথেকে । কখনও ক্ষমতা অপব্যবহার করেন নি । স্কুলে যখন পড়তাম তখন দেখতাম অনেক বড় বড় সাহিত্যিক স্যারের কাছে তাদের বই পাঠাতো । কেমন জানি প্রচার বিমুখ ছিলেন । কেন জানি মনে হয় জীবনানন্দের মতো মৃত্যুর পর যদি মুল্যয়ন করি তাঁর তবে খুব দুঃখ পাব আমি ।

গুরুর যেমন গুরু থাকে করিমদাদ স্যারের গুরু ছিলেন মজুমদার নামের তারই এক শিক্ষক । মজুমদার স্যার কোন একদিন বাচ্চু স্যার কে ক্লাসে ধরে ফেলেছিলেন গোয়েন্দা বই পড়া অবস্থায় । শাস্তি হিসেবে তুলে দিয়েছিলেন “পথের পাচাঁলি” । স্যার আমাকে বলেছিলেন এই বইটা পড়েই তাঁর জীবন সমন্ধ্যে ধারনা বদলে যায় । অপুর মত স্যার ছিলেন ডানপিটে । অপুর দৃষ্টিতে নতুন পৃথিবী দেখেছিলেন তিনি । তারপর আর পড়াশুনা বন্ধ করেন নি ।

স্যার অসুস্থ । কিডনিতে সমস্যা । ডায়াবেটিকস টা অনেক বেশী । কিডনি ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন । মন ভীষন খারাপ । গত মে মাসে পঞ্চগড়ে দেখা করতে যখন গিয়েছিলাম দীর্ঘ ২ ঘন্টার মত কথা হয়েছিল । তখনই খুব অসুস্থ লাগছিল তাকে । আমি কায়মন বাক্যে দোয়া করি উনি ফিরে আসবেন সুস্থ হয়ে । পঞ্চগড়ের হাল না হলে কে ধরবে । আমরা যারা তরুন, আমরা জানি পঞ্চগড়ে ভাল কাজে এই মানুষটা সব সময় পাশে থাকেন । সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করি যেন তারাতারি আরোগ্য লাভ করেন ।

যা দিয়েছেন আমাদের তা নাই বা বললাম । বা বলেও ছোট করা হবে তাঁকে ।
“ গুরু যদি এক বর্ণ শিষ্যের শিখায় কোনদিন
পৃথিবীর নাই দ্রব্য যা দিয়ে শোধ দিবে ঋন । “ – চানক্য পন্ডিত

আপনি আসল বিপ্লবি । আপনাকে আজ হৃদয়ের সবচেয়ে ভিতরের জায়গা টা থেকে সম্মান ও সালাম ।